দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় একটা অংশ আসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় জনশক্তি রফতানি তাই অতিগুরুত্বের দাবিদার। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী সরকার দক্ষ কর্মী প্রশিক্ষণার্থে বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীনে ৭০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) প্রতিষ্ঠা করেছিল। সম্প্রতি আরো ৪০টি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি দক্ষ কর্মীর হার। শ্রমবাজার বিস্তার ও রক্ষার্থে প্রশিক্ষিত কর্মী সৃষ্টিতে সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সফলতার অভাবে প্রতিযোগী দেশগুলোর দক্ষ কর্মীদের অংশীদারত্ব বাড়ছে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, চার দশক আগে বাংলাদেশ জনশক্তি রফতানি শুরু করে সরকার। আশির দশকে কিছুটা ধীরগতি দেখা গেলেও নব্বইয়ের দশক থেকে আবার তা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকে। কিন্তু এ চার দশকে দক্ষ জনশক্তির তুলনায় অদক্ষ জনশক্তিই বেশি রফতানি করতে হয়েছে সরকারকে। ফলে সংখ্যার দিক থেকে রফতানি বাড়লেও দক্ষ কর্মী পাঠানোর হার বাড়েনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষতা অর্জনে বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের অনীহা, জাতীয় শিক্ষানীতির দুর্বলতা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র না থাকা, জনসচেতনতা ও প্রবাসী কর্মীদের নিয়ে সরকারের যথাযথ পরিকল্পনার অভাবেই জনশক্তিকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলে বিদেশে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।

বিএমইটির তথ্যানুযায়ী, ১৯৯১ সালে ১ লাখ ৪৭ হাজার ১৫৬ জন জনশক্তি প্রেরণ করে সরকার। তার মধ্যে ৩১ দশমিক ৮৭ শতাংশ দক্ষ, ২২ দশমিক ১৫ আংশিক দক্ষ এবং ৩৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ অদক্ষ শ্রমিক। কিছুটা ওঠা-নামার মধ্য দিয়ে কর্মী পাঠানোর সমান্তরাল হার চলে তিন দশক ধরে। ২০২১ সালে সে হারে বড় ধাক্কা খায় দেশ। সে বছর ৬ লাখ ১৭ হাজার ২০৯ জন কর্মী বিদেশ প্রেরণ করা হলেও তার বিপরীতে দক্ষ কর্মী যান ২০ দশমিক ৬৬ শতাংশ, আংশিক দক্ষ কর্মী যান ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। সে বছর বিদেশে পাঠানো মোট কর্মীর ৭৩ দশমিক ৫৬ শতাংশই অদক্ষ।

গত ১৩ জুন প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় রেমিট্যান্স এসেছে ১৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে সপ্তম সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স উপার্জনকারী বাংলাদেশে এসেছে ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার। প্রতিবেশী দেশ ভারতে রেমিট্যান্স এসেছে ১১ হাজার ১০০ কোটি ডলার, যা বছরওয়ারি ২৪ শতাংশ বেড়েছে। এমনকি পাকিস্তান আমাদের চেয়ে বেশি (৩ হাজার কোটি ডলার) রেমিট্যান্স পেয়েছে। তিন কোটি জনসংখ্যার দেশ নেপালও রেমিট্যান্সে নবম স্থানে উঠে এসেছে। আমরা যদি শিগগিরই সুপ্রশিক্ষিত জনশক্তি তৈরিতে মনোযোগ না দিই তাহলে বিশ্ববাজারে নেপাল, ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর কাছে সুযোগ হারাব। 

বিবেচ্য যে প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকালের সুবিধা ভোগ করছে। ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনসংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বেশি থাকলে দেশ ডেমোগ্রাফিক বোনাসকালে অবস্থান করে। ইউএনডিপির তথ্যানুসারে, বর্তমানে এ দেশের কর্মক্ষম জনশক্তি ১০ কোটি ৫৬ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ। দেশের কর্মক্ষম জনশক্তির সংখ্যা ২০৩০ সালে ১২ কোটি ৯৮ লাখে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ ১৩ কোটি ৬০ লাখে উন্নীত হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ বিপুল জনগোষ্ঠীকে বর্তমানে ও ভবিষ্যতের পেশায় দক্ষ করা গেলে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল ভোগ করতে সক্ষম হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার কার্যক্রম শুরু হয়েছে ২০১৯ সালে। বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়ন ও ইকোসিস্টেমের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের লক্ষ্যে গঠিত প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে এ প্রতিষ্ঠান। যুবকদের যুবশক্তিতে রূপান্তরই এ প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য।

বিএমইটির প্রশিক্ষণ পরিচালনা শাখার পরিচালক প্রকৌশলী মো. সালাহ উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের যত টিটিসি আছে, সবগুলোয় একসঙ্গে প্রশিক্ষণ দেয়া হলেও মাত্র ৪০ হাজার প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব। এর বিপরীতে চাহিদা অনেক। আমাদের সক্ষমতা ৪০ হাজারের, কিন্তু প্রশিক্ষণ দিই ৮০ হাজারকে। আগে কাঁচামালের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছিল না, মেশিনারিজের বরাদ্দ স্বল্প ছিল।’

বিএমইটি টিটিসি প্রকল্পটির ওপর সরকারের মনিটরিং প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুগোপযোগী প্রায়োগিক প্রশিক্ষণের অভাব, ব্যবহারিক বিদ্যার সুযোগ না থাকা, প্রশিক্ষক সংকটসহ নানা জটিলতায় সরকারের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ এ টিটিসিগুলো।

দক্ষ কর্মী প্রেরণের হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষে অগ্রগামী করে গড়ে তুলতে হবে। তাদের সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত করে তুলতে হবে। এজন্য ব্যবহারিক শিক্ষায় সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার গভীরভাবে পর্যবেক্ষণপূর্বক সে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো ঢেলে সাজাতে হবে। যাতে প্রশিক্ষিত কর্মীরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার উপযোগী প্রশিক্ষিত হন। স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রশিক্ষণার্থীদের কর্ম উপযোগী করতে হলে দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে তাদের চাহিদার নিরিখে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা করে প্রশিক্ষণার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষাকে আরো দক্ষ, কার্যকর ও শাণিত করে তুলতে হবে।

এখানে প্রণিধানযোগ্য যে গতকাল বিশ্বব্যাপী উদযাপিত বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘skilling teachers, trainers and youth for a transformative future’। অর্থাৎ শুধু যুবসমাজ নয়, একই সঙ্গে তাদের শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদেরও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সামষ্টিক উদ্যোগ জরুরি।

একই সঙ্গে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা ও ন্যাশন্যাল স্কিলস পোর্টালের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে যৌথ উদ্যোগ নিয়ে দক্ষ কর্মী সৃষ্টির জন্য সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা করতে হবে। চাকরি মেলা আয়োজন করতে হবে, যাতে প্রশিক্ষণার্থীরা চাকরিবাজারের চাহিদা সম্পর্কে অবগত হতে পারেন।