ঢাকার বেইলি রোডে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি গ্রীন কোজি কটেজ নামের সাততলা বাণিজ্যিক ভবনে আগুন লাগে। এ দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৬ জন মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দুর্ঘটনাটি মোটেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড, ভবনধসে পড়া এবং অন্যান্য একই ধরনের দুর্যোগ দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশকে বিপর্যস্ত করেছে এবং এখনো করছে। গত ২৯ অক্টোবরের অগ্নিকাণ্ড সেই ধারাবাহিকতারই সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। 

এসব দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ২০১৩ সালের এপ্রিলে সাভারের রানা প্লাজা ভবনধসে ১ হাজার ১৩০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে ২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ড, ২০১২ সালে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, ২০১৬ সালে ঢাকার কাছে টাম্পাকো ফয়েলস প্যাকেজিং কারখানায় বিস্ফোরণ, ২০১৯ সালে ঢাকার বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ড, ২০২০ সালের মে মাসে খুলনার বগিহাটায় অগ্নিকাণ্ড, ২০২১ সালের জুনে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাশেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, ২০২২ সালের জুনে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণ, ২০২৩ সালের মার্চে ঢাকার গুলিস্তান এলাকায় একটা সাততলা বাণিজ্যিক ভবনে বিস্ফোরণ, এপ্রিলে ঢাকার বঙ্গবাজারে সহস্রাধিক পোশাকের দোকানে আগুন লাগা এবং সেপ্টেম্বরে মোহাম্মদপুরের একটি কাঁচাবাজারে অগ্নিকাণ্ড। ২০১৩ থেকে ২০২৩-এর মধ্যে সারা দেশে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মৃতের মোট সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২৬৩ (ডেইলি স্টার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৩)। 

এ পর্যন্ত বিভিন্ন দুর্যোগে মৃত্যুর সিংহভাগই হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। সড়ক দুর্ঘটনা এবং পরিবহন নিরাপত্তার বিষয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। তবে বর্তমান নিবন্ধটিকে সড়ক দুর্ঘটনা ছাড়া অন্যান্য দুর্ঘটনার আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এ দুর্ঘটনাগুলোকে কর্মক্ষেত্রে দুর্যোগ (ওয়ার্ক প্লেস হ্যাজার্ড) হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। যদিও এর মধ্যে কিছু ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলা যেতে পারে, তবে অধিকাংশই ছিল মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, প্রশাসনিক গাফিলতি, জবাবদিহিতার অভাব এবং সাধারণভাবে দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতিকে এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করা যেতে পারে। প্রতিটি কার্যালয় দুর্যোগের পর গণমাধ্যম, শ্রমিক সংগঠন, রাজনীতিবিদ এবং অন্যরা নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের জন্য ব্যবসায়ের মালিকদের দোষারোপ করেন এবং আইন প্রয়োগে শৈথিল্যের জন্য সরকারকে দায়ী করেন। কখনো কখনো কোনো দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট মালিক এবং ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার, জরিমানা ইত্যাদির মতো আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় পরিহারের জন্য কিছুই করা হয় না। কিছুটা সময় কেটে গেলে আমরা সব ভুলে যাই এবং সব আগের অবস্থায় ফিরে যায়। কিছুদিন পর আরেকটা দুর্ঘটনা আমাদের আঘাত করে এবং পুরো চক্রটির আবার পুনরাবৃত্তি হয়। আমরা কি আমাদের কর্মক্ষেত্রগুলোকে নিরাপদ করার জন্য নতুন কোনো উদ্যোগ নিতে পারছি? আমাদের শ্রমিক ও কর্মীরা কোনো রকমে বেঁচে থাকার মতো মজুরি নিয়ে উন্নয়নের গল্প রচনায় ভূমিকা রাখছে, তাদের জীবনের নিরাপত্তায় কি কিছু করার নেই? দেখা যায়, যেকোনো দুর্যোগে এ হতদরিদ্র মানুষরাই আগুনে পুড়ে বা ইট-পাথরের নিচে পিষ্ট হয়ে মরতে হয়। 

নিরাপত্তা উন্নত করার উপায় অন্বেষণ এবং একটি সাফল্যের গল্প 

বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার উপায় পর্যালোচনা করার আগে আমরা বিবেচনা করতে পারি এ ব্যাপারে আমাদের আদৌ কোনো সাফল্যের অভিজ্ঞতা আছে কিনা। আশ্চর্যজনক হলেও আমাদের বাংলাদেশে একটা শিল্প আছে যেটি কার্যালয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি যুক্তিসংগত মাত্রা অর্জন করেছে। সেটা হলো তৈরি পোশাক বা আরএমজি শিল্প।

নতুন শতকের শুরু থেকে ২০১৩ নাগাদ গার্মেন্টসের বেশ কয়েকটি কার্যালয় দুর্ঘটনায় দেশ ও বিদেশের শ্রমিক ইউনিয়ন, শ্রমিক অধিকার সংগঠন, এনজিও, জননিরাপত্তা কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। রানা প্লাজা ভবনধসের ঘটনায় শ্রমিকদের রক্ষায় বৈশ্বিক তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। ক্লিন ক্লোথস ক্যাম্পেইন, ওয়ার্কার রাইটস কনসোর্টিয়াম, ইন্টারন্যাশনাল লেবার রাইটস ফোরাম, মাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, জিআইজেড এজেন্সি এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল (একটি গ্লোবাল ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন) ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানসহ সব অংশীজন শ্রমিকদের নিরাপত্তায় ঐক্যবদ্ধ হন। তারা ২০১৩ সালের ৫ মে ‘‌অগ্নি এবং ভবন নিরাপত্তা সমঝোতা চুক্তি’ (সংক্ষেপে ‘‌অ্যাকর্ড’) সই করেন।

২০১৩ সালের ‘‌অ্যাকর্ড’ আওতাভুক্ত কোম্পানি এবং কারখানাগুলোর জন্য বেশ কয়েকটি লক্ষ্য এবং কাজ নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তাঝুঁকি চিহ্নিতকরণের জন্য পরিদর্শন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণ, শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, শ্রমিকের নিরাপত্তার অধিকার সম্পর্কে শিক্ষা কর্মসূচি, নিরাপত্তা সম্পর্কিত অভিযোগ করার সুযোগ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া গঠন এবং সব কারখানায় নিরাপত্তা কমিটি গঠন। 

২০১৩ সালের চুক্তি ২০১৮ সালে হালনাগাদ করা হয়েছিল। ২০২০ সালের জুনে চুক্তির কার্যক্রম আরএমজি সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিল বা আরএসসির কাছে হস্তান্তর করা হয়। আরএসসির সদস্যদের মধ্যে রয়েছে চুক্তি সইকারী ব্র্যান্ড ও ইউনিয়নগুলো, বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ। ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট চুক্তিটিকে দুই বছরের জন্য নবায়ন করে নতুন চুক্তি করা হয়। ২০১৩ সালের অ্যাকর্ডের লক্ষ্য এবং কাজগুলো অ্যাকর্ডের পরবর্তী সংস্করণগুলোয় অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং ২০২১ সালের চুক্তিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আরএসসির ২০২১-২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাকর্ডের আওতায় তৈরি পোশাক শিল্প উল্লেখযোগ্য মানের নিরাপত্তা লক্ষ্যমাত্রা (নিরাপত্তা পরিদর্শন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণ, শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ইত্যাদি) অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৩ কিংবা তার আগে ঘটে যাওয়া বড় দুর্ঘটনাগুলোর সমপর্যায়ের ভয়াবহ দুর্ঘটনা এরপর কোনো পোশাক কারখানায় আর হয়নি। তবে তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে এ পর্যায়ের দুর্ঘটনা এখনো ঘটছে। তৈরি পোশাক শিল্পের উদাহরণ থেকে দেখা যায়, অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, জবাবদিহিতার অভাবের মতো সব প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি সত্ত্বেও বাংলাদেশেও কার্যালয় নিরাপত্তার একটি যুক্তিসংগত স্তর অর্জন করা সম্ভব।

তৈরি পোশাক শিল্পে নিরাপত্তা অর্জনের মডেল কি অন্যান্য শিল্পে সফলভাবে অনুকরণ করা যেতে পারে?

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, যেই পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া ব্যবহার করে তৈরি পোশাক শিল্পে একটা নির্দিষ্ট মানের নিরাপত্তা অর্জন করা গেছে, সেগুলোকে অন্যান্য শিল্পে সফলভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে কিনা। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে যে, এর উত্তরটা হবে নেতিবাচক। আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক অধিকার গোষ্ঠী এবং জননিরাপত্তার সপক্ষে কাজ করা সংস্থাগুলো তৈরি পোশাক আমদানিকারকদের ওপর নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থায়নের জন্য চাপ দিয়েছিল। এ চাপ না থাকলে এবং আমদানিকারকরা অর্থায়ন না করলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক নির্মাতাদের নিরাপত্তা কর্মসূচি কার্যকর করার মতো তহবিল থাকত না এবং তাদের নিরাপত্তা অর্জনগুলো সম্ভব হতো না। বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্পের জন্য নিরাপত্তা অর্জনের উল্লিখিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রণোদনাগুলো অনুপস্থিত। অতএব তৈরি পোশাক শিল্পের নিরাপত্তা অর্জনের মডেল বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্পের জন্য প্রযোজ্য নয়।

দুর্যোগঝুঁকি মোকাবেলার জন্য কর্মক্ষেত্রে স্বতঃপ্রবৃত্ত ‘‌নিরাপত্তার সংস্কৃতি’ গড়ে তুলতে হবে

এ পর্যন্ত যা আলোচনা করা হলো তার ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে তৈরি পোশাক ছাড়া অন্যান্য শিল্পের কার্যালয় নিরাপত্তার জন্য নতুন কোনো ব্যবস্থা নিতে হবে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে একটা নিরাপত্তা সুরক্ষা মডেল কাজ করেছে, সেটা হলো তথাকথিত নিরাপত্তার সংস্কৃতি"বা"নিরাপত্তা সংস্কৃতি" (কালচার অব সেফটি বা সেফটি কালচার)। অনেক ক্ষেত্রে এ ‘‌সংস্কৃতি’ শব্দটা ভুল ব্যবহার আর অতিব্যবহারের ফলে একটা অস্পষ্ট সারবত্তাহীন বুলিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু উন্নত দেশগুলোয় ‘‌সংস্কৃতি’ শব্দটার সঙ্গে ‘‌নিরাপত্তা’ শব্দটা সংযুক্ত করে তৈরি করা ‘‌নিরাপত্তা সংস্কৃতি’ কথাটির একটা সুস্পষ্ট অর্থ আছে এবং সুনির্দিষ্ট বাস্তবতা আছে। উন্নত দেশগুলোয় চার দশক ধরে অনেক সংস্থা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং উৎপাদন কেন্দ্রে নিরাপত্তা সংস্কৃতি নির্মাণ করা হয়েছে এবং সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

একটি নিরাপত্তা সংস্কৃতি কীভাবে কাজ করবে তা পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য আসুন আমরা কল্পনা করি যে, এটি রূপগঞ্জের হাশেম ফুডস প্লান্টের মতো কোনো কর্মক্ষেত্রে কীভাবে কাজ করবে। যদি কোম্পানির একটি ভালো-কার্যকরী নিরাপত্তা সংস্কৃতি থাকে, তবে এর দুটি মৌলিক উপাদান থাকবে: (১) একটি সুপরিকল্পিত অগ্নিসুরক্ষা কর্মসূচি এবং (২) মালিক, ব্যবস্থাপক এবং শ্রমিকসহ সব অংশীজনের সুরক্ষা কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং কর্মসূচি সফল করার জন্য তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার। 

যেসব কার্যালয়ে আগুন লাগার সম্ভাবনা থাকে, সেখানে নিরাপত্তা সংস্কৃতির প্রথম উপাদান হলো, একটি সুপরিকল্পিত অগ্নিসুরক্ষা প্রোগ্রাম বা পরিকল্পনা, যাকে চারটি ভাগে ভাগ করা যা: (১) নিবারণ (প্রিভেনশন), (২) প্রকোপ প্রশমন (মিটিগেশন), (৩) অপসারণ (ইভাকুয়েশন) এবং (৪) চিকিৎসা সহায়তা। 

নিবারণ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে ভবনের নকশা প্রণয়নে এবং নির্মাণে অগ্নিসুরক্ষা কোডগুলো মেনে চলা, যথাযোগ্য সতর্কতার সঙ্গে এবং বিধিনিষেধ মেনে দাহ্য পদার্থ রাখা ইত্যাদি। প্রকোপ প্রশমন ব্যবস্থার মধ্যে থাকবে কারখানার বিভিন্ন জায়গায় ধূম্র শনাক্তকরণ যন্ত্র (স্মোক ডিটেক্টর) ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন এবং কোথাও কোনো ধোঁয়া বা আগুন শনাক্ত করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। আগুন লাগার ঘটনার শুরুতে অগ্নিনির্বাপণ দপ্তর এবং জরুরি সেবা দপ্তরকে ফোনে খবর দেয়াও প্রকোপ প্রশমন কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অপসারণ কার্যক্রমের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে আগুন লাগার সময় এবং এমনকি আগুন লাগার আগেও কোথাও ধোঁয়া শনাক্ত করা হলে কার্যালয়ে অবস্থানরত কর্মী এবং অন্যদের বিপদগ্রস্ত এলাকা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া এবং সেটা করতে হবে সম্ভব হলে অগ্নিনির্বাপণ দপ্তর বিপদগ্রস্ত কার্যালয়ে পৌঁছানোর আগেই। অপসারণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কার্যালয়টিতে আগুনের প্রকোপ থেকে দ্রুত বের হওয়ার জন্য জরুরি নির্গমন পথ থাকবে এবং সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হবে তার জন্য একটি পূর্বনির্ধারিত বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া (প্রটোকল) থাকবে। অগ্নিনির্বাপণ দপ্তর ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর তারা অগ্নিনিয়ন্ত্রণ ও বিপদগ্রস্তদের অপসারণের কাজ নেবে। চিকিৎসা সহায়তা ব্যবস্থার মধ্যে থাকবে অগ্নিকাণ্ডে আহত লোকদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া এবং পরে পূর্ণ চিকিৎসার জন্য একটি ক্লিনিক বা হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা; অগ্নিকাণ্ডে যদি কারো মৃত্যু হয়, মৃতদের যথাশিগগির ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা।

নিরাপত্তা সংস্কৃতির দ্বিতীয় উপাদান হলো অগ্নিসুরক্ষা কর্মসূচিতে একটি কোম্পানি বা সংস্থার সব অংশীজনের সক্রিয় ও অঙ্গীকারবদ্ধ সম্পৃক্ততা। সংস্থাটি একটি অগ্নিসুরক্ষা কমিটি অথবা টিম গঠন করবে। মালিক, ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা এই টিমে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই টিমের সদস্যরা অগ্নিসুরক্ষা কাজে নিজেকে এবং অন্যদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য স্বতন্ত্রভাবে এবং সমন্বিতভাবে কাজ করবেন। কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটার আগেই প্রস্তুতিমূলকভাবে অগ্নিসুরক্ষা কার্যক্রম অনুশীলনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে (যেমন এক বা তিন মাস পরপর) মহড়ার ব্যবস্থা থাকবে। অগ্নিসুরক্ষা প্রচেষ্টা সফল করার জন্য সব অংশীজনের সুদৃঢ় অঙ্গীকার এবং প্রত্যয় থাকতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কিংবা একটা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপকরা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ বা কর্মপ্রচেষ্টার মূল নেতা। নিরাপত্তা সংস্কৃতি নির্মাণে এবং কার্যকর করার জন্য এ নেতাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা দেশটির ৯২টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ এবং দেখভাল করে। এ সংস্থার মতে নিরাপত্তা সংস্কৃতি হলো, একটি প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধ এবং আচরণ যা পারমাণবিক সুরক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় এবং প্রতিষ্ঠানটির নেতারা তার (এ মূল্যবোধ ও আচরণের) অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা তা আত্মস্থ করেন। কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিতে তাদের অনুসৃত নীতি ও সংস্কৃতি থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার আছে।

[বাকি অংশ আগামীকাল ]

ড. মোহাম্মদ হারুন উজ জামান: পারমাণবিক প্রকৌশলী