চলমান বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব বাংলাদেশেও বিরাজমান। জাতীয় অর্থনীতির গতি শ্লথ। উদ্বেগজনক উচ্চ মূল্যস্ফীতির দরুন দেশের নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের কষ্ট বর্ধমান। নিত্যপণ্যের প্রতিনিয়ত মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। বাজারে ব্যবসায়ীদের লাগামছাড়া লাভের মধ্যেই চিনির দাম আরেক দফা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মিল মালিকরা। বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন চিনির মূল্য কেজিতে ২৫ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। এখন পর্যন্ত গত সাত মাসে সরকার ছয়বার চিনির দাম বেঁধে দিয়েছে, কিন্তু কোনোবারই নির্ধারিত দামে চিনি বাজারে পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ চলতি মাসের শুরুতে আবারো কেজিপ্রতি ১৬ টাকা বাড়িয়ে প্রতি কেজি চিনি খোলাবাজারে ১২০ এবং প্যাকেটজাত চিনি ১২৫ টাকা বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কিন্তু এ সত্ত্বেও চিনির দাম পুনরায় বাড়ানো হচ্ছে।
চিনির দামে লাগাম টানতে সরকার বারবার ব্যর্থ। অতীতে দেখা গেছে, ঘোষিত দর কখনই বাজারে প্রতিফলিত হয়নি, বরং বেঁধে দেয়া দরের চেয়ে বেশি দামে পণ্যসামগ্রী বিক্রি হয়েছে। উদ্বেগজনক হচ্ছে, বাজার তদারকির বন্দোবস্ত নেই। এ কারণে অসাধু সিন্ডিকেট ক্রেতাকে জিম্মি করে অন্যায্য মুনাফা লুটে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিল মালিকরা প্রতি কেজি খোলা চিনির দাম ১৪০ আর প্যাকেটজাত চিনির দাম ১৫০ টাকা নির্ধারণ করেছেন। তবে সরকার নির্ধারিত এ দাম ব্যবসায়ীরা মানছেন না। বাজারে প্রতি কেজি চিনি ১৩৫-১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নীতিমালা অনুযায়ী, ভোজ্যতেল, চিনিসহ আরো কয়েকটি আমদানি পণ্যের দাম বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের মাধ্যমে নির্ধারণ করে সরকার। এ খাতের ব্যবসায়ীরা সম্প্রতি চিনির দাম বাড়াতে সরকারের দ্বারস্থ হয়ে ব্যর্থ হন। অবশেষে তারা স্বীয় উদ্যোগে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। এর আগে চিনির দাম বাড়াতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে চিঠি দেয় সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন। তখন সরকার বলেছিল, আমদানিকারকরা আবেদন করলেও এখনি দাম বাড়ানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম এবং আনুষঙ্গিক খরচ পর্যালোচনা করা হবে। তারপর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কিন্তু সে ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত আসার আগে মিল মালিকরা মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিলেন। এতে সাধারণ ভোক্তার দুর্ভোগ আরো বাড়ল।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) তথ্যানুযায়ী, দেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা ১৮-২০ লাখ টন। অন্যদিকে দেশের রিফাইনারিগুলোর পরিশোধনক্ষমতা বার্ষিক ৩০ লাখ টন। এছাড়া সরকারিভাবেও কিছু পরিমাণে চিনি উৎপাদন করা হয়। এ অবস্থায় অর্থনীতির চাহিদা-জোগানের সূত্র অনুযায়ী চিনির বাজার আরো স্থিতিশীল হওয়ার কথা ছিল। এর পরও চিনির দাম বেড়ে চলেছে। চলতি অর্থবছরের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ থাকলেও বাজারে লাগাতার দাম বাড়ছে চিনির। আর এদিকে চিনির মূল্যবৃদ্ধির জন্য খুচরা ব্যবসায়ীরা আমদানিকারকদের দায়ী করছেন। অন্যদিকে আমদানিকারকরা আন্তর্জাতিক বাজারের ঊর্ধ্বগতি, শুল্ক, বন্দরে সময়মতো পণ্য খালাস না হওয়া এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মানের অবমূল্যায়নের কথা বলছেন। আমদানিকারকদের ভাষ্যমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে চিনি বিক্রি করতে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়ছে রিফাইনারি কোম্পানিগুলো। তবে তাদের এসব ব্যাখ্যা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়ে গেছে। অপরিশোধিত চিনি আমদানিকারকরা দেশে পরিশোধন করে থাকেন। এক্ষেত্রে আমদানির মূল্য জানা গেলেও মিলের খরচ চিনিকলের মালিকরা যেটি বলেন, সেটাই মেনে নিতে হয়। এখানে পরিষ্কার কোনো তথ্য নেই।
এছাড়া বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের কাছে এখন খোলাবাজারে ছাড়ার মতো যথেষ্ট চিনি মজুদ নেই। অথচ এ সংস্থাকে সুরক্ষা দিতে চিনি আমদানিতে উচ্চহারে শুল্ককর আরোপ করে রাখা হয়েছে। মূলত দেশে আমদানীকৃত চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। আমদানিকারক এসব প্রতিষ্ঠান মূলত অপরিশোধিত চিনি দেশে এনে পরিশোধনের পর বাজারজাত করে থাকে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন খুবই নগণ্য হওয়ায় বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানগুলোই দেশে চিনির চাহিদা পূরণ করছে। প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণে চিনি আমদানি করলেও বাজারে তার প্রভাব প্রতিফলিত হয় না কেন এ বিষয়টি এখনো পরিষ্কার হয়নি। চিনির উপর্যুপরি মূল্যবৃদ্ধি বিষয়ে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণের পকেট কাটতেই এভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে চিনির। তাদের জবাবদিহির মুখে দাঁড়াতে হচ্ছে না দেখেই ইচ্ছামতো দাম বাড়ানো হচ্ছে। সরকারকে এক্ষেত্রে দ্রুত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। গত সপ্তাহে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) একটি কার্যক্রমে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ে দেশে চিনির দাম বাড়ানো হয়েছে। এখন তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে মিল মালিকরা আবারো কেন দাম বাড়ালেন? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দরকার রয়েছে।
গত বছরের নভেম্বরে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতি কেজি খোলা চিনির দাম ১০৪ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল সরকার। সে দামে তখন চিনি মেলেনি বাজারে। সরকারের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে ব্যবসায়ীরা দফায় দফায় পণ্যটির দাম বাড়াতে থাকেন। একপর্যায়ে রোজার আগে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলে আমদানি পর্যায়ে ৫ শতাংশ শুল্ক ছাড় নেন ব্যবসায়ীরা। সেই সুবিধা এখনো বহাল থাকলেও দাম ঠিকই বাড়িয়ে চলেছেন তারা। চিনিতে আমদানি শুল্ক ৩০ শতাংশ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে তা ৫ শতাংশ কমিয়ে ২৫ শতাংশ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। শুল্ক ছাড়ের এ মেয়াদ শেষ হবে ৩১ মে। তার আগেই শুল্ক ছাড়ের মেয়াদ বাড়াতে এনবিআরকে চিঠি দিচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চিনির দাম বেশি থাকায় শুল্কহার আরো কমানোর অনুরোধ করা হতে পারে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এখন চিনির মূল্যবৃদ্ধি এবং শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগ নিলে এককভাবে আমদানিকারকরাই এর সুবিধা ভোগ করবেন। এতে ভোক্তাসাধারণ কোনো সুবিধা পাবেন না।
গত বছর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম ঊর্ধ্বমুখী। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে পেঁয়াজের বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। এতে চরম বিপাকে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। সবকিছুর দাম বাড়ায় তাদের সংসার খরচ বেড়ে গেছে। যে কারণে আয়ের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে নিত্যপণ্যের পেছনে। চাহিদার সঙ্গে দাম যাতে না বাড়ে, সেজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর দৃশ্যত বিশেষ ব্যবস্থা ও হস্তক্ষেপ এখন খুব প্রয়োজন। দেশের চিনির বাজার গুটিকয়েক আমদানিকারকের হাতেই জিম্মি। কাজেই বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ ও কঠোর পদক্ষেপের বিকল্প নেই। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে। আর দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিতভাবে বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে মজুদকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেই সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অসৎ ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তাহলেই নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কিছুটা হলেও কমবে।










