সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন নানা সংঘাত-সংঘর্ষ, সহিংসতার পরিক্রমায় বর্তমানে ক্ষমতাসীন সরকার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে পরিণত হয়েছে। এ দাবি ঘোষণা করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। দাবি আদায়ে গতকাল থেকে সারা দেশে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছে। পুরো দেশে অসহযোগ আন্দোলন ঘিরে বেড়েছে মৃতের সংখ্যা। এ সম্পাদকীয় লেখার সময় নিহত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে শতাধিক।  

আন্দোলন শুরু হয় ১ জুলাই। ১৬ জুলাই সংঘর্ষে ছয়জনের মৃত্যু হয়। এরপর আন্দোলন আরো বেগবান হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে সংঘর্ষ ও সংঘাতে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন অন্তত ২১৭ জন। আহত হয়েছেন বহু মানুষ।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এর আগে নয় দফা দাবি ছিল। তবে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের দাবির বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না নেয়ায় এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান আন্দোলনের সমন্বয়করা। দেশজুড়ে এখন কেবলই উদ্বেগ-সহিংসতা। পুরো দেশ বর্তমানে এক অনিশ্চয়তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে। 

নিত্যদিন যাপন থেকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সবকিছুতে নেমে এসেছে বেহাল দশা। তবু ১৮ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালু করা হলে এবং কারফিউ শিথিল করার মাধ্যমে কিছুটা গতি ফিরে এসেছিল যাবতীয় কর্মকাণ্ডে। অসহযোগ আন্দোলকে ঘিরে ফের সহিংসতা চড়াও হয়েছে। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নাগরিক। এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও নামেমাত্র খোলা ছিল। সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয় খুলে দেয়ার ঘোষণা দিলেও আবারো স্থগিত করা হয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষাও ১০ আগস্ট পর্যন্ত স্থগিত আছে। এরই মধ্যে আবার তিনদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে; ফের বহাল করা হয়েছে পুরোদমে কারফিউ। এ অবস্থায় দেশ ও দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন দ্রুততার সঙ্গে রাজনৈতিক মীমাংসা। আর একটিও প্রাণ যাক, তা আমরা চাই না। সংশ্লিষ্টদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি দীর্ঘকাল ধরে বহুমুখী সংকটে ডুবে আছে। তারল্য সংকট, লাগামহীন খেলাপি ঋণ, মন্দ ঋণ, ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের অনাস্থা প্রভৃতি সমস্যায় নিপতিত দেশের ব্যাংক খাত। বাজারের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে বাজার ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতীয়মান হয়। অতি মুনাফার আশায় অসৎ ব্যবসায়ীরা গুদামজাত করে দ্রব্য, স্বেচ্ছাচারী হয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। সরকার বাজারদর বেঁধে দিয়ে, আইন রক্ষাকারী বাহিনী অভিযানে নামিয়েও পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। বেড়েছে সার্বিক মূল্যস্ফীতি। পুরো ২০২৩-২৪ অর্থবছর জুড়ে সারা দেশে মূল্যস্ফীতির গড় হার ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ওই অর্থবছরের শেষ দিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছিল দুই অংকের ঘরে। এখনো দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। পাশাপাশি রয়েছে অর্থ পাচার, ডলার সংকট ও অব্যাহতভাবে রিজার্ভ পতন ইত্যাদি। এত সব চ্যালেঞ্জের মধ্যে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে যে অস্থিরতা চলমান দেশে তা সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষতকে আরো প্রকট করেছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে যখন স্থিতিশীলতার পথে হাঁটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখন পুরো দেশ রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে নমনীয়ভাবে সামলানোর বদলে সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র ও তার অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে দমন-পীড়নের পথ অবলম্বন করেছে, যা এখনো চলমান। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশের পরিস্থিতি কোথায় ‍গিয়ে দাঁড়াবে তার পূর্বাভাস দেয়া কঠিন। শিগগিরই এর সমাধান হওয়া দরকার এবং তা অবশ্যই সহিংসতার পথ এড়িয়ে। সরকারের উচিত দমন-পীড়নের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা। কেননা বাস্তবতা এই যে দমন-পীড়ন, মৃতের সংখ্যা যত বেড়েছে, আন্দোলন ততই বেগবান হয়েছে। ৩ আগস্ট যখন লাখো মানুষ রাস্তায় ছিলেন, মিছিলে ছিলেন, তাদের কণ্ঠে ছিল একটাই দাবি। সেই দাবির উৎপত্তি বিবেচনা করার সময় এসেছে। সরকারকে তা বিবেচনায় নিতে হবে।

সোমবার সকালে গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন গণভবনের দরজা খোলা। কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তিনি বসতে চান ও তাদের কথা শুনতে চান, সংঘাত চান না। সমন্বয়কারীরা প্রধানমন্ত্রীর এ প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। তাদের ভাষ্যমতে, এত প্রাণহানি ও ব্লক রেইড দিয়ে শিক্ষার্থী-জনতা গ্রেফতার করা সরকারের সঙ্গে তারা আলোচনায় বসতে চান না। ক্ষমা প্রার্থনা ও সংলাপে বসার সুযোগ আর নেই, সময় পেরিয়ে গেছে। তারা আর কোনো ধরনের সমঝোতায় যেতে চান না। তাদের দাবি এখন একটাই—ক্ষমতাসীন সরকারের পদত্যাগ। 

এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট যে সরকার শুরু থেকে আন্দোলনকারীদের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে, বিলম্বিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে—তা কোটা সংস্কারের ক্ষেত্রেই হোক কিংবা গণভবনের দরজা খোলার বিষয়ে। বলা বাহুল্য, সরকারের এমন অবিবেচক, হঠকারী সিদ্ধান্তই সীমিত পরিসরের কোটা সংস্কার আন্দোলন বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করেছে। সমাজ, অর্থনতি, রাজনীতি সব ধরনের সংস্কার দাবি করছে এখন এ আন্দোলন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে সবার আগে সরকারকে বলপ্রয়োগ বন্ধ করতে হবে, সরকারের সিদ্ধান্ত হতে হবে জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকারকেন্দ্রিক।