সম্প্রতি টাইমস হায়ার এডুকেশন বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শীর্ষ পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয় ৮০১-১০০০ এর মধ্যে স্থান পেয়েছে। এগুলো হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‌আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং উন্নত করতে সব বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রকৃত ও সরাসরি প্রতিযোগিতায় রয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিংয়ে ভালো স্থান অর্জনের জন্য উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে নেতা, নীতিনির্ধারক ও শিক্ষাবিদদের অবশ্যই বাস্তবসম্মত ও কার্যকর নীতি, কৌশল এবং পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। সেগুলো দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োগ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদদের নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে গবেষণায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই। ‌

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং বেশ কয়েকটি সংস্থা দ্বারা পরিচালিত হয়। র‍্যাংকিংয়ের কিছু সাধারণ মানদণ্ড থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন র‍্যাংকিং এজেন্সিগুলো তাদের নিজস্ব মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্মকাণ্ডকে মূল্যায়ন করে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান এক র‍্যাংকিং এজেন্সি থেকে অন্য র‍্যাংকিং এজেন্সির পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কর্মকাণ্ডই সব র‍্যাংকিং এজেন্সির জন্য প্রধান ও সাধারণ সূচক। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন জায়গাগুলো এবং কীভাবে উন্নত করা যায় সেটি নিয়ে আলোচনা করা দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ের জন্য যা প্রয়োজন

একাডেমিক র‍্যাংকিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ (এআরডব্লিউইউ), যা সাংহাই র‍্যাংকিং নামেও পরিচিত। এটি ২০০৩ সালে প্রথম বার্ষিক বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে নোবেল বিজয়ীর সংখ্যা, উচ্চ মানসম্পন্ন জার্নালে প্রকাশনা, দক্ষ গবেষক, গবেষণার ফলাফল এবং গুণগত মানের ওপর অত্যধিক জোর দেয়া হয়।

২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাজ্যভিত্তিক উচ্চ শিক্ষা বিশ্লেষণ সংস্থা Quacquarelli Symonds (QS) বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ের দ্বিতীয় সংস্থা। জনপ্রিয় কিউএস র‍্যাংকিং প্রাতিষ্ঠানিক এবং নিয়োগকর্তার খ্যাতি, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত, প্রতি শিক্ষকের প্রকাশনার সাইটেশন, আন্তর্জাতিক ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ব্যবহার করে।

যদিও শুরুতে কিউএসের সঙ্গে একত্রে কাজ করেছিল টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই)। ২০০৯ সাল থেকে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষাদান, শেখার পরিবেশ, গবেষণা, সাইটেশন, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিল্প আয়ের ওপর ভিত্তি করে কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন করে।

US News & World Report সেরা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় তালিকা প্রকাশ করে। এটি ১৯৮৩ সালে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং শুরু করে। ২০১৪ সালে তারা প্রথম বিশ্ব র‍্যাংকিং প্রকাশ করে। গবেষণা কর্মক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক খ্যাতির সূচকসহ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গবেষণা খ্যাতি, প্রকাশনা, বই, সম্মেলন, সাধারণ সাইটেশন, মোট সাইটেশন, উচ্চ সাইটেশনের সংখ্যা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ব র‍্যাংকিং প্রকাশ করে।

২০০৬ সালে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সিডব্লিউটিএস লেইডেন র‍্যাংকিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি র‍্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে গ্রন্থপঞ্জি নির্দেশক যেমন প্রকাশনার সংখ্যা, প্রতি প্রকাশনার সাইটেশন এবং সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্মক্ষমতাকে মূল্যায়ন করে।

র‍্যাংকিংয়ে গবেষণার প্রধান ভূমিকা

বিভিন্ন সংস্থার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মক্ষমতা সূচকগুলোর মূল্যায়নের মানদণ্ড থেকে এটি খুব স্পষ্ট যে সব সংস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গবেষণা। গবেষণায় রয়েছে প্রকাশনা, প্রতি শিক্ষকের সাইটেশন, প্রকাশনার প্রভাব, গবেষণা তহবিল বা আয়, নোবেল বিজয়ী এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। অতএব বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্মক্ষমতা উন্নত করতে প্রধান অগ্রাধিকার গবেষণা উন্নয়ন ও প্রচার। সর্বোত্তম মানের গবেষণা ফলাফল তৈরির শক্ত ট্র্যাক রেকর্ডধারী দক্ষ গবেষকরাই উচ্চ মানের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন এবং নতুন গবেষক তৈরি করে গবেষণার খ্যাতি, সাইটেশন, সহযোগিতা, প্রভাব এবং প্রশিক্ষণ বাড়িয়ে তুলতে পারেন। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষককে অবশ্যই সফল, কর্মক্ষম ও প্রভাবশালী গবেষক হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। যাতে তিনি তার পেশায় উৎকর্ষ অর্জন করতে পারেন এবং তার প্রতিষ্ঠানের সুনাম অর্জনে অবদান রাখতে পারেন। আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং অর্জনের জন্য বিশ্বব্যাপী চাপের কারণে যেসব শিক্ষক গবেষণায় সক্রিয় নন, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে অপ্রয়োজনীয় না হলেও কম মূল্যবান হয়ে উঠতে পারেন। আগামী বছরগুলোয় গবেষণার সাফল্যের মাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশের শিক্ষকদের পদোন্নতি

অন্যান্য পেশার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের স্বীকৃতির অংশ হিসেবে নিয়মিত শিক্ষক পদোন্নতির মাধ্যমে কর্মজীবনের অগ্রগতির অধিকারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতির মানদণ্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশ থেকে দেশে ভিন্নতর হয়। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কিছু নির্দিষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে। তবে একই পদোন্নতির মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক পদোন্নতির প্রকৃত অনুশীলন নাও হতে পারে।

পদোন্নতি আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়তি জ্ঞান, শিক্ষণ দক্ষতা, গবেষণায় অবদান ও পেশাদার পরিষেবার ক্ষেত্রে শিক্ষার উন্নয়ন, অর্জন এবং বিকাশকে স্বীকৃতি দেয়। সাধারণত পদোন্নতির জন্য আবেদনকারীকে যে স্তরের জন্য আবেদন করছেন, সেই স্তরে এরই মধ্যে কাজ করা উচিত। এ প্রক্রিয়া শিক্ষকদের কর্মজীবনে স্বাভাবিক অগ্রগতি নিশ্চিত করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে গবেষণা

ঐতিহ্যগতভাবে শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতা ও গবেষণার কর্মক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকদের পদোন্নতির মূল বিবেচ্য বিষয় ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে, বিশেষত সহযোগী অধ্যাপক এবং পূর্ণ অধ্যাপক পদে গবেষণা আরো বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রবীণ ও দক্ষ শিক্ষকদের গবেষণা প্রকাশনাগুলো আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে সরাসরি প্রভাব রাখছে।

পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শুধু একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের উল্লেখযোগ্য গবেষকরা, শীর্ষ জার্নালে ভালো মানের গবেষণা প্রকাশনা এবং পেশাদার সহকর্মীদের মধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিই পূর্ণ অধ্যাপক হওয়ার যোগ্যতাকে প্রমাণ করে। বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় সফল হওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারী যেকোনো দেশকে অবশ্যই শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে গবেষণার ওপর আরো বেশি জোর দিতে হবে, যাতে তাদের শিক্ষকরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনীয় হয়ে ওঠে।

পদোন্নতির জন্য বর্তমান গবেষণার পূর্বশর্ত

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনুমোদিত নির্দেশিকা অনুসারে ২০২১ সালের এপ্রিলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইউজিসি একটি চিঠি দেয়। সে অনুসারে নিম্নলিখিত গবেষণা প্রকাশনার (শিক্ষাদানসহ) প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে:

(ক) সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির (বা নিয়োগ) জন্য শিক্ষকের কমপক্ষে তিনটি প্রকাশিত জার্নাল (পিয়ার রিভিউড) প্রবন্ধ থাকতে হবে। এর মধ্যে প্রথম লেখক হিসেবে কমপক্ষে একটি নিবন্ধ থাকতে হবে।

(খ) সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির (বা নিয়োগ) জন্য শিক্ষকের কমপক্ষে ছয়টি প্রকাশিত জার্নাল (পিয়ার রিভিউড) নিবন্ধ থাকতে হবে। যার মধ্যে কমপক্ষে দুটি প্রথম/সহলেখক এবং তিনটি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে থাকতে হবে। ছয়টি প্রকাশনার মধ্যে অন্তত একটি অবশ্যই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরসহ ইনডেক্স জার্নালে থাকতে হবে।

(গ) অধ্যাপক (গ্রেড-৩) পদে পদোন্নতির (বা নিয়োগ) জন্য একজন শিক্ষকের কমপক্ষে ১২টি প্রকাশিত জার্নাল (পিয়ার রিভিউড) নিবন্ধ থাকতে হবে। যার মধ্যে কমপক্ষে তিনটি প্রথম/সহ লেখক এবং ছয়টি সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে থাকতে হবে। ছয়টি প্রকাশনার মধ্যে কমপক্ষে দুটি অবশ্যই ইমপেক্ট ফ্যাক্টরসহ একটি ইনডেক্সযুক্ত জার্নালে থাকতে হবে।

উল্লেখ করা দরকার, গ্রেড-৩ অধ্যাপকদের গ্রেড-২ হতে আরো দুটি পিয়ার রিভিউড জার্নাল প্রকাশনা থাকতে হবে। তবে গ্রেড-২ অধ্যাপকের পদ থেকে গ্রেড-১ অধ্যাপক হওয়ার জন্য কোনো বাড়তি গবেষণার প্রয়োজন নেই।

প্রকাশনার পূর্বশর্তের পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষা স্তরের জন্য শুধু পিয়ার রিভিউড জার্নালে প্রকাশনার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করেই গবেষণা প্রকাশনার বর্তমান পদোন্নতির মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সহযোগী ও পূর্ণ অধ্যাপকের জন্য যথাক্রমে একটি এবং দুটি ইনডেক্স জার্নাল প্রকাশনার প্রয়োজন রয়েছে। জার্নাল প্রকাশনাগুলোয় সহলেখকের সংখ্যা সম্পর্কে গবেষণার মানদণ্ড নীরব। সুতরাং যেকোনো জার্নাল প্রকাশনার প্রতিটি সহলেখক প্রধান লেখকের সমতুল্য ক্রেডিট দাবি করতে পারেন। জার্নাল প্রকাশনাগুলোর সহলেখকদের যথার্থ গুরুত্ব দেয়ার আরো একটি সংবেদনশীল ও যুক্তিসংগত উপায় হচ্ছে প্রকাশনার ক্রেডিট সহলেখকদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা (এটিকে সাধারণ ও সহজ করার জন্য)। ধরে নেয়া হয় যে তারা প্রত্যেকে প্রকাশনায় সমানভাবে অবদান রেখেছেন। সুতরাং যদি কোনো জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে দুজন সহলেখক থাকেন, তাহলে তারা প্রত্যেকে একটি প্রকাশনার অর্ধেক ক্রেডিট পাবেন, তিন সহলেখক থাকলে জনপ্রতি এক-তৃতীয়াংশ ক্রেডিট পাবেন।

সুতরাং যদি একজন শিক্ষকের তিনটি গবেষণা প্রকাশনা থাকে, যার একটি একক লেখক হিসেবে প্রকাশিত, আরেকটি দুজন সহলেখক কর্তৃক প্রকাশিত এবং অন্যটি চারজন সহলেখক কর্তৃক প্রকাশিত হয় তবে তার প্রকাশনার ক্রেডিট সংখ্যা ১+০.৫+০.২৫= ১.৭৫, যা ২-এর চেয়ে কম কিন্তু ৩ নয়। এ বিষয়ে স্বচ্ছতার অভাবের কারণে বিভ্রান্তিকর এবং সম্ভাব্য গুরুতর ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করতে পারে।

এছাড়া কিছু পিয়ার রিভিউড জার্নাল অত্যধিক বিতর্কিত হতে পারে এটা জেনেও পিয়ার রিভিউড জার্নালের পূর্বশর্ত একটি ভালো সূচনা। এছাড়া মানসম্মত ও নিম্নমানের পিয়ার রিভিউড জার্নাল রয়েছে। অনেক অর্থলোভী বাণিজ্যিক জার্নালের যুগে সহলেখক বিষয়টি আরো স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এ অস্পষ্টতা কাটিয়ে ওঠার একটি উপায় হলো সব প্রকাশনার জন্য কেবল পিয়ার রিভিউ নয় বরং ইনডেক্সযুক্ত পিয়ার রিভিউর শর্ত করা। আরো সুনির্দিষ্ট হতে এবং বিতর্ক এড়াতে জার্নালগুলোকে আইএসআই, স্কোপাস ইত্যাদির মতো মর্যাদাপূর্ণ পেশাদার ডাটাবেজে ইনডেক্সভুক্তির শর্ত দেয়া উচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ের দিকে বিশ্ব এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশের গবেষণাকে আরো মানসম্পন্ন ও গবেষকদের আরো প্রতিযোগিতামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে উচ্চ মানসম্পন্ন জার্নালে নিবন্ধ প্রকাশ করলে তাদের পুরস্কৃত করা উচিত। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পদোন্নতির জন্য অন্তত কিছু প্রকাশনা কিউ-১ (ডি-১ না হলেও) জার্নালে প্রকাশের পূর্বশর্ত হওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য ন্যূনতম তিনটি পিয়ার রিভিউড নিবন্ধের মধ্যে অন্তত একটি কিউ-১ জার্নালে থাকা উচিত। একইভাবে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য কমপক্ষে তিনটি নিবন্ধ এবং পূর্ণ অধ্যাপকের (গ্রেড-৩) পদে পদোন্নতির জন্য কমপক্ষে ছয়টি নিবন্ধ কিউ-১ জার্নালে প্রকাশিত হতে হবে। গ্রেড-২ ও গ্রেড-৩ পূর্ণ অধ্যাপকদের জন্য যথাক্রমে অতিরিক্ত দুটি এবং চারটি কিউ-১ জার্নালে প্রকাশনা থাকতে হবে।

যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্মদক্ষতা তাদের গবেষণা প্রকাশনার সাইটেশন দ্বারা পরিমাপ করা হয়, তাই পদোন্নতির মানদণ্ডের সঙ্গে শিক্ষকদের প্রকাশনার সাইটেশন সংখ্যাও যুক্ত করা উচিত। সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য কমপক্ষে ২৫টি সাইটেশন থাকতে পারে। সহযোগী অধ্যাপকের পদে পদোন্নতির জন্য কমপক্ষে ১০০টি, গ্রেড-৩ অধ্যাপকের জন্য কমপক্ষে ২০০টি, গ্রেড-২ অধ্যাপকের জন্য কমপক্ষে ৪০০টি এবং গ্রেড-১ অধ্যাপকের জন্য কমপক্ষে ৫০০টি সাইটেশন থাকতে পারে।

একইভাবে শিক্ষকদের পদোন্নতির মানদণ্ডে এইচ ইনডেক্সকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। যাতে তারা গবেষণাপত্র ভালো জার্নালে প্রকাশ করে তাদের সাইটেশন এবং এইচ ইনডেক্স বাড়াতে পারেন। সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য এইচ ইনডেক্স-৩, সহযোগী অধ্যাপক পদে ৬, গ্রেড-৩ অধ্যাপক পদে ৯, গ্রেড-২ অধ্যাপক পদে ১০ এবং গ্রেড-১ অধ্যাপক পদে ১২ এইচ ইনডেক্স করা যেতে পারে।

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশী শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা আন্তর্জাতিক সহকর্মীদের সঙ্গে দাঁড়ানোর জন্য তাদের প্রতিভা ও কৃতিত্বের আরো ভালো স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। উচ্চ শিক্ষা খাতের প্রধান অংশীজনরা উপরোক্ত প্রস্তাবগুলোকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতির মানদণ্ডের ভিত্তি হিসেবে পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। যাতে জ্ঞান সৃষ্টিতে আমাদের জাতীয় অবদান বিশ্বব্যাপী সঠিক স্থান পায়। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষকরা প্রস্তাবিত গবেষণার উন্নয়ন ও পদোন্নতির শক্ত ভিত্তি থেকে উপকৃত হবেন।

স্পষ্টতই ওপরের গবেষণা প্রকাশনার মানদণ্ডগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগের সঙ্গে খাপ নাও খেতে পারে। নির্দিষ্ট বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে মানদণ্ডের যথাযথ সমন্বয় করতে হবে।

কর্মক্ষম গবেষকদের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে গবেষণায় উচ্চ কৃতিত্ব অর্জনকারীদের জন্য সম্পদের প্রাপ্যতা এবং যথাযথ পারিশ্রমিক ও পুরস্কার নিশ্চিত করা উচিত। আমাদের শিক্ষকদের গবেষণায় উদ্ভাবন, তত্ত্বাবধান, পরামর্শদাতা এবং সহযোগিতায় উৎকর্ষ সাধনের জন্য উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সময়ের দাবি। বাস্তবসম্মত ও অর্জনযোগ্য নীতি নিয়ে চুক্তি এবং পরিবর্তিত উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যথাযথ পদোন্নতির মানদণ্ড গ্রহণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উচ্চতর র‍্যাংকিং অর্জনে সহায়তা করবে।

এ নিবন্ধে আমি গবেষণা তত্ত্বাবধান, প্রতিযোগিতামূলক অনুদান, সহযোগিতা, শিল্পের সংযুক্তি ইত্যাদি বাদে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য শুধু গবেষণা প্রকাশনার মানদণ্ডগুলো অন্তর্ভুক্ত করেছি। তাছাড়া আমি শিক্ষণ সম্পর্কিত মানদণ্ডসহ প্রোগ্রাম ও কোর্সের বিকাশ, উদ্ভাবন, বিতরণ ও মূল্যায়ন, শিক্ষণ মূল্যায়ন, বিশ্ববিদ্যায়ের বিভিন্ন প্রশাসিনক বিভাগ পরিচালনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সেবা, পেশাগত নেতৃত্ব, সম্পাদকীয় ভূমিকা, সামাজিক অবদানের মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করা সম্ভব হয়নি। অতএব ওইসব গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড অন্য নিবন্ধে বিশদভাবে আলোচনা আবশ্যক।

ড. শাহজাহান খান: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া; ভাইস চ্যান্সেলর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা; নির্বাচিত প্রবাসী ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি (বিএএস); প্রতিষ্ঠাতা প্রধান সম্পাদক, জার্নাল অব অ্যাপ্লায়েড প্রবাবিলিটি ও স্ট্যাটিসটিকস (জেএপিএস), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র