চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আয় কম হয়েছে। এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষ থেকে দ্বিতীয় প্রান্তিকে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কথা বলা হলেও বিশেষজ্ঞরা প্রথমেই সঠিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার কথা বলছেন।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ৭৬ হাজার ৭৫১ কোটি ৩০ লাখ টাকা আহরণ করেছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮ হাজার ১৯৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা কম। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এ তিন মাস রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৮৪ হাজার ৯৪৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। সবচেয়ে বেশি ঘাটতি আয়করে, ৩ হাজার ৫২৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
অবশ্য লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম রাজস্ব আদায় বিগত বছরগুলোয়ও হয়েছে। এক্ষেত্রে উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যথাযথ পরিকল্পনাহীনতার ফলেই এমনটি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন। তাই যতদিন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে না, ততদিন এমন চিত্রের পুনরাবৃত্তি হতেই থাকবে ধরে নেয়া যায়।
দেশের রাজস্ব খাতের ৮৬ শতাংশ আহরণ করে এনবিআর। মূলত আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস—এ তিন খাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়। এনবিআর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে এনবিআরের তিন খাতেই রাজস্ব আহরণের ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে আয়করে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। সেখানে আয় হয়েছে মাত্র ২৩ হাজার ৬৪১ কোটি ১৫ লাখ টাকার রাজস্ব। শুল্ক পর্যায়ে রাজস্ব আয়ে এনবিআরের ঘাটতি ২ হাজার ৫১৪ কোটি ১০ লাখ। এ খাত থেকে আয় হয়েছে ২৪ হাজার ১২৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যেখানে লক্ষ্য ছিল ২৬ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে মূসক (ভ্যাট) আদায়ে রাজস্ব ঘাটতি ২ হাজার ১৫৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৩১ হাজার ১৩৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা লক্ষ্যের বিপরীতে ২৮ হাজার ৯৮২ কোটি ২৫ লাখ টাকা আহরণ করতে পেরেছে এনবিআর।
দেখা যাচ্ছে যে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস থেকেই এনবিআর লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আহরণে সক্ষম হচ্ছে না। জুলাইয়ে ১ হাজার ৮৬৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঘাটতি ছিল। আগস্টে তা বেড়ে ৪ হাজার ৮৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।
চলতি অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে আহরণ করা হয় ৩ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার মতো। অর্থাৎ গত বছরও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম রাজস্ব আহরণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এনবিআর অনেক বেশি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। তাই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে। এজন্য বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে প্রথমেই সঠিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা দরকার ছিল।
তবে এনবিআরের দাবি ডলার সংকট ও এলসি নিয়ন্ত্রণ করায় শুল্ক পর্যায়ে রাজস্ব আয়ে ঘাটতি বাড়ছে। এছাড়া আয়কর থেকে সাধারণত অর্থবছরের শেষের দিকে বেশি রাজস্ব আসে। তাই বর্তমানে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও অর্থবছর শেষে রাজস্ব আয়ের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ করা যাবে বলে সংস্থাটির পক্ষে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
রাজস্ব আহরণের ঘাটতির কারণ হিসেবে অনেক জায়গা থেকে এনবিআর কর অব্যাহতি দিচ্ছে বা করের হার কমাচ্ছে। এ বিষয়টি উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য এসব জায়গায় এনবিআরের স্থির থাকার ওপরই জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের অর্থনীতি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে রাজস্ব আয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এজন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থার আলোকে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। কারণ আদায় করা সম্ভব নয় এমন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করলে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দূর করা যাবে না। এজন্য প্রয়োজনে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমরা রাজস্ব আদায়ে এনবিআরকে গতিশীল ভূমিকায় দেখতে চাই। এজন্য অর্থবছরের শুরুতে বাস্তবসম্মত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
বর্তমান সময়ে দেশের অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো প্রয়োজন। এজন্য অর্থনীতিবিদরা করের হার না বাড়িয়ে করযোগ্য মানুষ যারা এখনো কর দেন না, তাদের করের আওতায় আনার প্রতি পরামর্শ দিচ্ছেন। পাশাপাশি কর আদায়ে বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে প্রায়োগিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আমরা প্রত্যাশা করব, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি রোধে এনবিআর যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।










