বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখার সমস্যা হলো—এর শুরু কোথা থেকে হবে? কেউ মনে করেন, সাতচল্লিশের দেশভাগ হবে ভিত্তি বছর। কারো মতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু এ দুই দিক পরিবর্তনকারী ঘটনার আগেও যে এ জনপদে মানুষ ছিল, তাদের নিজস্ব রাজনীতি-সংস্কৃতি ও সমাজ ছিল, সেটাও আমাদের মনে রাখতে হবে।
১৯৪৭ সালে যখন দেশভাগ হয় পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান এটা চূড়ান্ত ধরে নিয়েছিল; অবিভক্ত ভারতে হিন্দু সম্প্রদায়ের কর্তৃত্ব থেকে মুক্তি পাওয়াকেই তারা একমাত্র লক্ষ্য ভেবেছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগে সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বে যে অবিভক্ত বাংলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তা সে রকম জনসমর্থন পায়নি। তার আগেই গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং হয়ে গেছে; বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান ঐক্য নয়, বিভাজনে মুক্তি দেখেছে। সারা ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমান যে যুক্তিতে দেশ ভাগ চেয়েছে, সেই যুক্তিতেই সংখ্যালঘু বাঙালি হিন্দু বাংলা ভাগ চেয়েছে। তারা দেখেছে শিক্ষা-দীক্ষা ও সম্পদে এগিয়ে থেকেও কেবল সংখ্যার কারণে তারা ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলায় সেই অর্থে মুসলিম শাসনই জারি ছিল। পরবর্তীকালে যেসব নেতা বাংলাদেশের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ। তারা সবাই তখন পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা ও কর্মী ছিলেন।
আবার যে বাঙালি মুসলমান নেতৃত্ব পাকিস্তানি শাসন ও কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ২৪ বছর আন্দোলন সংগ্রাম করেছে, স্বাধীন বাংলাদেশে তারা গণতন্ত্রের ভিত সংহত করতে পারেনি। এর জন্য ক্ষমতাসীন না বিরোধী দল বেশি দায়ী ছিল তা নিয়ে আমরা বিতর্ক করতে পারি, কিন্তু বাস্তবতা হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই রয়ে গেছে। গণতন্ত্র হলো অব্যাহত অনুশীলন, ভিন্নমতকে নিয়ে একসঙ্গে চলা। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেনি।
বাংলাদেশে গত ৫১ বছরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে যতটা ঐক্য দেখি, তার চেয়ে বেশি প্রত্যক্ষ করি বিভেদ, যতটা সহনশীলতা প্রত্যাশা করি, তার চেয়ে বেশি শঙ্কায় থাকি সংঘাত নিয়ে। এ মুহূর্তে নির্বাচন নিয়ে দেশের যে সংকট চলছে; সেটি আসলে গণতন্ত্রেরই সংকট। এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আরেকটি সুষ্ঠু নির্বাচনের বন্দোবস্ত করতে পারলেও (না পারার সম্ভাবনাই বেশি) গণতন্ত্র অধরাই থেকে যাবে।
লেখক-গবেষক মাহমুদ রেজা চৌধুরী তার আশা ও আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ-এ গত সাত দশকের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করেছেন। পৌনে চারশ পৃষ্ঠার বইয়ে তিনি রাজনীতির অতীত ও বর্তমান বিশ্লেষণ করেছেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ও শঙ্কা দুই-ই ব্যক্ত করেছেন। এটি কেবল তার একার কথা নয়, আমাদের সমাজের অনেক ভাবুক চিন্তক ও বিশ্লেষকেরও অভিমত। মাহমুদ রেজা চৌধুরী ভূমিকায় যথার্থই লিখেছেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সমালোচনায় (পরনিন্দা), বিশেষ করে প্রতিপক্ষের সমালোচনা ও আলোচনায়, আমাদের মাত্রাজ্ঞান কাজ করে না, আবেগ ও উত্তেজনায় অবমূল্যায়নের অংশেই ভরে যায়। ব্যক্তিগত ও দলীয় ভালো লাগা না লাগাই প্রাধান্য পায়, স্বচ্ছ চিন্তাভাবনা নয়। এটা আমাদর রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই এক ধরনের বাস্তবতা।
‘বাংলাদেশকে জানতে গেলে এর অতীত ইতিহাস জানা অপরিহার্য’—এ তাগিদ থেকে লেখক বাংলাদেশের সাত দশকের সমাজ কাঠামো, আন্দোলন-সংগ্রাম, সাহস ও আপসকামিতা, বিভিন্ন শাসনামলের ইতি-নেতি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি তার মতো ইতিহাসের বয়ান ও রাজনীতির আখ্যান তুলে ধরেছেন। অতীত নিয়ে আমরা যত ব্যাখ্যাই করি না কেন, পাল্টে দিতে পারি না। অতীত ও বর্তমানের ভুল থেকে শিক্ষা একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারি। সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও জনগণের বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভাবতে পারি।
মাহমুদ রেজা চৌধুরী শুধু ইতিহাস বিশ্লেষণ করেননি; রাষ্ট্র ও সমাজকে কীভাবে সামনে এগিয়ে নেয়া যাবে; সে সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষীর উদ্ধৃতি দিয়ে পথনির্দেশ করেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, আমাদের পূর্বসূরি ও সহযাত্রী লেখক-চিন্তকদের কথা যদি রাজনীতিকরা আমলে নেন, তাহলে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। আরো অনেকের মতো এটা লেখকের শুভ ইচ্ছার কথা। সদার্থক ভাবনার কথা। কিন্তু আমাদের এও মনে রাখতে হবে যে রাজনীতিকরা লেখক-বুদ্ধিজীবীদের কথা ততটুকুই শোনেন, যতটুকু তাদের পক্ষে যায়। বিপক্ষে গেলেই তারা শত্রুজ্ঞান করেন।
মাহমুদ রেজা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি শাসনামল ধরে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন, যেখানে ইতির চেয়ে নেতির পাল্লাই ভারী। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর যে স্বপ্ন ও আশা নিয়ে বাংলাদেশ যাত্রা করেছিল, তার প্রায় সবগুলোই আমরা হারাতে বসেছি।
বইটি শুরু হয়েছে ইতিহাসের দিক পরিবর্তনকারী পাঁচ রাজনীতিকের জীবনালেখ্য নিয়ে। শেষ হয়েছে আশা-নিরাশা ও আকাঙ্ক্ষার সারসংক্ষেপ দিয়ে। মাঝখানে তিনি বাঙালির রাষ্ট্র কাঠামো, ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানি শাসনামল, বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতার চালচিত্র বিশ্লেষণ ধরেছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি আমলের তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। তবে বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো, বাংলাদেশ: আকাঙ্ক্ষার সাতকাহন। এখানে গত পাঁচ দশকের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের কথা লেখক নানা তত্ত্ব ও বাস্তব ঘটনার সূত্রে ব্যাখ্যা করেছেন। এক জায়গায় তিনি আক্ষেপের সঙ্গে লিখেছেন: ‘আমাদের দেশে ন্যায়পরায়ণতা ব্যক্তিতে কম, পরিসরে কম, সমাজে কম, রাষ্ট্রেও তেমনি। যে কারণে এর প্রভাব পড়েছে শাসন কাঠামোয়, সুশাসনে, আইনে, বিচারে, সিদ্ধান্তে, আবেগে ও আক্রোশে।’ আক্রোশে ন্যায়পরায়ণতা থাকার কোনো সুযোগ আছে কি?
শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তার আক্ষেপ, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আধুনিক সংস্কার ঘটানো যায়নি। তাই তো দেশের উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানের আওতায় স্থান করে নিতে পারেনি। মূলত এর সমস্যাটা হলো জ্ঞানী লোকের অভাব, গবেষণাগার না থাকা, গবেষণা করার জন্য আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রবন্ধ ও গ্রন্থের অপ্রতুলতা। তিনি লিখেছেন, ভবিষ্যতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যুগোপযোগী করা না গেলে আমরা পশ্চিমের উন্নত বিশ্ব তো বটেই; কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকেও পিছিয়ে পড়ব। তিনি শিক্ষার সঙ্গে মানবসম্পদকে যুক্ত করেছেন; যা আমাদের নীতিনির্ধারকরা আমলে নেন না। তারা অধিক জনসংখ্যাকে আশীর্বাদ মনে করেন। কিন্তু সেই জনসংখ্যা উপযুক্ত মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কোনো টেকসই উদ্যোগ নেন না।
রাজনীতি সম্পর্কে অত্যন্ত মোক্ষম কথাটি বলেছেন মাহমুদ রেজা চৌধুরী, ‘একুশ শতকের বিশ্বে সবকিছুই চেহারা বদলেছে, দল বদলেছে, কথা ও প্রতিশ্রুতি বদলেছে। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরা তেমন ইতিবাচক অর্থে বদলাইনি। তার উদ্বেগ, বাংলাদেশে এখন দুটি রাজনৈতিক দল—যারা উগ্রতা ও অসহিষ্ণুতায় প্রতিদ্বন্দ্বী। এরা উভয়ই উভয়ের সমালোচনা মেনে নিতে পারে না। শক্তিতে হোক, কৌশলে হোক, ক্ষমতায় হোক, বিভ্রান্তিতে হোক, বিচারে হোক বা অবিচারে হোক—দুই দল তাদের প্রতিপক্ষের প্রশ্নে পুরোটাই গোঁড়া চরিত্রের। কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, তাদের সঙ্গে যারা একমত নন, তাদের সবার প্রতি একই মনোভাব পোষণ করে।’
তার পরও লেখক আশাবাদী। তার প্রত্যাশা, বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াক বর্তমান ও অতীতের পরাজয়, অন্যায়, অবিচার, অমানবিকতা, অদূরদর্শিতা থেকে। প্রতিশোধ, জিঘাংসা, অসমতা, বৈষম্য ইত্যাদি নেতিবাচকতা থেকেও। শ্রেণী বিশেষ, স্থান বিশেষ বা রাজার ক্ষমতায় নয়, সাধারণ মানুষের বিজয়ের আনন্দে ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও স্বপ্নের সঠিক বাস্তবায়নে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইস অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজের মুখবন্ধ বইটিকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। তিনি লিখেছেন, ‘সমাজের মূল্যবোধ, শিক্ষা, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, গণতন্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে লেখকের ভাবনাচিন্তাগুলো আলাদা আলাদাভাবে লেখা হলেও দেশ ভাবনা থেকেই উৎসারিত।’
এ উৎসারণ যত বিস্তৃত হবে, ততই দেশের মঙ্গল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও রাজনীতি যারা পরিচালনা করেন, তারা বইটি পড়লে আয়নায় নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবেন। এ রকম একটি চিন্তাজাগানিয়া বই লেখার জন্য মাহমুদ রেজা চৌধুরীকে অভিনন্দন।
সোহরাব হাসান : কবি ও সাংবাদিক










