আবহমান কাল ধরে বিশ্বে নারীদের ওপর গৃহস্থালি ও সেবামূলক কাজের ভার ন্যস্ত রয়েছে। কারণ হিসেবে দর্শানো হয় নারীর সহজাত (মাতৃসুলভ) প্রবৃত্তিকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে বিশ্বের অনেক দেশে এখন পারিবারিক কাজের অংশীদারত্বমূলক পুনর্বণ্টন হয়েছে। নারী-পুরুষ উভয়ই গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজ করে থাকে; নারীর অবৈতনিক কাজকে মূল্যায়ন করা হয় এবং মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখা হয়। কেননা সময়ের বিবর্তন এটি স্পষ্ট করেছে যে মাতৃত্ব কেবল জৈবিক ঘটনা নয়, সমাজ-সংস্কৃতিও এতে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। যাকে আমরা বইয়ের ভাষায় বলে থাকি ‘সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া’। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জেন্ডার রোল গড়ে ওঠে—নারী আর পুরুষের সামাজিক দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়। শৈশব থেকেই কন্যাসন্তানকে শেখানো হয় রান্না থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্যদের সেবা প্রদানের কাজ। অর্থাৎ তাকে গড়ে তোল হয় ভবিষ্যতের যত্ন প্রদানকারী (কেয়ারগিভার) হিসেবে। যেখানে পুরুষকে এ থেকে বিরত রাখা হয় এসব কাজকে ‘মেয়েলি’ সম্বোধন করে। আর তাদের শেখানো হয় তথাকথিত পুরুষালি কাজ—ঘরের বাইরে শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়া। যদিও সময়ের পরিক্রমায় গৃহস্থালি কাজকে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করা হলে তা পারিবারিক কাজের পুনর্বণ্টনে সহায়তা করে। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজের রীতিনীতি তেমন একটা পাল্টে যায়নি। এখনো এখানে পারিবারিক কাজের প্রতিশব্দ নারী। একদিকে নারীর কাজকে খাটো করে দেখা হয়, অন্যদিকে নারীর প্রতি সহিংসতাও বাড়ায় এ মনোভাব। কাজেই নারীর অবৈতনিক কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। এ স্বীকৃতি দেয়া হলে তা দায়িত্বের পুনর্বণ্টন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। 

গৃহস্থালি কাজের জন্য নারীরা বেতন পান না। জাতীয় আয় গণনায় নারীদের দায়িত্বে থাকা গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজকে অনুৎপাদনশীল বিবেচনা করা হয়। যেহেতু সেগুলো দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কোনো মাত্রা যোগ করে না। অথচ ২০২১ সালে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) পরিচালিত গৃহস্থালিতে নারীদের অবৈতনিক কাজের অর্থনৈতিক মূল্য জরিপে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের নারীরা গৃহস্থালিতে অবৈতনিক যে কাজ করেন, টাকায় তার মূল্য ৫ হাজার ৩০৭ বিলিয়ন টাকা। ২০২১ সালের হিসাবে এ টাকা জিডিপির ১৪ দশমিক ৮ শতাংশের সমপরিমাণ। বিপরীতে পুরুষের অবৈতনিক কাজের অবদান জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশ সমপরিমাণের। বিআইডিএসের তথ্যমতে, নারীর কাজের ৮১ শতাংশের কোনো মূল্যায়ন হয় না। পুরুষের ক্ষেত্রে মূল্যায়নের বাইরে থাকে শুধু ১৮ শতাংশ কাজ।

নারীর কাজের মূল্যায়ন জিডিপিতে প্রকাশ পেলে দেশের অর্থনীতিতে এটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। নারীদের অবৈতনিক কাজের স্বীকৃতি ‘কেয়ার ইকোনমির’ আকার বাড়াবে। পাশাপাশি নারীর পেশার প্রতি গতানুগতিক ধারণার পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে, বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ প্রবীণ নাগরিক রয়েছেন। ২০২৫ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে ১ কোটি ৮০ লাখ আর ২০৫০ সাল নাগাদ হবে প্রায় সাড়ে চার কোটি। অর্থাৎ এ বিপুল পরিমাণ বয়স্ক মানুষের দেখভালের জন্য কেয়ারগিভারের চাহিদা আরো বাড়বে। নারীর অবৈতনিক সেবামূলক কাজের স্বীকৃতি এ বাড়ন্ত চাহিদা পূরণ করতে পারে। নারীর সেবামূলক কাজের অগ্রযাত্রাকে গতিশীল রাখতে তার কাজকে মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেয়া জরুরি। তবে কেবল কেয়ার ইকোনমির জন্য নয়, পারিবারিক কাজের অংশীদারত্বমূলক বণ্টনের বিষয়টিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ স্বীকৃতি আমাদের সামাজিক রীতিনীতি এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের ধারণায় পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন।

নারীর বৈতনিক কাজের চেয়ে অবৈতনিক কাজের মূল্য তিন গুণ বেশি। স্যাটেলাইট সিস্টেম অব অ্যাকাউন্টসের মাধ্যমে নারীর অবৈতনিক কাজগুলো অর্থনৈতিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া সম্ভব। এর আর্থিক মূল্য জাতীয় বাজেটের কত অংশ তা জানা গেলে অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব। 

দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য নারীর অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের মূল্যায়ন ও মর্যাদা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কত শতাংশ নারী পারিবারিক কাজের দরুন মূলধারার শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারে না তা চিহ্নিত করা যাবে। সেক্ষেত্রে বাধাগুলো চিহ্নিত করে নীতিগত পরিবর্তন আনা সহজ হবে। ২০১৬ সাল থেকে শুরু হওয়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় সরকারি সেবা অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষা নীতিমালার মাধ্যমে অবৈতনিক পরিচর্যাকার্য ও গৃহস্থালিকাজের মর্যাদা ও স্বীকৃতিদান এবং খানা ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে জাতীয়ভাবে যুক্তিযুক্ত অংশীদারত্বমূলক দায়িত্ব পালনকে উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ যদি এ টেকসই লক্ষ্য অর্জনে সফল হতে চায় তাহলে নারীর অবৈতনিক কাজের মূল্যায়ন ও মর্যাদা স্বীকৃতি প্রদান করা আবশ্যক। 

তবে নারীদের অবৈতনিক কাজের স্বীকৃতির সঙ্গে আরেকটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেটি হলো নারীদের আয়মূলক কাজকে প্রকৃত অর্থনীতির হিসাবে আনা। বর্তমানে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে অনলাইন-ভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। সেগুলো প্রকৃত অর্থনীতির আওতায় আনা যেমন জরুরি, তেমনি সেগুলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আনতে হবে। বিভিন্ন প্রণোদনা ও ঋণসহায়তার মাধ্যমে এ কাজ করা সম্ভব। নয়তো কেবল অবৈতনিক কাজের স্বীকৃতি দিয়ে নারীদের কাজের পরিপূর্ণ মূল্যায়ন হবে না। পাশাপাশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীদের কাজকে সুসংগঠিত করা প্রয়োজন। পরিসংখ্যান বলছে, শ্রমবাজারে নারীর সংখ্যা বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। বিশেষত দেশের প্রাণিসম্পদ ও কৃষি খাতে বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদ খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ। যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ মাত্র ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। আবার জাতীয় জনসংখ্যা এবং শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, গত ৪৭ বছরে কৃষিতে নারীর সংখ্যা শতকের ঘর থেকে কোটিতে উন্নীত হয়েছে। এসব খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক করতে পারলে নারীরা তাদের অর্থনৈতিক অবদানের অগ্রযাত্রা আরো ত্বরান্বিত করতে সমর্থ হবে। তবেই নারীর কাজের মাধ্যমে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতি বাড়বে বলে আশা করা যায়।