খেলাপি ঋণের আধিক্য বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বিকাশের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায়। খেলাপি ঋণের দুষ্টচক্রে থমকে আছে ব্যাংক খাত। অথচ ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না, বরং ক্রমাগত বিশেষ ছাড় ও সুবিধা দেয়া হচ্ছে ঋণখেলাপিদের। গত জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেয়া তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট ঋণখেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৬৫। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের আবারো বড় ছাড় দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এবার বকেয়া কিস্তির অর্ধেক পরিশোধ করলেই খেলাপি হওয়া থেকে মুক্ত থাকবেন ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে গতকাল ব্যাংকগুলোর জন্য নতুন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে কেবল মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে ঋণের কিস্তির পরিশোধে এ ছাড় প্রযোজ্য হবে। এ ছাড় দেয়ার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালসহ বিভিন্ন উপকরণের মূল্য ও আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ফলে ঋণগ্রহীতারা তাদের ঋণের বিপরীতে প্রদেয় কিস্তির সম্পূর্ণ অংশ পরিশোধে অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন ও সেবা খাতসহ সব ধরনের ব্যবসা চলমান রাখা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা বজায় রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ব্যাংক খাতে ঋণ আদায়ে যেভাবে ছাড় দেয়া হচ্ছে, তাতে এখন খেলাপি ঋণ আদায় করা কঠিন হতে পারে।

গত বছরও ঋণের নির্ধারিত কিস্তির ৫০ শতাংশ বা অর্ধেক দিলেই ওই গ্রাহককে খেলাপি হিসেবে দেখানো যাবে না বলে নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। আর এর আগে একই রকম সুবিধায় কিস্তির ৫০-৭৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণসংক্রান্ত মার্চ প্রান্তিকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায় যে চলতি বছরের প্রথম তিন (জানুয়ারি-মার্চ) মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করা বাংলাদেশের এক ধরনের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণখেলাপিদের কারণে ব্যাংকের তহবিল ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তার পরও ঋণখেলাপিদের বছর বছর নানা সুবিধা দেয়া হচ্ছে। নামমাত্র ডাউন পেমেন্টে খেলাপি ঋণ নিয়মিতকরণের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। ঋণ নিয়মিত হওয়ার পর আবারো তা খেলাপি হচ্ছে। এ চক্রে পড়ে প্রতি বছরই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা আনবে না; বরং ব্যাংক খাতকে ঝুঁকিতে ফেলবে। 

বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে খেলাপি ঋণ কমানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এ অবস্থায় খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে আইএমএফের ঋণের কিস্তি অনিশ্চিত হয়ে যেত। আবার জাতীয় নির্বাচনের আগে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সরকারও অস্বস্তিতে পড়ত। এসব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই খেলাপি ঋণের বিষয়ে নীতি ছাড় দেয়া হয়েছে। এদিকে ঋণখেলাপির ভারে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত স্মরণকালের সবচেয়ে খারাপ সময় অতিক্রম করছে। ধারণা করা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাতেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির এ হার আরো জোরদার হয়ে উঠবে, কিন্তু কোথায় গিয়ে এটি ঠেকবে, তা কারো পক্ষেই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। আর ঋণখেলাপিরা রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রকে যেভাবে চতুর্দিক থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছেন, তাতে করে ব্যাংকগুলোর পক্ষেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিলেও তা আমলে নেয়া হচ্ছে না, বরং নানা অজুহাতে খেলাপিদের বিভিন্ন ছাড় দেয়া হচ্ছে। যার কারণে প্রতিনিয়ত অবস্থা আরো খারাপ দিকে যাচ্ছে। 

ব্যাংক খাতকে যেহেতু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বিবেচনা করা হয়। আর সে খাতই যদি নড়বড়ে হয়ে পড়ে, তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্য তথা সার্বিক অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়তে বাধ্য। বস্তুত বছরের পর বছর দেশে ঋণখেলাপিদের নানা ধরনের ছাড় দেয়ার কারণেই পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাবে মন্দ ঋণের পাশাপাশি অর্থ পাচারও বাড়ছে। খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংক খাতে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেই ঝুঁকি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ সহনীয় বলে ধরা হয়। সেখানে দেশে এখন বিতরণ করা ঋণের ৮ শতাংশের অধিক খেলাপি। একের পর এক ছাড় দিয়ে আসলে ঋণ আদায় করা যাবে না। সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভেবেচিন্তে। আগে বুঝতে হবে কোন কোন সমস্যার জন্য খেলাপি ঋণ আদায় হচ্ছে না। আর এ বিষয়গুলো যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানে না, তাও নয়। তারা অবশ্যই জানে, শুধু পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন নতুন ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ভালো করে যাচাই-বাছাই করে দিতে হবে। এক খাতের ঋণ অন্য খাতে যাচ্ছে কিনা এটা নিশ্চিত হতে হবে। তবে যাদের সমস্যা আছে, তাদের বিষয়ে সরাসরি যাচাই-বাছাই করে পদক্ষেপ নিতে হবে। ঢালাওভাবে সুবিধা দেয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে।

মোটামুটিভাবে খেলাপি ঋণ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এ সমস্যা নিরসনে অনেক দেশ আর্থিক নিয়ন্ত্রণ বিধিমালার পাশাপাশি কিছু উদ্ভাবনী পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু দেশ যেমন জার্মানি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, আর্মেনিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, ভারত প্রভৃতি দেশ ব্যাংকে ন্যায়পাল নিয়োগ করেছে। আবার যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোয় ‘ডেট রিকভারি বা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠন করা হয়েছে। কিছু দেশ আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণের সুবিধার জন্য স্বতন্ত্র ব্যাংকিং কমিশন গঠন করেছে। ফলে সেসব দেশে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা ও গৃহীত পদক্ষেপ আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। 

অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধির উজ্জ্বল চিত্র আমাদের উল্লসিত করলেও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি অশনিসংকেত। এ নিয়ে সরকারি বিভিন্ন মহলে এবং ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যেও অস্বস্তি রয়েছে। এক্ষেত্রে অস্বীকার করার উপায় নেই, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, স্বজনপ্রীতি ও মন্দার প্রভাব, ঢালাওভাবে ঋণখেলাপিদের ছাড় দেয়াসহ বেশকিছু কারণে ঋণখেলাপির ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে মোটা অংকের ঋণ দেয়া হয়। ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে যার পরিণতি ভয়াবহ। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিকল্প নেই। এ খাতকে স্থিতিশীল করতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেয়ার নীতি থেকে সরে আসার যে সুপারিশ করেছিল সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবার ও পদক্ষেপ নেয়ার সময় হয়েছে। অব্যাহত ছাড় দিতে থাকলে একটি পর্যায়ে ঋণ পরিশোধে অনীহা সৃষ্টি হবে, সক্ষমতা হারাবেন উদ্যোক্তারা এবং ব্যাংক ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।