বিশ্ব এমন একটি অর্থনৈতিক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে যখন জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পুনর্গঠনের জন্য সরকারগুলোর কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ অত্যাবশ্যক। কিন্তু বিশ্বের সরকারগুলো কি তার জন্য প্রস্তুত?

ইতিবাচক পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেয়া ও তা অর্জনের ক্ষেত্রে সরকারগুলোর সক্ষমতা নিয়ে প্রায় সব দেশেই সংশয় রয়েছে। এমন সংশয় অবশ্য অপ্রত্যাশিত নয়। অনেক দেশেই আমজনতার আদর্শিক মেরুকরণের সঙ্গে সঙ্গে সরকার ব্যবস্থায় কর্তৃত্ববাদ জেঁকে বসেছে; কর্তৃত্ববাদ ও আদর্শিক মেরুকরণ অবশ্য একে অন্যের পরিপূরক। যার ফলে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বৈশ্বিক সমস্যাগুলো সমাধানের নিমিত্তে সামষ্টিক কোনো উদ্যোগ নিতে পারছে না।

বিশ্বের সরকারগুলোকে নিয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো যে অর্থনীতিতে ইতিবাচক কাঠামোগত পরিবর্তন আনার জন্য এদের না আছে পর্যাপ্ত তথ্য ও জ্ঞান, না আছে সামর্থ্য। অভিযোগ রয়েছে, সরকারকে বেশি ক্ষমতা দিলে তারা ভুল জায়গায় পয়সা ঢালে ও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের স্বার্থ রক্ষার ক্রীড়নক হয়ে দাঁড়ায়। এখানেই হলো নব্য উদারনৈতিকতাবাদের গোড়ায় গলদ। এ সমস্যা উত্তরণে সরকারগুলোকে নব্য উদারনৈতিকতাবাদের উত্তরসূরি শাসন ব্যবস্থাগুলো, – যেমন প্রবৃদ্ধিবাদ বা প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক নীতিনির্ধারণী প্রবণতা – থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

বস্তুত সরকারগুলোর বস্তুনিষ্ঠ আলোচনায় দেখা যাবে, এদের নীতিগত অবস্থান কখনই স্থির নয় এবং খুব পরিবর্তনশীলও না। বরং একবার যথাযথ লক্ষ্য স্থির করলে এরা সময়ের সঙ্গে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সমস্যা সমাধানের সামর্থ্য অর্জন করতে পারে। পারে আস্থা অর্জন করতে।

সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রধান আত্মজিজ্ঞাসা হওয়া উচিত—‘আমরা কি সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ ও সরকার ব্যবস্থার সঠিক পন্থাটি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি?’, ‘আমাদের কি সক্ষমতা আছে?’ —এটা নয়।

সংশয়ী লোকজন বলতে পারেন যে এটি তত্ত্ব হিসেবে শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এটি এখনো অর্জনযোগ্য নয়। শুধু চারপাশে তাকান, প্রায় সব জায়গায় সরকারের শাসন ব্যবস্থাকে আপনি ব্যর্থ দেখতে পাবেন—স্থানীয়ভাবে, জাতীয়ভাবে ও বৈশ্বিকভাবে। কিন্তু এক্ষেত্রে কলম্বিয়া ল’ স্কুলের চার্লস স্যাবেল এবং সান ডিয়েগোতে অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির ডেভিড ভিক্টর নতুন একটি বইয়ে দেখিয়েছেন, কার্যকর সরকার ব্যবস্থা বিরাজমান আছে এবং এরই মধ্যে তা বড় পার্থক্যও দেখিয়েছে। এ চর্চা আছে, এক্ষেত্রে তত্ত্বটির ঘাটতি রয়েছে।

স্যাবেল ও ভিক্টর জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর আলোকপাত করেছেন, যেটি আমাদের সময়ে সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। এটি মোকাবেলা করা সরকার ব্যবস্থার জন্যও দ্বিগুণভাবে কঠিন। নীতিনির্ধারণগুলো শুধু জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর হলেই হবে না। বৈশ্বিকভাবে ভিন্ন স্বার্থ ও পরিস্থিতির রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও সমঝোতা হতে হবে।

স্যাবেল ও ভিক্টর ১৯৮৭ সালের মন্ট্রিয়ল প্রটোকলের ভিত্তিতে তাদের উদাহরণ তৈরি করেছেন, যা ওজোন স্তর অবক্ষয়ে প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে সফল হয়েছে এবং বর্তমানে ওজোন স্তর পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় আছে। শুরু থেকেই ওজোন স্তর হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তন একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মতো মনে হয়েছে। কারণ দুটো বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণভাবে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত এবং অগ্রগামী ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির পার্থক্যের মধ্যে বিবেচনাযোগ্য। এজন্য ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত জলবায়ুর ওপর জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনে ‘দ্য ফার্স্ট গ্লোবাল এগ্রিমেন্ট’ মন্ট্রিয়ল প্রটোকলকে এটির মডেল হিসেবে গণ্য করেছে।

দ্য মন্ট্রিয়ল প্রটোকল ও ইউএনএফসিসিসি উভয়টিই ওজোন স্তর হ্রাস এবং গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ এড়াতে একটি নির্দিষ্ট তারিখে কিন্তু ক্ষুদ্র আঙ্গিকে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিজ্ঞার ভিত্তিতে খুব মৃদুমাত্রায় শুরু হয়েছিল। তবে দুটো সময়ই খুব ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়েছে। যখন প্রযুক্তিগত সমস্যা এড়াতে মন্ট্রিয়ল প্রটোকল বিভিন্ন সংস্থা ও সরকারকে স্থির অগ্রগতি এনে দিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন চুক্তিগুলো বারবার স্থবিরভাবে বৈশ্বিক সমঝোতায় শেষ হয়েছে।

স্যাবেল ও ভিক্টর দুটো ভিন্ন সময়ের মূল পার্থক্যের ক্ষেত্রে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। মন্ট্রিয়ল প্রটোকল বিভিন্ন কমিটি গঠন করেছে, যা ওজোন স্তর হ্রাস নিরসনের জন্য নিয়োজিত সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে জাতীয় নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ও বিজ্ঞানীদের প্রযুক্তিগত বিকল্প খোঁজার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই কমিটি ও সংস্থাগুলো ক্ষুদ্র আকারে শুরু করেছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আমাদের জ্ঞান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অঙ্গ সংগঠনগুলোর বর্ধন হয়েছে, তাদের সক্ষমতা বেড়েছে এবং পরস্পরের মাঝে আস্থার সম্পর্ক বেড়েছে। পন্থাটি কাজে লেগেছিল, কারণ প্রকৃত সমস্যার সমাধান স্থানীয় পর্যায়ে হস্তান্তর করা হয়। মূলত সংস্থাগুলো প্রযুক্তিগতভাবে জানত—কীভাবে এটি করা যায়। যখন উদ্ভাবনটি স্থবির হয়ে গেল, লক্ষ্যগুলো পুনরায় নির্ধারণ করা হয়। এর ফলাফল ছিল মাঠপর্যায়ে উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে গুণগত প্রস্থান এবং শীর্ষ পর্যায়ে উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা।

জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে বৈপরীত্য হিসেবে সংস্থাগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাহুর দৈর্ঘ্যে থেকেছে। এক্ষেত্রে তারা পরে প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে ভীতি থেকে যায়। কিন্তু এটি স্বার্থের সংঘাত হিসেবে গেঁথে বসে এবং উদ্ভাবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

মন্ট্রিয়ল প্রটোকল পরীক্ষামূলক সরকার ব্যবস্থার কেবল সফল নজির নয়, যেটি স্যাবেল ও ভিক্টর দেখিয়েছেন। এক্ষেত্রে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সির জ্বালানি খাত (এআরপিএ-ই) থেকে শুরু করে আয়ারল্যান্ডের কৃষিদূষণের সময়ে অতিরিক্ত উদাহরণ হিসেবে দীর্ঘ পরিসরে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে দেখা গেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে শূন্যমাত্রার পরীক্ষাগুলো উচ্চমাত্রার লক্ষ্যকে নির্ধারিত করেই হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সফল চর্চাগুলো এসব সহযোগিতা থেকেই আবির্ভূত হয়েছে এবং কাঠামোবদ্ধভাবে প্রচার ও মান নির্ধারণ করতে পেরেছে।

এ সফলতার গল্প শুধু পরিবেশগত নীতির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কেননা এআরপিএ-ই মূলত ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সির (ডিএআরপিএ) পরে তৈরি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ সংস্থা ইন্টারনেট এবং জিপিএসসহ আমাদের বর্তমান সময়ের কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবনের জন্য কৃতিত্বের দাবিদার। স্থানীয় পর্যায়ে সবচেয়ে সফল উদ্যোগগুলো ছিল সমাজকে পুনরায় উজ্জীবিত করা এবং ব্যক্তি মালিকানা ও সরকারি সহযোগিতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান তৈরি করা। এর ফলে একত্রে প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানগুলো করা এবং ব্যবসা, অলাভজনক গোষ্ঠীগুলো ও সরকারি কর্মকর্তাদের অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য নতুন পথ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে কার্যকর জাতীয় শিল্পনীতিগুলো একই সহযোগিতাপূর্ণ এবং বিভিন্ন বিভাগের অভিমুখে ধাবিত হয়েছে।

স্যাবেল ও ভিক্টরের ব্যাখ্যার মতো এসব ক্ষেত্রে সাধারণ কৌশল উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভূমিকা রাখলেও কিছু ক্ষেত্রে অসৎ উদ্দেশ্যের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। তাই ত্রুটি ও ভুল সূচনা থাকলেও যারা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবেন তাদের অবশ্যই গভীর অনিশ্চয়তা সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে। এখানে অবশ্যই বিবদমান পক্ষগুলোর জন্য সর্বাপেক্ষা বিশদ এবং সঠিক তথ্য থাকতে হবে, গতানুগতিক সংস্থাগুলোর জন্য সমাধান খোঁজার লক্ষ্যে সরকারি সংস্থাগুলোকে অবশ্যই কিছু দণ্ড (কর্তৃত্বের হুমকি) জড়ো করতে হবে এবং সুস্বাদু গাজরের ন্যায় প্রণোদনা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। 

কারণ সফলতা পুনরায় বিশ্লেষণ ও যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে লক্ষ্য নির্ণয় এবং উন্নতি পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। যখন সমাধান প্রকাশ পাবে, সেগুলো মান এবং নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সাধারণভাবে তুলে ধরবে। উদ্ভাবন এ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে নির্ভর করে, কারণ উচ্চ জীবনমান (পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও উত্তম কর্মসংস্থান) উন্নত উৎপাদনশীলতার ওপর নির্ভর করে।

এ ধরনের নীতিনির্ধারণ বিদ্যমান কর্মপন্থাগুলো অবধারিতভাবে ভিন্ন। উদ্ভাবনমূলক সরকার ব্যবস্থায় ‘রাষ্ট্র বনাম বাজারের’ দ্বন্দ্বটি অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্র ও বাজারের সম্পর্ক একে অন্যের পরিপূরক, দ্বন্দ্বময় নয়। তবুও অর্থনীতিবিদদের টপ-ডাউন নীতিনির্ধারণ এক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক।

বৈশ্বিক সমস্যাগুলো সমাধানে প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থা ও চিন্তা কাঠামোগুলোকে অতীতের ব্যর্থ ও অকার্যকর ভাবাদর্শগুলোকে অতিক্রম করে যেতে হবে। সৌভাগ্যবশত, সমস্যা সমাধানে পারঙ্গম সরকার ব্যবস্থার মডেলের উদাহরণও কম নেই দুনিয়ায়।


স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট 

ড্যানি রড্রিক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতি, জন এফ কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্ট, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়।

ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: তৌফিকুল ইসলাম