স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো (এনজিও)। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবমতে দেশে এনজিও রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার। আর এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোর তথ্যে ২ হাজার ৬৩৬টি রেজিস্টার্ড এনজিওর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে এনজিওর যাত্রা হলেও পরবর্তী সময়ে এর সংখ্যা ও কাজের ক্ষেত্র বেড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে সামাজিক উদ্যোগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে মাইক্রোক্রেডিট বা ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এছাড়া এনজিওগুলোর কার্যপরিধির অন্যান্য উল্লেখযোগ্য খাত হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, পরিবার পরিকল্পনা, পরিবেশ, নারী ও শিশুকল্যাণ প্রভৃতি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয়, বিশেষ করে কভিড-পরবর্তী সময়ে সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে যে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, আর্থসামাজিক উন্নয়নের মূল জায়গা থেকে এনজিওগুলো ক্রমেই সরে যাচ্ছে এবং দেশের বৃহদাকারের এনজিওগুলো এখন করপোরেট কালচারের দিকে যাচ্ছে। এনজিওগুলোর মনোযোগ এখন বেশি জাতীয় উন্নয়নের দিকে। ফলে তাদের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এনজিওগুলো অলাভজনক উদ্যোগ, ব্যবসা, করপোরেট নাকি পারিবারিক প্রতিষ্ঠান তা ঠাহর করাই বর্তমানে কঠিন হয়ে উঠেছে।
দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, চিকিৎসা, বৈষম্য দূরীকরণ ইত্যাদি সামাজিক কাজ একসময় এনজিওগুলোয় প্রাধান্য পেত। কিন্তু আশির দশকের পর থেকে এনজিওগুলোর মধ্যে ভিন্ন ধারার প্রবণতা লক্ষণীয়। এনজিওগুলো তাদের মূল অঙ্গীকার থেকে সরে গিয়ে আর্থিক কর্মকাণ্ডের দিকে বেশি ঝুঁকেছে। সরকারের সঙ্গে একীভূত হয়ে কাজ করা শুরু করে, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির একটা অংশ হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সংস্থাগুলোর ভূমিকা ক্রমেই কমে এসেছে। অন্যদিকে কিছু এনজিও বাণিজ্যিক সাফল্যের মধ্য দিয়ে বৃহদাকার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যার ফলে এক প্রকার করপোরেট এনজিওর উত্থান হয়েছে।
২০১৮ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এনজিওগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়ায় মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। বেশির ভাগ এনজিওর লোকাল লেভেল বোর্ডের সদস্যরা প্রধান নির্বাহীর আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধব হয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাহী বোর্ড মিটিং না ডেকেই সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়া সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করা হয় না, যেটি ফান্ডিং এজেন্সিকে দেয়া হয়। এমনকি মাঠের তথ্য সংগ্রহের বেলায়ও সংকট রয়েছে। বেশির ভাগ এনজিও তাদের উপকারভোগীদের কাছ থেকে তথ্য নেয় না। ফলে ওই এনজিওগুলো জনস্বার্থে কতটুকু কাজ করতে পারছে সেটি প্রতিবেদনে উঠে আসে না। এনজিওগুলোর পলিসিও ট্রেনিংয়ে কর্মীদের অনুকূলে থাকে না। খুব কম এনজিও চাকরির বেতনের বিষয়টি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে। কর্মীদের পারফরম্যান্স বিবেচনায় নেয়ার জন্য বেশির ভাগই কোনো ব্যবস্থা নেয় না। উল্টো নিয়োগে ফান্ডিং এজেন্সি, এনজিও-বিষয়ক ব্যুরো ও স্থানীয় প্রভাবশালী লোকদের প্রভাব রয়েছে। অনেক এনজিওর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
আর্থসামাজিক উন্নয়নে এনজিওর অবদান অস্বীকার করা না গেলেও বলা বাহুল্য যে বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানগুলোয় নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। চ্যালেঞ্জগুলো বিশেষত সুশাসন ও জবাবদিহির অভাবকেন্দ্রিক। পরিচালনায় স্বজন বা প্রিয়ভাজনদের নিয়োগ প্রধানত এ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। ‘এনজিও গভর্ন্যান্স ইন বাংলাদেশ: অ্যান ইমপেরিক্যাল ইনকোয়ারি’ শীর্ষক এক গবেষণায় এনজিওর এ সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গবেষণাপত্রটির মতে, এখানে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার একজনেরই, সংগঠনটির নির্বাহী প্রধান। সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ায় সবসময় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয় না। আবার আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি সীমাহীন সুবিধা পান। ডোনারদের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রজেক্টের বাজেট তৈরি, সংগঠনের কমন ফান্ড ও অন্য বিষয়গুলো প্রধান নির্বাহীর নিয়ন্ত্রণে থাকে। এছাড়া লোকবল নিয়োগে কোনো নির্দিষ্ট পলিসি অনুপস্থিত। পদোন্নতি ও নিয়োগে প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে সম্পর্ক অথবা স্বজনপ্রীতির বিষয়টি ভীষণভাবে কাজ করে। ফলে এনজিওগুলোয় একনায়কতন্ত্র, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ও এনজিওর মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে এগুলোর সংস্কার প্রয়োজন। জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য পরিচালনা পর্ষদ থেকে অন্য সব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। দক্ষ ব্যবস্থাপক ও কর্মীর মাধ্যমে এনজিওগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। অধিকাংশ এনজিও যেহেতু বর্তমানে ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত সেহেতু পরিপূর্ণ স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এনজিওগুলোর গত অর্থবছর শেষে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা।
এনজিওগুলোর করপোরেট কালচারে প্রবেশের পথে খাতসংশ্লিষ্ট অনেকের যুক্তি, অর্থসংস্থানে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বিদেশী অনুদানের ওপর নির্ভরতার একটা বড় ঝুঁকি এনজিওগুলোর জন্য। আশঙ্কা রয়েছে অনুদান সংকটের কারণে দেশের এনজিওগুলোর অবস্থা কঠিন হয়ে উঠবে, বিশেষ করে যখন বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে।
এনজিওগুলো পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে এমন বিবেচনায় সংস্কার করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, তাদের কার্যপরিধি যেন কমে না আসে বরং সক্ষমতা বাড়ে। যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এনজিওগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। তাছাড়া আগামীতে টিকে থাকতে হলে যুগোপযোগীভাবে এনজিওগুলোর কাঠামো গড়ে তোলা আবশ্যক। বিশেষজ্ঞদের মত, দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বেসরকারি সংস্থাগুলোর নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা প্রয়োজন। নতুন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। যেমন বর্তমানে কর্মসংস্থান সংকট ও বেকার সমস্যা প্রকট দেশে। এনজিওগুলো যেভাবে শিক্ষা খাতে নজর দিয়েছিল, সেভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে তারা অভ্যন্তরীণ নিয়োগগুলো স্বচ্ছ ও সুরক্ষিত করতে পারে। চাকরির সুরক্ষা ক্ষেত্রে এনজিওতে বড় ধরনের সংকট রয়েছে। আবার যে এনজিওগুলো অধিকারভিত্তিক কাজ করে, তাদের নিজস্ব আয় সংস্থানের কোনো প্রকল্প নেই। ফলে এসব জায়গায় যারা কাজ করেন তাদের চাকরির সুরক্ষা তুলনামূলকভাবে আরো কম। নির্দিষ্ট একটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে দাতা সংস্থার যে অর্থায়ন থাকে, সেটা ব্যবহার করে চাকরি যতটা সম্ভব সুরক্ষিত করা হয়। এর বাইরে সুরক্ষা দেয়ার মতো কোনো সম্পদ এনজিওগুলোর থাকে না। সুতরাং সংস্কারের ক্ষেত্রে এনজিওগুলোর অভ্যন্তরীণ সংকটও বিবেচনায় রাখতে হবে।
এনজিওগুলো সংস্কারের বিষয়ে সরকারের এক উপদেষ্টা বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, যে সংস্কার রাষ্ট্রের হওয়া প্রয়োজন, ঠিক একই সংস্কার এনজিওগুলোরও হওয়া প্রয়োজন। আশা রাখি প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে এনজিওগুলো প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নে আরো তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।










