ফার্স্ট রিপাবলিক ব্যাংকের পতন ঘটল। ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন ওই ব্যাংকের সম্পদ বিক্রির আয়োজন করল জেপি মরগান চেজের কাছে। অথচ বিষয়টি এফডিআইসির মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী। নীতিমালায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মার্কিন আমানতের ১০ শতাংশের বেশি ধারণ করা ব্যাংকগুলো নতুন কোনো ব্যাংক অধিগ্রহণ করতে পারবে না। এভাবে আর বাড়াতে পারবে না ব্যাংকের আয়তন। কিন্তু যেহেতু কিছু দিন আগেই কয়েকটি ব্যাংকের পতন ঘটেছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার কেবল অনুমোদন দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, রীতিমতো সহযোগিতা করেছে জেপি মরগানের হাতে তুলে দিতে। পরিণতি যা হওয়ার তা-ই হলো। আমেরিকার সর্ববৃহৎ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটি কলেবরে আরো বড় হয়েছে। এদিকে বিষয়টি নিয়ে বিরল এক ঘটনা ঘটেছে মার্কিন রাজনীতিতে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা একযোগে এফডিআইসির কার্যক্রমের প্রশংসা করেছে উচ্চস্বরে। কারণ ঋণ সমস্যার সমাধানে এখন জেপি মরগান যুক্ত হয়েছে। যেন বড় ধরনের এক বোঝা নেমে গেল কাঁধ থেকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও বলতে হয়, কাজটা নায়কোচিত নয়। জেপি মরগান চেজের বর্তমান নিয়ন্ত্রক জেমি ডিমন এফডিআইসির সঙ্গে সম্প্রতি সমঝোতায় বসেছিল। কথা হয়েছে ৫ হাজার কোটি ডলারের ক্রেডিট লাইন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলার বিষয় সামনে রেখে। তাতে মার্কিন করদাতাদের ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ক্ষতি হবে। যেন ফার্স্ট রিপাবলিক আমেরিকানদের ওপর করের ভার বাড়িয়েছে, বাড়িয়েছে পদ্ধতিগত ঝুঁকির মাত্রা।
ফার্স্ট রিপাবলিক ছোট ব্যাংক। কিন্তু তার মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠা নিয়তি অনেক কিছুর ইশারা দেয়। বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের পেছনেও এটা বড় কারণ। জাতীয় আয় কমে যাওয়ায় বেড়েছে ঋণের বোঝা। মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার ফল হিসেবে ট্রেজারি বিলের গ্রাহক সংখ্যা কমে গেছে। নাগরিকরা ঠিক কোন কারণে সেকেন্ড হ্যান্ড বন্ড কিনবে? তারা এর মাধ্যমে নতুনটাই পাচ্ছে। আর যেহেতু বেশির ভাগ নিরাপদ সম্পদই ব্যাংকের ট্রেজারি বিলের অধীন, দেউলিয়া হতে খুব বেশি সময় লাগেনি সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক, সিগনেচার ব্যাংক বা ফার্স্ট রিপাবলিকের। এ প্রবণতার শিগগিরই বিলুপ্তি ঘটবে। পতনের শিকার হবে আরো অনেক ব্যাংক, যা সমাজের ওপর আরো চাপ নিয়ে আসবে। এ হিসাবের বাইরে গিয়ে মানুষও বিভ্রান্ত হবে। তারা ভেবে বসবে, তাদের ট্যাক্সগুলো ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে আরো কোনো ব্যাংকের পতনের জন্য পাটাতন প্রস্তুত করে চলছে। আরো বড় অর্থনৈতিক সংকট, যেটা মানুষের মাঝে হতাশা ও অনাস্থা বাড়িয়ে তুলবে। অথচ তুলনামূলকভাবে ছোট ব্যাংকগুলো অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বিকল্প উপায় এখনো খোলা রয়েছে। করদাতাদের কাছে বীমাহীন আমানত খরচ স্থানান্তর করতে হবে না। ফেডের আমানত বা ফেডের ইস্যু করা ডিজিটাল ডলারের মাধ্যমেই ক্রমে রোলআউট করবে।
মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা বা সিবিডিসি ও ফার্স্ট রিপাবলিকের ক্ষেত্রে কীভাবে কাজ করে, বিবেচনা করা যাক। এফডিআইসি করের অর্থ দিয়ে ব্যাংকের আমানতের গ্যারান্টি দেয়ার পরিবর্তে ফেড ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট তৈরি করে দেবে ফার্স্ট রিপাবলিকের জন্য। সেখানে জমা হতে থাকবে তাদের ব্যালান্স। আমানতকারীরা তাদের জন্য সৃষ্ট নতুন অ্যাকাউন্টে অর্থ রাখবেন নিয়মিত। ফেড থেকে পাওয়া একটা ইউজারনেম ও পিন ব্যবহার করে অর্থের লেনদেন হবে। গ্রাহকের ইচ্ছা অনুসারে অর্থ স্থানান্তর করা যাবে অন্য অ্যাকাউন্টেও। অন্য অ্যাকাউন্টে থাকাকালীন আমানতগুলো ফেডের দ্বারা গ্যারান্টি দেয়া হবে। এক্ষেত্রে করদাতাদের বোঝা বা অন্য ব্যাংকের কাছে চার্জ ধার্য করার প্রয়োজন নেই। যদি অর্থ সরবরাহ বা মূল্যস্ফীতি কিংবা এমন কোনো কারণে ফেড উদ্বিগ্ন হয় কিংবা কোনো ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা মনে করে, তাহলে পাহাড় প্রমাণ দামের বন্ড বা বন্ধকি ব্যবহার করে নতুন অর্থের জোগান দেবে। প্রতিরোধ করবে নিম্নগতি। আর এতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার কারণ নেই। তার প্রধান কারণ এগুলোর মালিকানা আগে থেকেই তার কাছে। এভাবে দিনশেষে করদাতাদের সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করা যায়। একই সঙ্গে জেপি মরগানের মতো বড় ব্যাংকগুলোকে আর বড় হতে দেয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয় না। অর্থাৎ বেসরকারি খাতের হাতে বিষয়টি ফয়সালার ভার ছেড়ে না দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকই সমাধা করে ফেলতে পারে। বরং তখন ওয়াল স্ট্রিট ফেড অ্যাকাউন্ট থেকে প্রারম্ভিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়।
আমি জানি, অনেকেই এর মধ্যে উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। সিবিডিসি’র প্রতি বিক্ষুব্ধ বিরোধিতাকারীরা কিবোর্ড নিয়ে ধেয়ে আসছে আমার বক্তব্যের জবাবে। কারণ আমি পরোক্ষভাবে নাগরিকদের প্রতিটি লেনদেনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি। সহায়তা করছি তথাকথিত ‘বিগ ব্রাদার’দের ঘৃণ্য প্রচেষ্টায়। কিন্তু তারা আমাকে ভুল বুঝছেন। ডিজিটাল মানি এখন আর চাপিয়ে দেয়া কোনো ঘটনা হিসেবে নেই, এটা একটা বাস্তবতা। প্রতিনিয়তই ক্যাশ মানিকে সরিয়ে বাজারে জায়গা দখল করে নিচ্ছে ডিজিটাল মুদ্রা। আইআরএস, এফবিআই, এমনকি স্থানীয় পুলিশেরও তাৎক্ষণিক অ্যাকসেস রয়েছে আমাদের অ্যাকাউন্টে। ফলে টিকাবিরোধীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে জাস্টিন ট্রুডোর সিবিডিসির দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ব্যাংক ও বিগ টেককে নিয়মিতভাবে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। কোনো একটা কারণে তাদের অনুপযুক্ত মনে হলে সঙ্গে সঙ্গেই অস্বীকার করা হচ্ছে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার জন্য। একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে আমরা বর্তমানে প্রযুক্তি-সামন্ততান্ত্রিক যুগে বসবাস করছি। যেখানে আমাদের অর্থ প্রদানের অনুমতির জন্য ব্যাংক ও পরোক্ষভাবে সরকারকে জিজ্ঞেস করতে হয়। সেক্ষেত্রে নাগরিকদের ডিজিটাল পেমেন্ট কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হতে পারে ক্রেডিট কার্ড কোম্পানি, ব্যাংক, আমলা ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে। খুব সম্ভবত সিবিডিসির স্থিতাবস্থার তুলনায় নাগরিকদের গোপনীয়তা বাড়তে পারে। আমাদের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার অত্যধিক দুরবস্থা থেকে রক্ষা করতে পারে। দুটি পৃথক ডাটা ম্যানেজমেন্টের ওপর ভিত্তি করে চালু করা যেতে পারে চেক ও ব্যালান্স পদ্ধতি। তাতে ফেড অ্যাকাউন্টগুলোকে সম্পূর্ণরূপে ‘অজ্ঞাতনামা’ বানিয়ে ফেলা যাবে। যেমনটা ক্রিপ্টো অ্যাকাউন্টগুলো ‘অজ্ঞাতনামা’ ও সংখ্যার দীর্ঘ স্ট্রিং দিয়ে চিহ্নিত হয়। এমনটা সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তত্ত্বাবধান করে সিস্টেম কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের মতো অবৈধ কার্যকলাপের জন্য পরীক্ষা করা যাবে। এভাবে একটি প্রকৃত ও গণতান্ত্রিক উপায়ে নিয়ন্ত্রিত সিবিডিসি নীতিমালার মধ্য দিয়েই কর সংগৃহীত হবে। লড়াই করা যাবে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে। তথাকথিত বিগ-ব্রাদারদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা ও সুবিধা বাড়ানো যাবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওয়াল স্ট্রিটের নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল অর্থের ওপর যে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ আগে থেকেই বিদ্যমান, সেটা নিয়ে সিবিডিসির ওপর এত ক্ষোভ কেন? সিবিডিসিকে আসলে কারা ভয় পায়? এ প্রসঙ্গে একটা গল্প স্মরণ করা যেতে পারে। একসময় তামাক কোম্পানিগুলো পুঁজিবাদী লোভকে পরিণত করেছিল উদারনৈতিকতা হিসেবে। দাবি ছিল, যেন ধূমপায়ীরা ধূমপানের স্বাধীনতা লাভ করে। সে দাবিকে পরবর্তী সময়ে ক্ষোভ হিসেবে চালিত করা হয়েছে। সময় বদলেছে। বর্তমানে পরিচালিত ক্ষোভটা মূলত ফেড অ্যাকাউন্টের সম্ভাবনায় আতঙ্কিত হয়ে। কারণ ফেডের অপার সম্ভাবনা ব্যাংকারদের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, সেটাই বারবার চিহ্নিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ডিমন ও টিবিটিএফের মতো প্রতিষ্ঠানের ভয় পাওয়াটা ঠিক। কারণ ফেডের সিবিডিসি তাদের মতো প্রতিষ্ঠানের সাম্রাজ্য গড়ে তোলাকে হুমকির মুখে ফেলে দেবে। অন্যদিকে সারা বিশ্বের ব্যাংকারদের ভয় পাওয়াটাও ঠিক, কারণ তাদের লাভজনক পরিষেবার আর প্রয়োজন হবে না তখন। আমানত রাখা ও অর্থ প্রদান প্রক্রিয়াকরণের মতো পরিষেবায় আপাদমস্তক পরিবর্তন চলে আসবে। আর সেটা হলে প্রতিষ্ঠানগুলো হঠাৎ করেই সমাজকে জিম্মি করে ফেলতে অক্ষম হয়ে পড়বে।
ইয়ানিস ভারোফাকিস: গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী এমইআরএ২৫ দলের নেতা, ইউনিভার্সিটি অব এথেন্সের অর্থনীতির অধ্যাপক
ভাষান্তর: আহমেদ দীন রুমি










