রাবণ যে লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়েছিল তার যৌক্তিক কারণ থাকলেও কিছুদিনের মধ্যে আমাদের গোটা দেশে যে ধরনের লঙ্কা নিয়ে হইচই শুরু হলো তা রীতিমতো ভয়াবহ! বাঙালি হুজুগে জাতি এক কথায় সবাই স্বীকার করবেন কিন্তু হুজুগ তো সবকিছুর জন্য মঙ্গলদায়ক নয়। নিত্যপণ্যের যেভাবে ক্রমাগত দাম বাড়ছে, তাতে মানুষের নাভিশ্বাস পড়ছে। এর মধ্যে আবার নতুন কাণ্ড দেখে সত্যিই বিস্মিত হওয়ার জোগাড়। যেই লঙ্কা (মরিচ) একদিন আগে মাত্র ২০ টাকা পোয়া ছিল সেই লঙ্কা কিনা কয়েকদিনের ব্যবধানে চড়া দামে বিকোলো! শুধু কি চড়া! 

রীতিমতো পুরো দেশবাসীকে সজোরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গেল! সত্যি বিস্ময় জাগে, এমন দেশের বাসিন্দা আমরা যেখানে সবাই সভ্য-ভদ্র, রীতিমতো ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানেন না তাদের আবার এত ঝাঁজ। চুনের পরিমাণ বেশি হলে জিহ্বা পুড়বে এটা স্বাভাবিক কিন্তু মরিচের দাম চড়া হয়ে পুরো জাতিরই গাত্রদাহ হলো। মরিচের ঝালে মানুষের এখন-তখন অবস্থা প্রায়! দু-তিনদিন খুব ঝাঁকুনি দিয়ে তারপর এল আমদানির খবর! আর তাতেই হলো রফাদফা! 

সিন্ডিকেটের জেরে বাজারে টেকা দায়। সবার জন্য তা নয়। কারণ যারা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বস্তা ভরে অসদুপায়ে আনছেন, তাদের জন্য নিত্যপণের দাম বাড়ল আর কমল তাতে কী আসে যায়! কিন্তু যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেই বেচারা-হতভাগা জনগণ তো এ দেশে অধিকাংশ। পেটে না খেলে তাদের পিঠে সইবে কী করে! তবু তারা এতটুকু খেতে পায় না। কীভাবে খাবে! যেই আলু কিছুদিন আগেও ১৪-১৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, তা এখন ন্যূনতম ৪০-৪৫ টাকা। কোথায় যাবে হতভাগ্য জনগণ? একজন রিকশাওয়ালা, ভ্যানচালক, শ্রমিক-মুটে-মজুর তাদের কথা কেউ ভাবে না। কারণ তাদের আলাদিনের চেরাগ আছে যে! শরীরের জোর সেখান থেকেই আসে, তার জন্য পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন পড়ে না!

বাজারের সিন্ডিকেটের এতই গায়ের জোর, তাদের ধাক্কা দেয়া খুব কঠিন। তবু এক ধাক্কায় যে দরপতন হলো তা বেশ বিস্ময়কর! যতটা বিস্ময় জেগেছিলে লঙ্কার দাম শুনে! এও ঠিক ততটাই। ভারত থেকে আমদানির খবরে দাম কমছে কাঁচামরিচের। একদিনের ব্যবধানে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কাঁচামরিচের দাম কেজিতে ১২০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। যে মরিচের দাম কেজিতে ৮০০-১০০০ পর্যন্ত উঠল, সেই একই মরিচ হঠাৎ এত কম দামে মিলছে এখন! তাহলে এর নেপথ্যে কাদের হাত? তাদের হাতকে গুঁড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি, পেটে ভাত জোগানো কি সত্যি এ রাষ্ট্রের কর্তব্য নয়?

অনেকেই বলছেন, চারদিকে বৃষ্টির পানিতে মরিচ গাছ মরে যাচ্ছে। ফলে যথেষ্ট মরিচ উৎপাদন সম্ভব নয়। কিন্তু আমদানির খবরেই মরিচের দাম লাফিয়ে এত কমার কারণ কী? এ কী শুধু বৃষ্টির কারণে নাকি এর পেছনে অন্য সব সবজি-ফল-মাংসের বাজারের মতো সিন্ডিকেট বিদ্যমান! আশা করি, ব্যাপারটা আমাদের সবার জানা। কিন্তু এ জানা বিষয়েও আমাদের হাত গুটিয়ে রয়েছে। দিনকে দিন আমরা এ সিন্ডিকেটের জালে আটকে রয়েছি। বেশি দামে বিক্রির জন্য কোল্ড স্টোর (হিমাগারে) আলু সংরক্ষণ করছে। কিন্তু নিত্য চাহিদা পূরণ না করেই বাড়তি মুনাফা অর্জনের জন্য অসাধু ব্যবসায়ীদের এই সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে সাধারণ মানুষকে না খেয়ে মরতে হবে। শুধু যে আলু এমন নয়, এর আগে ডিমের বাজারেও আগুন দেখা দিয়েছিল! তবে মরিচ অন্য জিনিস। এটি পচনশীল দ্রব্য! ফলে খুব বেশি হলেও দু-চারদিন আটকে রাখা যায়। আর তাতেই দেশে এমন অসাধুদের রমরমা ব্যবসা চলল। 

সিন্ডিকেটের ফাঁদে পড়ে এ দেশে সব জিনিসেরই দাম কমবেশি ওঠানামা করছে বর্তমানে। কিন্তু কিছু জিনিস যখন আকাশ ছুঁতে চায় তখন বাঙালির অতি আবেগ এদের আরো প্রশ্রয় দেয়। না হলে মরিচের দাম যেভাবে লাফিয়ে বাড়ল, ঠিক লাফিয়ে কমলও! সরবরাহ বাড়ার জেরে একদিনের ব্যবধানে কাঁচামরিচের দাম নেমে এসেছে ১৫০-১৭০ টাকায়। অথচ গত রোববারও নগরীর বাজারগুলোয় কাঁচামরিচের দাম ছিল ৪০০ টাকার ওপরে। বিক্রেতারা বলছেন, ‘বাজারে ভারতীয় মরিচের সরবরাহ বাড়ার কারণে দাম কমে গেছে। মরিচ পচনশীল পণ্য, চাইলেই বেশি দিন রাখা যায় না।’ তাদের ভাষ্য মতে, এখানেও সিন্ডিকেটের গন্ধ! এর আগে ডিমের বাজার ছিল চড়া। এখনো আছে। কিন্তু বাঙালি গায়ে সওয়া জাতি। ফলে একটানা কোনো জিনিসের মধ্য দিয়ে গেলে তাতে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই প্রথম যখন ডিমের হালি ৫০ টাকা হয়, তখন যতটা সরগরম হয়েছিল মানুষ এখন তা নয়। কিন্তু যারা ভুক্তভোগী ছিলেন তারা আজও তার শিকার! 

জেলায় পাইকারি দরে প্রতি কেজি ৫০০-৬০০ টাকা করে বিক্রি হয়েছে কাঁচামরিচ। আমদানির খবর পেতেই বাজারে মরিচ ১০০-১২০ টাকা! এখন কথা হলো, যদি সত্যি চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন না হতো তবে মরিচের ঝাঁজ কমা সম্ভব ছিল না। তাহলে এ সিন্ডিকেটের এত ঝাঁজ কোথা থেকে তৈরি হচ্ছে! তাদের কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না! খাদ্য ভেজালের পাশাপাশি তাদের এমন দৌরাত্ম্য আর কতদিন ভোগ করতে হবে জাতিকে! এখনই সময় রাষ্ট্রের যেমন কঠোর হওয়া জরুরি তেমনই জনগণেরও একাট্টা হওয়া প্রয়োজন। না হলে অসাধু সিন্ডিকের সঙ্গে টেক্কা দেয়া সম্ভব নয়!

জান্নাতুল যূথী: শিক্ষক ও গবেষক