নদীভাঙন আমাদের দেশের উপকূলবর্তী মানুষের জীবনে নিত্য দুশ্চিন্তার কারণ। নিয়মিত নদীভাঙন রোধে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণসহ যথাযথ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। ফলে ভোগান্তিতে পড়ে নদীতীরবর্তী মানুষ। প্রান্তিক এসব মানুষ যেন নদীভাঙনের ফলে বসতভিটা না হারায় সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের। এজন্য সুষ্ঠুভাবে টেকসই বাঁধ নির্মাণের বিকল্প নেই। 

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার মতিরহাট থেকে রামগতি উপজেলা পর্যন্ত মেঘনা নদীর উপকূল। খরস্রোতা হওয়ায় নদীতে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, রাস্তাঘাটসহ নানা অবকাঠামো। এরই মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কয়েক কিলোমিটার এলাকা। উত্তাল মেঘনার এ করাল গ্রাস থেকে দুই উপজেলার বড়খেরী ও লুধুয়াবাজার এবং কাদিরপণ্ডিতের হাট এলাকা রক্ষায় সরকার ৩ হাজার ৯০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়। গত বছরের শুরুতে নির্মাণকাজ শুরু হয়। কিন্তু ঠিকাদারের গাফিলতি ও ধীরগতির কাজের কারণে উপকূলবাসী নিয়মিত ভাঙনের কবলে পড়ছে। চলতি বর্ষায় ভাঙন আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মেঘনার তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পের সব প্যাকেজের কাজ একযোগে শুরু না হওয়ায় ভাঙনের মুখে পড়তে হচ্ছে। পাশাপাশি বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মাণাধীন প্রকল্পের কাজের মান নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে।

এমনকি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকেও কাজের ধীরগতির কথা স্বীকার করা হয়েছে। পাউবো জানিয়েছে, বর্ষার আগে বালি সংকটের কারণে প্রকল্পের কাজ ঠিকমতো করা যায়নি। এখন নদীর স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় বাঁধ নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এদিকে এলাকাবাসী জানিয়েছেন, আগে ভাঙন রোধে অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। সঠিক পরিকল্পনা ও সুষ্ঠুভাবে কাজ না হওয়ায় ভাঙন রোধ করা যায়নি। তাদের দাবি, মজবুত ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ হলে উপকূলবর্তী মানুষের বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা রক্ষা পাবে। এক্ষেত্রে বাঁধ নির্মাণের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, সে বরাদ্দের অর্থ সঠিকভাবে কাজে লাগানোর দাবি করা হয়েছে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে। কেননা দুর্নীতি হলে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ সম্ভব হবে না। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্মাণকাজ তদারকির দাবি করা হয়েছে। তাহলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আমরাও প্রত্যাশা করি, প্রস্তাবিত বেড়িবাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে উপকূলবাসীর বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে। এজন্য উপকূলীয় বাসিন্দাসহ লক্ষ্মীপুরবাসীর দাবি ছিল ঠিকাদারের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ না করে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ করার। এজন্য বিভিন্ন সময়ে এলাকাবাসী আন্দোলন ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। এখন এলাকাবাসীর দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে বাঁধ নির্মাণে সতর্কতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, উদ্বোধনের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ শুরু করলেও তিন মাসের মাথায় বালি সংকটসহ নানা অজুহাতে তীর রক্ষা বাঁধ বন্ধ রাখে। সম্প্রতি চাপের মুখে ঠিকাদাররা কাজ শুরু করলেও নির্মাণকাজে তেমন কোনো অগ্রগতি লক্ষণীয় নয়। বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ছে। বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে কাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে জানা গেছে, বর্তমান বৃহৎ অংকের বরাদ্দের আগে রামগতি ও কমলনগর উপজেলার ভাঙন ঠেকাতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। তখন সেনাবাহিনী বাঁধ নির্মাণ করায় রামগতি বাজার ও আলেকজান্ডারের সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকা ভাঙন থেকে রেহাই পায়। কিন্তু একই প্রকল্পে কমলনগর উপজেলার মাতাব্বর হাট এলাকায় ঠিকাদারের মাধ্যমে নির্মিত এক কিলোমিটার বাঁধ আটবার ধসে পড়েছে। 

এজন্য সেনাবাহিনীকে দিয়ে নদীর তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জোরালো হচ্ছে। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতায় ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ করা হলে সর্বশেষ বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবার বালি সংকটের কথা বলে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ বন্ধ রাখলে সেটিও এলাকাবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে বালি জোগাড় করতে হবে। এদিকে উদ্বোধনের পর দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ রাখায় বাঁধ নির্মাণে বিলম্ব হচ্ছে। এরই মধ্যে বর্ষায় তীব্র স্রোতে নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে। গাছপালা, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি দেখে উপকূলের বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ও দোকানপাট সরিয়ে নিচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে বাকি লটগুলোর বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু না হলে উপকূলবাসী ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়বে। এতে সরকারের ৩ হাজার ৯০ কোটি টাকার এ উন্নয়ন প্রকল্প ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

যথাসময়ে রামগতি-কমলনগর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ না হলে এখানকার মানুষ বাঁধের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে। কেননা বর্ষা মৌসুম এলেই তীররক্ষা বাঁধের অভাবে জোয়ারের পানিতে বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হয়। এতে উপকূল অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এ কারণে মেঘনাপাড়ের মানুষের বসতভিটার সুরক্ষায় দ্রুত নদীর তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করা প্রয়োজন। আমরা প্রত্যাশা করব, সরকার উপকূলবাসীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেবে। এজন্য বাঁধ নির্মাণে যেন স্বচ্ছতা বজায় থাকে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সঠিক সময়ে যেন বাঁধ নির্মাণ হয়, সেটিও তদারক করতে হবে।