বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) হিসাব বলছে, ২০২১ সালে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩৮ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। আমাদের দেশে বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুহার উন্নত দেশগুলোর তুলনায় দ্বিগুণ। শিশু ও কর্মক্ষম পূর্ণবয়স্করাই সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণ ও অঙ্গহানির শিকার।

এ ক্ষতি রোধে টেকসই সড়ক ও সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৃহৎ বিনিয়োগ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি দেশে বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা অনেক আগেই চিহ্নিত করেছিল। তারই অংশ হিসেবে দ্য রোড সেফটি প্রজেক্টের আওতায় নির্বাচিত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মহাসড়কগুলোর জন্য ও সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে গত বছর বিশ্বব্যাংক অর্থসহায়তার অনুমোদন দিয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় সড়ক নিরাপত্তা জোরদার ও দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিমাণ কমিয়ে আনতে দেশে শুরু হয়েছে বৃহত্তম সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের কার্যক্রম। প্রকল্পটির মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে দেশের দুটি মহাসড়ককে নিরাপদ করিডোর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। পাঁচ বিভাগে মহাসড়ক ও শহরাঞ্চলের সড়কগুলোর নিরাপত্তায় নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।

সড়ক নিরাপত্তায় দক্ষিণ এশিয়ায় এটি বিশ্বব্যাংকের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পটিতে ব্যয় করবে ৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। ‘বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্ট’-এর মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে নিরাপদ করিডোর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। জাতীয় মহাসড়ক এন-৪-এর গাজীপুর-টাঙ্গাইল অংশের ৭০ কিলোমিটার এবং এন-৬-এর নাটোর-নবাবগঞ্জের ৭০ কিলোমিটার অংশ সড়ক দুটির প্রকৌশলগত নকশা উন্নয়ন, সাইন ও মার্কিং স্থাপন, পথচারী চলাচল সুবিধা বৃদ্ধি, গতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জরুরি সেবার ব্যবস্থা চালু করা হবে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২১ সালের এক গবেষণাপত্র অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিমাণ হ্রাস করতে এবং সড়ক ব্যবস্থা নিরাপদ করতে আগামী দশকে বাংলাদেশকে বিনিয়োগ করতে হবে প্রায় ৭৮০ কোটি মার্কিন ডলার। আমাদের দেশের পরিপ্রক্ষিতে সড়ক দুর্ঘটনা এখন শুধু মানবিক নয়, অর্থনৈতিক সমস্যা হয়েও দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের এখন সড়ক নিরাপত্তার দিকে বেশি নজর দেয়া উচিত। অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জনগণের অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া প্রভৃতিকে সড়ক অব্যবস্থাপনার কারণ বলে চিহ্নিত করা যায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিরাপদ সড়কের গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতিসংঘ ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময়কে ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এ সময়ের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়ে সদস্য দেশগুলো একমতও হয়েছে। এটিকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে বহু দেশে সড়ক নিরাপত্তায় দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তৎপরতা দৃশ্যমান হয়নি। তবে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নতুন বড় এ প্রকল্প হয়তো আমাদের দেশের সড়ক নিরাপত্তার দৃশ্যপট বদলাতে সক্ষম হবে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায় যে প্রকল্পটির আওতায় সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে সড়ক নিরাপত্তায় কাজ করবে। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বিদ্যমান মহাসড়ক দুটির প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ করবে। সেখানে পর্যাপ্ত সাইন-সিগন্যাল স্থাপন, পার্কিং ও যানবাহন মেরামতের জায়গা নির্ধারণসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করবে সংস্থাটি। অন্যদিকে মহাসড়ক দুটির শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করবে ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ। এজন্য একটি স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হবে। সড়কের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চিহ্নিত, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ইত্যাদির বিশেষ ব্যবস্থাপনা করা হবে। বলা হচ্ছে এসব কাজের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন অনুসরণ করে মহাসড়ক দুটিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োজিত রাখা হবে।

এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার। দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্রথম বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এটি বাংলাদেশকে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে ও মানুষের জীবনের মর্মান্তিক ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সাহায্য করবে বলে তারা আশাবাদী। কিন্তু আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির প্রায় ৪৭ শতাংশ পথচারী। দেশের সড়ক-মহাসড়কে স্বল্প খরচে ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং, আন্ডারপাস, ওভারপাস নির্মাণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত করে পথচারীর যাতায়াত নিশ্চিত করা গেলে এটা সম্ভব। উন্নত বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তগুলো সুচারুভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তা হয় না। কত বছরে কী পরিমাণ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো হবে, কীভাবে তা অর্জন হবে, কারা তা সফল করবে—এসব নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা বা কর্মপরিকল্পনা নেই। এছাড়া পরিকল্পনা করে রেখে দিলে বা প্রতিদিন নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি দিলেই সড়কে দুর্ঘটনা কমে নিরাপদ হবে—এমনটা আশা করা ঠিক নয়। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে বিশৃঙ্খলা, চালক-মালিকদের বেপরোয়া মনোভাব এ খাতকে দিন দিন আরো অনিরাপদ করে তুলছে। আমাদের সেদিকে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন।

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হবে, সরকারের উচিত তা সঠিকভাবে ব্যয় করে প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা। পাশাপাশি এ অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য নিরাপদ সড়ক তৈরির স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য এবং বাস্তবায়নের ব্যাপারেও উদ্যোগ নেয়া উচিত। এক্ষেত্রে নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং প্রকল্পগুলোর উন্নয়ন, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও নিয়মিতভাবে নজর রাখতে হবে। প্রকল্প উন্নয়নের সময় অবশ্যই স্বচ্ছ ও উন্নত পদ্ধতি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ সড়কের বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রকল্পকে সফল করা এবং চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে চাইলে শুরুতে এ সমস্যার গভীরে যেতে হবে। আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সামগ্রিক নিরাপদ সড়কের ব্যাপারে কাজ করতে চাইলে প্রয়োজন আইনপ্রণেতা, প্রকৌশলী, পরিকল্পনাকারী, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারী, ইমার্জেন্সি মেডিকেল সার্ভিস (ইএমএস) দল, পাবলিক হেলথ সার্ভিস, লাইসেন্স এবং এর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সবার যৌথ উদ্যোগ। বাংলাদেশ ২০২৬ সাল নাগাদ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অংশগ্রহণ করবে বলে সরকারের প্রত্যাশা। তাই এখন থেকেই আমাদের উন্নত দেশের মতো নিজেদের নিরাপদ সড়কের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে এবং তবেই আমরা একটি উন্নত দেশের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে পারব।