‘মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি’ বলে বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদবাক্য আছে। যার অর্থ কোনো রকম দাবি-দাওয়া, আকাঙ্ক্ষা-আবদার ছাড়াই কোনো সুসংবাদ বা সুফল পাওয়া। এমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল বাংলাদেশে, ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর। কোনো দাবি-দাওয়া নেই, নেই কোনো মানববন্ধন-প্রেস কনফারেন্স বা স্মারকলিপি পেশ। তবুও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিলেন (প্রজ্ঞাপন জারি করলেন) যে শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীরা অবসরের তারিখ হতে ১৫ বছর অতিক্রান্ত হলে পুনরায় স্বাভাবিক নিয়মে পেনশন পাবেন। শতভাগ পেনশন ভোগকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি, কিন্তু এজি অফিস থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশের কর্মকর্তারা যথারীতি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন এবং বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ বা হয়রানি ব্যতীত তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পেনশনের টাকা-বোনাসের টাকা জমা হতে থাকে। অবিশ্বাস্য এক বাংলাদেশ। ডিজিটাল অ্যান্ড স্মার্ট। 

পেনশন মূলত একটি আর্থিক প্রণোদনা। বর্তমানে আধুনিক চাকরি ব্যবস্থাপনা চালু হওয়ার আগেও পেনশন ছিল ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন চরিত্রে। দীর্ঘদিন মালিককে বিশেষ করে রাজা-বাদশাহদের অধীনে সেবা প্রদানের পর যখন সেবা প্রদানকারী অক্ষম হয়ে পড়েন, তখন তাকে চাকরি হতে বিদায় দেয়া হতো। সঙ্গে দেয়া হতো একটি মৌজা বা একটি গ্রামের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব। এ দর্শন হতেই পরবর্তী কালে আধুনিক চাকরি ব্যবস্থায় পেনশন প্রথা চালু হয়। একসময় অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন প্রাপ্তি খুবই জটিল ও দুরূহ ছিল। বাংলা সাহিত্যে-চলচ্চিত্রে পেনশন তুলতে গিয়ে জুতার তলা ক্ষয় হয়ে যাওয়ার বহু গল্প প্রচলিত আছে। তখন পেনশন ছিল—পেনশন যোগ্য অর্থের অর্ধেক নগদ উত্তোলন এবং বাকি অর্ধেক সরকারের কাছে জমা রাখা। বিনিময়ে সরকার প্রতি মাসে একটি আর্থিক প্রণোদনা অবসরকারীকে দিতেন। মূল বেতনের কত শতাংশ পেনশনযোগ্য হবে তা বিভিন্ন সময় পরিবর্তিত হয়। অন্যদিকে আনুতোষিকের হারেরও পরিবর্তন হয়। ১৯৯৪ সালের ১ জুন জারীকৃত এক প্রজ্ঞাপনে পেনশনভোগীদের শতভাগ পেনশন উত্তোলনের সুযোগ দেয়া হয়। অনেকেই তখন শতভাগ পেনশন উত্তোলন করতে থাকেন। এর পেছনে যথার্থ কারণও ছিল। যেমন একসঙ্গে মোটা অংকের টাকা পেয়ে বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমিজমা কেনা, ছেলেমেয়ের বিয়ে, হজ পালনের মতো প্রত্যক্ষ কারণ ছিল। এছাড়া প্রতি মাসে এজি অফিসে গিয়ে পেনশন তোলার ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়াটা ছিল পরোক্ষ কারণ। 

কিন্তু যারা শতভাগ পেনশন উত্তোলন করেছেন তারা কিছুদিন এর মধ্যেই কঠিন বাস্তবতা টের পেলেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে তাদের বেশির ভাগই অসহায় হয়ে পড়েন। পেনশন থাকলে প্রতি মাসে কিছুটা হলেও অর্থ হাতে আসত। এখন সেটি নেই। শুধু চিকিৎসা ভাতা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ২ হাজার ৪৯০ টাকা (১০ টাকা কর কর্তন) এবং কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ১ হাজার ৪৯০ টাকা মাত্র পাওয়া যায়। এতে কি সংসার চলে? দ্রব্যমূল্যের ক্রম-বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। অন্যদিকে অবসর ভোগীদের বেশির ভাগই ৬৫-৭০ বছর বয়সের মধ্যে। এ বয়সে রোগ-শোক নিত্যদিনের ঘটনা। চিকিৎসা খাতে তাই প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য চিকিৎসা ভাতা যথাক্রমে ৫ হাজার ও ৩ হাজার টাকা করা প্রয়োজন। এসব শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের জীবন খুবই কষ্টের। ২০১৭ সালে ৫০ লাখ টাকার পেনশনার সঞ্চয়পত্রে প্রতি তিন মাস অন্তর পাওয়া যেত ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩০০ টাকা। পরবর্তী সময়ে তা নেমে আসে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩০০ টাকায়। এখন অবস্থা আরো শোচনীয়। সোনালী ব্যাংকে ৫০ লাখ টাকার পেনশনার স্কিমে এখন দেয়া হয় মাত্র ১ লাখ ৯ হাজার টাকা। এখানে প্রশ্ন, ১ লাখ ৪৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৯ হাজারের মধ্যে পার্থক্য ৩৪ হাজার টাকা। তাই পেনশনার স্কিমে লভ্যাংশের হার বাড়ানো প্রয়োজন। 

২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে সরকার আগের নিয়মে ফিরে যায়। শতভাগ পেনশন বিক্রয়/উত্তোলনের সুযোগ রহিত হয়ে যায়। ফলে শতভাগ পেনশন সমর্পণের সুযোগ আর রইল না। এরই মধ্যে শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। পেনশন সমর্পণকারীরাও এ দেশেরই নাগরিক। বর্তমানে তাদের অনেকেই বৃদ্ধ, প্রায়-বৃদ্ধ, অসুস্থ এমনকি অনেকেই কঠিন রোগে ভুগছেন। এ সময় রাষ্ট্রের প্রয়োজন তাদের পাশে দাঁড়ানো। ২০১৭ থেকে আজ ২০২৪, এরই মধ্যে কেটে গেল সাত বছর। তাই মাননীয় প্রধানন্ত্রীর কাছে বিনীত আবেদন, যাদের অবসরের সাত বছর হয়েছে তাদের ৬০-৭০ শতাংশ পেনশন প্রতিস্থাপন করুন। অন্যদিকে যাদের ১০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে তাদের ১০০ শতাংশ অর্থাৎ পূর্ণ পেনশন প্রতিস্থাপন করার ব্যবস্থা করুন। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ একটি জনগোষ্ঠী ভীষণভাবে উপকৃত হবে। লক্ষ কোটি অংকের টাকায় যে দেশের বাজেট ঘোষিত হয়, সেখানে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা কোনো ব্যাপারই নয়। শুধু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা, অনুগ্রহ ও বাস্তবতা পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট। আশা করি, আমাদের মানবিক নেত্রী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনগণের একটি অংশের এ প্রাণের দাবি উপলব্ধি করবেন। শুনবেন তাদের আর্তি। 

আমিনুল ইসলাম মিলন: সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা