পৃথিবীর কর-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এ দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় রাজস্ব আহরণের অনুপাত খুবই কম। বর্তমানে দেশের রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত মাত্র ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও সর্বনিম্ন। এর পেছনে মূল কারণ—এখন পর্যন্ত অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাতগুলোকে করজালের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি; যেন কর ফাঁকি দেয়াটাই এখানে স্বাভাবিক। অথচ একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে কর-জিডিপির অনুপাত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেননা রাজস্ব আয় থেকে পরিচালন ব্যয় নির্বাহ হয়। রাজস্ব কম হওয়ায় প্রতি বছরই দেখা দেয় বাজেট ঘাটতি। দেশের অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাতগুলোকেই যেখানে পরিপূর্ণভাবে হিসাবের আওতায় আনা যায়নি, সেখানে প্রতিনিয়তই বাড়ছে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার। কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে হলে সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসাবের আওতায় আনা জরুরি।

বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে দেশের অর্থনীতির আকার (জিডিপি) ৪৫৪ বিলিয়ন ডলার। এর বাইরে সরকারি হিসাববহির্ভূত অর্থনীতি রয়েছে জিডিপির ৩০-৪০ শতাংশ বা ১৩৬-১৮০ বিলিয়ন ডলারের মতো। নীতিবিরুদ্ধ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অবৈধভাবে পরিচালিত হওয়ায় এ খাতের আকার বাড়ছে। সরকারি হিসাবের বাইরে থাকায় এ খাত থেকে কোনো রাজস্বই পায় না সরকার। যদিও দেশের চলমান উন্নয়নকে টেকসই করতে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর বিকল্প নেই। এজন্য রাজস্ব খাতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। তবেই সব অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে হিসাবের আওতায় আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নীতিবিরুদ্ধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তবেই রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার হলে তা ফলপ্রসূ হবে।

এনবিআরের তথ্যমতে, দেশের নিবন্ধিত করদাতার (টিআইএন নম্বরধারী) সংখ্যা এক কোটি। এর মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন মাত্র ৪০ লাখ। আবার দেশে সরকারি হিসাবের বাইরে থাকা অর্থনীতি ও জিডিপির অনুপাত ৩০-৪০ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতির বিরাট এ অংশ হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এছাড়া নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান থেকেও যথাযথ শুল্ক আহরণ হয় না, নিবন্ধিত প্রায় ৩০ হাজার প্রতিষ্ঠান শুল্ক দেয় না। সুতরাং দেশের আয়করযোগ্য মানুষ ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই কর ফাঁকি দিচ্ছে। জিডিপির আকার এত বড় হওয়া সত্ত্বেও রাজস্ব আয় বাড়ছে না। 

ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ডের (আইএমএফ) প্রকাশনা ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের তথ্যানুসারে, ২০১৬-২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ছিল গড়ে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে এ অনুপাত ভারতে ১৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ, নেপালে ২১ দশমিক ৫০, পাকিস্তানে ১৪ দশমিক ৮৮ ও শ্রীলংকায় ১২ দশমিক ৭৪ শতাংশ ছিল।

কর-জিডিপি অনুপাতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চিত্র হতাশা ও উদ্বেগজনক। এনবিআর তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, বাড়ছে বাজেট ঘাটতি। এ ঘাটতি পূরণে সরকার দেশী-বিদেশী উৎস থেকে বিপুল পরিমাণে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছর শেষে বাংলাদেশে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বিদেশী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ বিলিয়ন ডলার। ২০০৯ সালের পর থেকে গত ১৪ বছরে এটি ৩২২ শতাংশ বেড়েছে। আর গত তিন বছরে এটি ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত উন্নীত করতে না পারলে দেশে চলমান অর্থনৈতিক সংকটের কোনো সমাধান হবে না। রাজস্ব আয় না বাড়লে ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঋণ নিতেও বেগ পেতে হবে। সম্প্রতি আইএমএফ থেকে ঋণ প্রাপ্তির শর্ত হিসেবে রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত সাড়ে ৯ শতাংশে উন্নীত করার শর্ত দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ অপরাধমূলক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। যেমন অর্থ পাচার, ডলার বিনিময় হার-সংক্রান্ত অসামঞ্জস্য, রফতানি পণ্যের হিসাবে গরমিল, আমদানি ব্যয় কম দেখানো, উৎপাদনের হিসাবে ফারাক, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পাচার ও শ্রমশক্তির যথাযথ হিসাব না থাকা প্রভৃতি। সেই সঙ্গে স্বর্ণ-মাদকসহ অন্যান্য দ্রব্য চোরাচালান ও মানব পাচারের মতো অপরাধমূলক কার্যক্রমে হুন্ডি-হাওলার ব্যবহার এখন বৃহৎ আকারে বেড়েছে। অত্যন্ত রক্ষণশীলভাবে হিসাব করে দেখা গেছে, দেশে হুন্ডি-হাওলার বাজার ৩০-৩৫ বিলিয়ন (৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি) ডলার ছাড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আরো গভীর ও গবেষণাভিত্তিক অনুসন্ধান চালালে দেখা যাবে এর বাজার তার চেয়েও অনেক বড়। 

বাংলাদেশ সরকার ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর প্রিভেন্টিং মানি লন্ডারিং অ্যান্ড কমব্যাটিং ফাইন্যান্সিং অব টেরোরিজম ২০১৯-২১’ শীর্ষক একটি কৌশলপত্র তৈরি করেছে। তাতে দেশ থেকে অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে ১০টি দেশের কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে গন্তব্যে অর্থ পাচারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো হুন্ডি-হাওলা। পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়ে যাওয়া এর পেছনে দায়ী। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাঁচ বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের বাইরে থাকা দেশের নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছে অন্তত ৭০ শতাংশ।

এ অবস্থায় কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে একদিকে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন, অন্যদিকে প্রয়োজন অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দমন। এক্ষেত্রে কেবল কর আইনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। কর প্রশাসনের কার্যকর দক্ষতা বৃদ্ধি আবশ্যক। দেশের মানুষ কেন কর দিতে আগ্রহী নয় তার কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং কর কর্মকর্তাদের অদক্ষতা এ দেশে কর ফাঁকির অন্যতম কারণ। সুতরাং পদ্ধতিগত জটিলতা দূর করতে হবে শুরুতেই। পুরোপুরি অটোমেটেড কর ব্যবস্থা চালু করা দরকার। তবে অত্যন্ত জরুরি হলো নজরদারি বাড়ানো। যারা কর ফাঁকি দেয় ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া দেশের সাধারণ মানুষের ধারণা, সরকার যে রাজস্ব আয় করছে তা অন্যত্র পাচার হয়ে যায় এবং তারা জানেন না তাদের কষ্টোপার্জিত অর্থ কোথায় ব্যয় হয়। যার কারণে তারা কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। সুতরাং রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে করসংক্রান্ত মনস্তাত্ত্বিক সংকট দূর করতে উদ্যোগী হতে হবে এনবিআরকে। বলা যায়, সম্পূর্ণ রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার আবশ্যক।