শ্রমিকদের শ্রমের মধ্য দিয়ে শিল্প-কারখানার উৎপাদন সচল থাকে। এক্ষেত্রে শ্রমিকরা মুখ্য ভূমিকা রাখলেও তাদের কাজ করতে হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। ফলে শ্রমিকরা নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন ধরে এমনটি চলে এলেও এর কোনো প্রতিকার নেই। এতে শ্রমিকদের মানবাধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন হচ্ছে। শ্রমিকরা যেন স্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে পারেন এটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষের। এর ব্যত্যয় কিছুতেই কাম্য নয়, কারণ শ্রমিকরাও মানুষ। সুতরাং তাদের মানবাধিকারের বিষয়ে অবহেলা কাম্য নয়।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশের বিভিন্ন খাতে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কাজ করছেন। ২০২২ সালে দেশে ৭ কোটি ৪ লাখ শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩২ শতাংশ শ্রমিক ধুলো, শব্দ ও কম্পনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতেন। আর তীব্র ঠাণ্ডা ও গরমের মধ্যে কাজ করতেন ৩০ শতাংশ। এমন পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে প্রায় ২৪ লাখ ১০ হাজার শ্রমিক দুর্ঘটনায় পড়েছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২-এ এমন চিত্র উঠে আসে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় উচ্চশব্দ কিংবা ধুলোবালিতে কাজ করলে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। এক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় উচ্চশব্দের মধ্যে কাজ করলে শ্রবণশক্তি কমে যায়। এমনকি বধির হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে। আবার উচ্চশব্দে মস্তিষ্কে এক ধরনের বিরক্তি তৈরি হয়, যা ব্যক্তির আচরণকে রুক্ষ করে তোলে। এছাড়া এ ধরনের কর্মপরিবেশে নিদ্রাহীনতা, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগের তীব্র ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কর্মরত শ্রমিকদের সাড়ে ১৬ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রের সঙ্গে কাজ করেন। প্রায় ৭ শতাংশ শ্রমিক রাসায়নিক বিস্ফোরক দ্রব্যের সঙ্গে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। আগুন ও গ্যাসযুক্ত পরিবেশে কাজ করেন ৫ দশমিক ৪ শতাংশ শ্রমিক। আর তাদের প্রায় ৪ শতাংশ মাটির নিচে বা অধিক উচ্চতায় কর্মরত আছেন। দেশে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত শ্রমিকদের প্রায় ৮৭ শতাংশ পুরুষ ও বাকি ১২ শতাংশ নারী।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে শিল্পের অবদান বাড়লেও সেভাবে কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। ফলে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে। সরকারি নজরদারি না থাকায় এ খাতে কর্মপরিবেশ খারাপ। দীর্ঘ সময় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করার ফলে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যহানি থেকে শুরু করে নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে জাতীয় পর্যায়ে মোট শ্রমিকের প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। যাদের মধ্যে ৬২ শতাংশ শ্রমিক কমপক্ষে একবার, ২৫ শতাংশ দুইবার এবং ৮ শতাংশ শ্রমিক তিনবার দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। এক বছরে প্রায় ২ শতাংশ শ্রমিক পাঁচ থেকে নয়বার পর্যন্ত দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা দিতে হবে। এ আইন না মানার ফলেই দুর্ঘটনার সংখ্যা কমছে না। এছাড়া বিভিন্ন কল-কারখানায় অনেক শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসংস্থানে জড়িত রয়েছে। এটিও বেশ উদ্বেগের বিষয়। তাই কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক্ষেত্রে অবহেলা করা যাবে না। এজন্য শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত থেকে আহত হলে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
যদিও পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসের হিসাব অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা কমছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ মালিক ও শ্রমিকরা আগের তুলনায় সচেতন হচ্ছেন। শিল্পোদ্যোক্তারাও দাবি করছেন, বর্তমানে দেশে আগের তুলনায় কর্মপরিবেশ অনেক উন্নত হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে কাজের পরিবেশের উন্নতি না হলে পরিস্থিতি বদলাবে না। তাই শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।
বর্তমানে দেশে পরিবেশবান্ধব ২০২টি সবুজ কারখানা রয়েছে। ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় কারখানাগুলোয় উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি মিলেছে তার সফল বাস্তবায়ন কাম্য। এজন্য অগ্নিনিরাপত্তাসহ স্বাস্থ্যকর পরিবেশের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া যাবে না। বস্তুত বহির্বিশ্বের বাজারে আমাদের ক্রয়াদেশের স্বার্থেই কর্মপরিবেশ বজায় রাখতে হয়। এটিকে বিবেচনা করা হলেও শিল্প-কারখানাগুলোয় আন্তর্জাতিক সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমরা প্রত্যাশা করব, আমাদের শিল্প-কারখানাগুলো ভবিষ্যতে কর্মীবান্ধব ও স্বাস্থ্যকর কাজের পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হবে।










