দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা সম্ভবত মানব ইতিহাসে কল্যাণকর উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। মানবজাতি বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দুবার যে ধরনের বিশাল আকারের বিশ্বযুদ্ধ ও সংঘাতের সম্মুখীন হয়েছিল এবং যা লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ও মহাদেশগুলোয় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত করেছিল, সে রকম সংঘাতের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। অতঃপর বিশ্বের প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃবৃন্দ একটি অর্থনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যা কোটি কোটি মানুষকে শুধু চরম দারিদ্র্য থেকেই বের করে আনেনি বরং ১৯৬১-২০১৯ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী মাথাপিছু আয়ও তিন গুণের বেশি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।

কিন্তু বর্তমান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ঘটনাগুলো এখন আর আমাদের মধ্যে কোনো আশা জাগায় না। দেশগুলোর মধ্যে মূল্যস্ফীতির রেকর্ড পরিমাণ ঊর্ধ্বগতি, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর পশ্চিমা দেশগুলো কর্তৃক গৃহীত আর্থিক মডেলের বিষয়ে সৃষ্ট সন্দেহ এবং উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য মানুষকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে যে বৈশ্বিক অর্থনীতি আসলে কোন দিকে যাচ্ছে? কিন্তু ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গতিপথ কি হবে তা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো আলাদাভাবে  বিশ্লেষণ  করতে হবে। বিগত পাঁচ দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা কেমন ছিল তা বুঝতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে বর্তমান সময়ে আমরা যেই অর্থনৈতিক অস্থিরতার সম্মুখীন হচ্ছি তা কি একটি আঞ্চলিক নাকি সম্মিলিত ঘটনা। এছাড়াও বর্তমান অর্থনৈতিক উদ্বেগগুলো কি একটি স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ত্রুটি নাকি সেগুলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর ক্রমবর্ধমান কাঠামোগত ত্রুটি দ্বারা পরিচালিত?  

এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রশ্নগুলোর ওপর আলোকপাত করতে বিগত পাঁচ দশকের বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন মূল্যায়ন থেকে উদ্ধৃত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের বোঝা প্রয়োজন। সুনির্দিষ্টভাবে যদি আমরা বিভিন্ন অঞ্চলে গত পাঁচ থেকে ছয় দশকে প্রবৃদ্ধি কীভাবে  বিকশিত এবং ওঠানামা করেছে তা পরীক্ষা করি, তাহলে আমরা পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের মুখোমুখি হই:

প্রথম, বিগত পাঁচ দশকে বৈশ্বিক মাথাপিছু আয় তিন গুণেরও বেশি বাড়লেও এই অর্থনৈতিক গল্পটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জীবনযাত্রার মানে যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে তা সম্পূর্ণ তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ যদি আমরা অঞ্চলগুলোর মাথাপিছু আয় তুলনা করি, তাহলে আমরা দেখতে পাই ইইউ বা ওইসিডির গড় আয় সাব-সাহারান আফ্রিকান বা দক্ষিণ এশিয়ার গড় আয়ের তুলনায় ২০ গুণেরও বেশি; এবং এটি লাতিন আমেরিকার গড় আয়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। অর্থাৎ নব্বইয়ের দশকের পর অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং বিশ্বায়ন দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সংগতি আনবে বলে যে প্রত্যাশা ছিল তা বাস্তবে হয়নি। মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে বহাল ছিল।  

দ্বিতীয়: ১৯৬০-২০২১ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে যার মধ্যে ২০০০ সালের পর থেকে অর্থনৈতিক অস্থিরতার কিছু লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। এটি সম্ভবত ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং ২০১৯ সালের পর কভিড-১৯-এর প্রভাবের কারণে। লক্ষণীয়, ২০১১-২০২১ সালের মধ্যে গড় দশকভিত্তিক প্রবৃদ্ধি বিশ্বের প্রতিটি প্রধান অঞ্চলে হ্রাস পায় যা ১৯৬০-২০০০ সালের মধ্যে দেখা যায়নি।

তৃতীয়: পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ২০১০ সাল পর্যন্ত উন্নত অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা প্রদর্শন করে যা পরবর্তী সময়ে কিছুটা ধীরগতি দেখা দেয়। অথচ গত পাঁচ দশকে এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল সবচেয়ে বেশি। উপরন্তু এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধিতে অস্থিরতা ১৯৭০ সালের পর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং তারপর থেকে নব্বইয়ের দশকে কিছু অবনতি সত্ত্বেও বেশির ভাগই অপরিবর্তিত ছিল। শুধু তাই নয়, ২০০১-২০২১ সালের মধ্যে পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অস্থিরতা বিশ্বের অন্যান্য প্রধান অঞ্চলের তুলনায় সবচেয়ে কম ছিল।

চতুর্থ: দক্ষিণ এশিয়ার গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সময়ের  সঙ্গে সঙ্গে উল্লেখযোগ্য বেড়েছে। ১৯৮০-২০১০ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অস্থিরতা কম ছিল, কিন্তু ২০১১-২০২১ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের অবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি ঘটে, ফলে গত দশকে এটি সবচেয়ে অস্থির অঞ্চলে পরিণত হয়। সম্প্রতি পাকিস্তান এবং শ্রীলংকায় যা ঘটেছিল তা পর্যবেক্ষণ করলে এই প্রবণতার প্রমাণ পাওয়া যায় যেখানে প্রকট সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা তাদের সরকারকে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য চাইতে বাধ্য করেছিল। মহামারীর সময় ভারতীয় প্রবৃদ্ধিও গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

পঞ্চম: ইইউ এবং ওইসিডির মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১৯৬১-২০২১ সালের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে কমে গেছে। এছাড়া এটি লক্ষ করা জরুরি ১৯৮০-২০০০ সালের মধ্যে তারা খুব কম অর্থনৈতিক অস্থিরতার সম্মুখীন হয়েছে; তবুও গত দুই দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অস্থিরতা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল।

সামগ্রিকভাবে গত পাঁচ থেকে ছয় দশকে বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিবর্তন ইঙ্গিত দেয় যে গত দুই দশকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বেড়েছে এবং এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতার এই বৃদ্ধি একটি গুরুতর ঘটনা, যা বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের আরো ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ এটি নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সহাবস্থান করছে। 

১৯৬০-২০০০ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক অস্থিরতা যে স্থায়ী হ্রাসের সম্মুখীন হয়েছিল তা থেকে এটি ভিন্নতর। আঞ্চলিক অর্থনীতিগুলো কেন এত বেশি অস্থিরতার সম্মুখীন হচ্ছে সে সম্পর্কে কোনো পরিষ্কার ঐকমত্য নেই । উন্নত অর্থনীতিতে যে অর্থনৈতিক অস্থিরতা উদ্ভূত হচ্ছে তার কারণ অর্থনৈতিক খাতের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণহীনতা, প্রাচ্যের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, অর্থনৈতিক বৈষম্যের তীব্র উত্থান এবং সরকারি খাতে ঋণের ক্রমবর্ধমানতা। এটি গত দুই দশকে বৃদ্ধি পাওয়া অর্থনৈতিক এবং আর্থিক সংযোগের কারণে এখন বাকি বিশ্বকে প্রভাবিত করছে। অন্য কথায় বিশ্বায়ন, বর্ধিত বাজার এবং আর্থিক সংযোগ অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে একটি বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক ঘটনা থেকে একটি অবিচ্ছিন্ন বৈশ্বিক ঘটনায় পরিণত করেছে। তাই বিকাশমান দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের উন্নত অর্থনীতির অর্থনৈতিক ঘটনাবলির প্রতি মনোযোগী হতে হবে এবং ভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলের মন্দার প্রতি সতর্ক ও সংবেদনশীল হতে হবে।                 

আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়নি, বাংলাদেশের চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা তারই ইঙ্গিত দেয়। মার্কিন ডলারের বিপরীতে বিনিময় হার প্রায় ১০ বছর ধরে ২০২৩ পর্যন্ত প্রায় অপরিবর্তিত রাখা হয়। বাণিজ্যিক অংশীদার এবং রফতানি প্রতিযোগীদের তুলনায় তুলনামূলক উচ্চ অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ আমদানিকে সস্তা এবং রফতানিকে প্রতিযোগিতাহীন করেছে, ফলে ২০২২ ও ২৩ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্যের চলতি হিসাব ও আর্থিক হিসাব এবং সামগ্রিক ভারসাম্য উভয় ক্ষেত্রেই বিশাল ঘাটতি দেখা দেয়। বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের অনুসরণে পলিসি রেট বৃদ্ধি করছিল, তখন বাংলাদেশের সুদের হার ৬-৯ শতাংশ সীমার মধ্যে বেঁধে রাখার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংককে টাকার বিনিময় হার সমর্থন করতে এবং মহামারী-পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাধা দেয়। তার পরিণামগুলো ছিল তীব্র সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা যার বৈশিষ্ট্য ছিল টাকার তীব্র অবমূল্যায়ন, ২৪ বিলিয়ন ডলারে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, প্রধান রেটিং সংস্থাগুলো দ্বারা বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং হ্রাস, একটি বড় এবং ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক বাণিজ্যের চলতি হিসাব ও আর্থিক হিসাবে ঘাটতি এবং একটি অব্যাহত উচ্চ মূল্যস্ফীতি। 

এই সমস্যাগুলোর আরো ভালোভাবে সমাধান করা যেত যদি সরকার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিগুলো আমাদের অভ্যন্তরীণ নীতি প্রণয়নে সক্রিয়ভাবে ও সময়মতো প্রতিফলিত করত। তদুপরি বিশ্বায়ন, বর্ধিত বাজার এবং আর্থিক যোগসূত্রের কারণে অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে বৈশ্বিক অঞ্চল নির্বিশেষে একটি অবিচ্ছিন্ন ঘটনায় পরিণত করেছে। সেজন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের আর মনে করা উচিত নয় যে তারা বিচ্ছিন্ন থেকে মুদ্রা বা রাজস্ব নীতির সিদ্ধান্তগুলো প্রণয়ন করতে পারে। মোটকথা, উন্নয়নশীল এবং উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এখন আর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা থেকে সুরক্ষিত নয়—সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিমাপগুলো অবশ্যই ভালোভাবে অনুসরণ ও গ্রহণ করা উচিত, যাতে তারা নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির যেকোনো নেতিবাচক পরিবর্তন থেকে রক্ষা করতে পারে।

ড. আহসান এইচ মনসুর: নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)

ড. আশিকুর রহমান: মুখ্য অর্থনীতিবিদ, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)