বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রচণ্ডতা বেড়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে মানুষ এখনো অসহায়। যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, নদীভাঙন, পাহাড়ধস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ইত্যাদির কারণে প্রতিনিয়ত বিশ্বের কোনো না কোনো অঞ্চল দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রকৃতিতে মানুষের অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপ, নদী শাসন ইত্যাদির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশেও বিভিন্ন দুর্যোগ ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়েছে। একুশ শতকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিভিন্ন প্রকৃতির দুর্যোগ ও দুর্যোগজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছরই জীবন ও সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে বিভিন্ন অঞ্চলের এবং দেশের উন্নয়ন ধারা। ফলে সর্বত্রই দুযোর্গের ঝুঁকি নির্ধারণ এবং দুর্যোগ প্রশমনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন প্রতিটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। তাই দুর্যোগ-পরবর্তী বিভিন্ন উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্পাদনের পাশাপাশি দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ এবং দক্ষ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গড়ে তোলা সব মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে ব্যাপক পূর্বপ্রস্তুতি ও জনগোষ্ঠীর মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এগুলো বিবেচনা করেই জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমনবিষয়ক দপ্তর (ইউএনডিআরআর) ১৯৮৯ সাল থেকে ১৩ অক্টোবর ‘আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস’ উদযাপন করে আসছে। বাংলাদেশ সরকার এর সঙ্গে সংগতি রেখে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এ বছর (২০২৪) ইউএনডিআরআর কর্তৃক নির্ধারিত ‘Empowering the next generation for a resilient future’ থিমের আলোকে বাংলায় প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘আগামী প্রজন্মকে সক্ষম করি, দুর্যোগ সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ি’। টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে (পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক) বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হয়। এক্ষেত্রে সামাজিক পর্যায়ে তরুণ অংশীজনরা সরাসরি জড়িত থাকে। বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি তরুণদের অংশগ্রহণের হার ২৮ দশমিক ২ শতাংশ। সমাজ ও দেশের স্বার্থে তরুণ জনগোষ্ঠী যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় দ্রুত সাড়া দেয়। সাম্প্রতিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার বিপ্লবে বিদায় নিয়েছে ফ্যাসিবাদী সরকার। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে এজন্য প্রাণ দিতে হয়েছে সহস্রাধিক মানুষকে। এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ আন্দোলনে ১৯ থেকে ৩০ বয়সীরা সবচেয়ে বেশি (৫৩ শতাংশ) মারা গেছেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে দেশের যেকোনো সংকটকালে নতুন এ প্রজস্ম যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সর্বদা প্রস্তুত।
ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়ার কারণে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি জনবহুল ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশে আঘাত করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারাকে যেমন ব্যাহত করছে, তেমনি এ দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকার ধারাকেও করছে বাধাগ্রস্ত। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে সবচেয়ে ঝুঁকিবহুল অন্যতম একটি দেশ বাংলাদেশ। গত দুই দশকে এ ভূখণ্ডে প্রায় ১৮৫টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত করায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের সাহসী মানুষ দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার ও এগিয়ে যাওয়ার কৌশল রপ্ত করে দুর্যোগ প্রশমনের ক্রমাগত বিভিন্ন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের কারণে বিগত ১০০ বছরে ক্ষতি হয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকার সম্পদ। বিভিন্ন সময়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোয় যেমন জানমালের ক্ষতি হয়েছে তেমন অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেড়ে গেছে, যা বাংলাদেশকে তার উন্নয়ন অগ্রযাত্রা থেকে পিছিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ২ কোটি ৪০ লাখ ৪ হাজার ৩৬৭ জন দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাস করে। এ দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১৮ হাজার ৪২৫ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষীপুরসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভয়াবহ বন্যায় ১৪ হাজার ৪২১ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা জিডিপির ২৬ শতাংশ (সিপিডি, ২০২৪)। এর মধ্যে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষি খাতে (৫ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা), অবকাঠামোয় (৪ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা) এবং ঘরবাড়ি খাতে (২ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা)। এ ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে, দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি ও সম্পদ কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দেশে প্রতি বছর বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগে মারা যাচ্ছে মানুষ, হারিয়ে যাচ্ছে সম্পদ, বাড়ছে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা। প্রকৃতির কাছে অসহায় মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার যেটুকু পূর্বপ্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা রয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। শুধু সঠিক সময়ে সঠিক প্রস্তুতি ও সুশাসন দ্বারাই কমিয়ে আনা যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, লাঘব করা যায় অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট। এজন্য প্রয়োজন নিয়ম মেনে অবকাঠামো গড়া, জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি হ্রাস করা এবং সুশাসনের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চত করা। দুর্যোগের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি মানুষের জীবন ও সম্মানজনক জীবিকা অর্জনের পথে এক বিশাল অন্তরায়।
দুর্যোগ প্রশমনের আন্তর্জাতিক কৌশল হলো প্রাকৃতিক আপদ, প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত দুর্যোগের কারণে জনগোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতি কমানোর পরিকল্পনা নেয়া। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে দ্রুত দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারে এমন জনগোষ্ঠী তৈরি করা। দুর্যোগ প্রশমনে আন্তর্জাতিক কৌশল হিসেবে চারটি উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়। এক. ঝুঁকি ও দুর্যোগ প্রশমন সম্পর্কে ধারণা লাভে বিশ্বব্যাপী জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা। দুই. দুর্যোগ প্রশমন নীতি এবং পদক্ষেপ বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধির অঙ্গীকার নিশ্চিত করা। তিন. ঝুঁকি প্রশমনে নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি করা এবং চার. দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমন সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করা।
বিশ্বে দুর্যোগে সাড়া প্রদান, সক্ষমতা ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রমের গ্রহণযোগ্যতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলেও কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতি, পরিকল্পনা ও কর্মসূচিতে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এজন্য বাংলাদেশ সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে সমন্বিত ও সামগ্রিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিবেচনা করে বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রেখেছে। যেমন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ২০১০-২০১৫, দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি ২০১৯ এবং ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১১, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। দেশকে দুর্যোগের প্রকোপ থেকে রক্ষার্থে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সব ক্ষেত্রে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরোসহ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। যেমন খাদ্য ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তর, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কেন্দ্র, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্ক সংকেত কেন্দ্র এবং বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক বাহিনী।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখনো প্রতিহত করা সম্ভব নয়। কিন্তু আগে থেকেই যদি দুর্যোগ প্রশমনের জন্য তৃণমূল পর্যায় থেকে সুশাসনের মাধ্যমে নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তোলার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় তাহলে এসব দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। যেকোনো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় (দুর্যোগ-পূর্ববর্তী প্রস্তুতি, দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন) সরাসরি জড়িত। সব ক্ষেত্রেই সরকারি-বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি আগামী প্রজন্মকে যথাযথভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে যেকোনো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য সক্ষম করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এছাড়া কাঠামোগত ও অ-কাঠামোগত ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্যোগকে কার্যকরভাবে প্রশমনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া যেতে পারে। কাঠামোগত দুর্যোগ প্রস্তুতির মধ্যে রয়েছে অধুনিক আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ, গুদামজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, রাস্তা ও সেতু নির্মাণ, বেতার যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ। অন্যদিকে অ-কাঠামোগত দুর্যোগ প্রস্তুতির মধ্যে প্রশিক্ষণ, দক্ষ দুর্যোগ কর্মী তৈরি, দুর্যোগ পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা কার্যক্রম এবং দুর্যোগ সহনীয় নিরাপদ আবাসন তৈরিতে কার্যক্রম গ্রহণ। এক্ষেত্রে আরো কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে: দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি নিরসনে জনগণের পূর্বপ্রস্তুতি ও করণীয় সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার নিশ্চিত করা; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল গঠন; বহুমুখী নিরাপদ আবাসন ও আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ; আবহাওয়া পূর্বাভাস দ্রুত ও আধুনিকীকরণ; বাড়ির বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ নিরাপদ ও সতর্কভাবে স্থাপন করা; গাছপালা ও বনাঞ্চল উজাড় বন্ধ করা ইত্যাদি। সর্বোপরি দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে দুর্যোগ সহনীয় নিরাপদ অবকাঠামো গড়তে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
ড. মো. ইকবাল সরোয়ার: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়










