ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতা বিরাজ করছে। ব্যাংক খাতে ক্রমেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। সম্প্রতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করা হয়েছে। অনেকেই আশা করেছিল, এ বাজেটে ব্যাংক খাতের সংস্কার ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপের নির্দেশনা থাকবে। কিন্তু সেই বিষয়ে কোনো জোরালো পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়নি। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি এখন প্রায় ১০ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী অর্থবছর ব্যাংকগুলোয় আমানত বাড়তে পারে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা। এ আমানত থেকেই সরকার ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। সেক্ষেত্রে ব্যাংকের নতুন আমানতের ৮২ শতাংশই যাবে সরকারি খাতে। আর বেসরকারি খাতে যাবে ১৮ শতাংশেরও কম।
কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান ৮৬ শতাংশ। আর সরকারি খাতের অংশ মাত্র ১৪ শতাংশ। কিন্তু ঋণ গ্রহণের দিক থেকে আমরা বিপরীত পরিস্থিতি লক্ষ করছি, যা মোটেই কাম্য নয়। তবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারি-বেসরকারি খাতের অবদান অনুপাতেই ব্যাংক ঋণ বিতরণ করা উচিত। তাহলে দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণও বাড়বে। তবে সরকার ঘাটতি মেটাতে ঋণ গ্রহণের যে লক্ষ্য ঘোষণা করেছে তা কার্যকর হলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। এতে দেশের অর্থনীতি আরো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ঠিক রাখতে হলে সরকারকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা নিতে হবে। খেলাপিদের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কথা মাথায় রেখেই সরকারের ব্যাংক ঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
দেশের বেসরকারি খাত এমনিতেই এখন তারল্য সংকটে ভুগছে। চাহিদা অনুপাতে চলতি মূলধন না পাওয়ায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ফলে সংকুচিত হয়ে পড়ছে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য। এছাড়া তারল্যের সংকট চলছে দেশের পুঁজিবাজারেও। এ পরিস্থিতিতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাত আরো নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।
সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বর্তমানে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হার এবং জ্বালানি। বাজেটে এসব বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। আবার ঘাটতি বাজেটের পুরোটাই আসবে ব্যাংক ও বৈদেশিক উৎস থেকে। দেশে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংক খাতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। আস্থাহীনতাসহ বিভিন্ন কারণে আমানতকারীদের অনেকেই ব্যাংকে টাকা রাখছেন না। আবার ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার দুটিই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা ছিল। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩৬ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা বেড়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে গড় খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯ শতাংশ। মাত্র তিন মাস পর খেলাপির এ হার ১১ দশমিক ১১ শতাংশে ঠেকেছে। মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৪০ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা।
এ অবস্থায় সরকার যদি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় তাহলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যাংক খাত থেকে সরকার ঋণ নিয়ে তা অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করে থাকে। বিশেষ করে উন্নয়নমূলক কাজ, কর্মকর্তাদের বেতন ও বিদেশী ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়। ফলে ঋণপ্রবাহ ও প্রবৃদ্ধি কমে যায়। বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত আয়, ব্যয় এবং ব্যাংকের আয় এবং অবশেষে সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে যাবে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি বিঘ্নিত হবে। তৈরি হবে বেকারত্ব।
দেশে কয়েক বছর ধরেই আমানতের চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি বেশি। প্রত্যাশা অনুসারে, আমানত না পাওয়ায় দেশের বেশির ভাগ ব্যাংকই তারল্য সংকটে ভুগছে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা এ সংকট এখন আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। বেশির ভাগ ব্যাংক দৈনন্দিন লেনদেন মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রেপোসহ বিভিন্ন মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি ধার নিয়ে চলছে। সরকার আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে পরিস্থিতি আরো কঠিন হবে। এর সার্বিক প্রভাব গিয়ে পড়বে জাতীয় আয়ে।
কিন্তু ব্যাংক থেকে উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়ে তা ব্যবসা-বাণিজ্য ও কলকারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ করতেন। এতে দেশের অর্থনীতি গতিশীল হবে। তৈরি হবে কর্মসংস্থান। সার্বিকভাবে তা জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তবে যেহেতেু দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক দীর্ঘদিন ধরেই নিম্নগামী। তাই ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয় অর্ধেকে নামিয়ে আনা দরকার ছিল। তাতে বাজেটের ঘাটতির পরিমাণ কমে যেত। তখন ব্যাংক খাত থেকে সরকারকে ঋণ নিতে হতো না। এতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হতো। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় দেশে ক্রমেই বেকারত্বের হার বাড়ছে। তাই বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারের পদক্ষেপ অতীব জরুরি। কিন্তু সে ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।
সার্বিক আর্থিক খাতের উন্নয়নে এ সময়ে কিছু শক্ত সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। ব্যাংক খাতের সংস্কার জরুরি। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেই, শক্ত ব্যবস্থার বিষয়ে কোনো কিছু নেই। তাই এসব ব্যবস্থার উন্নয়নে এমন কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার যাতে প্রকৃত বিনিয়োগ বাড়ে।
কর্মসংস্থানে সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত। সরকার ব্যাংক খাত থেকে যদি ঋণ নেয় তাহলে এ খাতের কী হবে? এ খাত ঋণ না পেলে বিনিয়োগ কমে যাবে এবং কর্মসংস্থানও কমে যাবে। আবার এ খাতে অর্থায়ন নিশ্চিত না করতে পারলে ব্যবসা-বাণিজ্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য কমে গেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর আদায় করবে কোথা থেকে? এর অর্থ দেশের মূল্যস্ফীতিও কমবে না। আবার কর্মসংস্থানও বাড়বে না। ফলে প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
বাজেটে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। শুধু বলা হয়েছে বিনিয়োগ বিনির্মাণ। এর অর্থ, বাইরে থেকে বিনিয়োগ আসবে। দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উপযোগী পরিবেশ আমরা সৃষ্টি করতে পারছি? কেননা দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মদক্ষতা কম। দুর্নীতির কারণে প্রতিটি পদে ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের। এসব ক্ষেত্রে নেই সুশাসন ও জবাবদিহিতা। তাহলে বিদেশী কোম্পানিগুলো কেন এ দেশে বিনিয়োগ করবে? আবার যেসব কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে তারা তাদের লভ্যাংশ ডলার সংকটের কারণে নিয়ে যেতে পারছে না। তাই এসব বিষয়েও সরকারের ভাবা দরকার।
সরকার বিদেশী ঋণ, সুদ ও ভর্তুকির মতো ব্যয় মেটাতে কর অব্যাহতি ও শুল্ক করে ছাড় কমিয়ে রাজস্ব আয়ের যে কৌশল গ্রহণ করেছে, তাতে শুধু মধ্যবিত্ত নয়, নিম্ন ও উচ্চ বিত্তদের ওপরও নানা ক্ষেত্রে করের চাপ বাড়বে। বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি হবে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে সে রকম সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। বেসরকারি খাতের উন্নয়নে সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।










