সুন্দরবন বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ম্যানগ্রোভ বনভূমি। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক শাখা ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এ বন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বিস্ময়। বিভিন্ন দুর্যোগ থেকে দেশকে রক্ষায় সুন্দরবন নিঃস্বার্থ ভূমিকা পালন করে। দেশের পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব রাখার পরও এ বন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ক্রমে আয়তন কমছে সুন্দরবনের। দেশের বনাঞ্চল কমে গেলে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্য সুন্দরবন রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, এক দশকে সুন্দরবনের আয়তন অন্তত অর্ধেক কমে গেছে। এভাবে বন কমতে থাকার বিষয়টি উদ্বেগজনক। সুইডবায়ো, বন অধিদপ্তর, ফরেস্ট পিপল প্রোগ্রাম (এফপিপি) ও উন্নয়ন অন্বেষণের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক কর্মশালায় এ তথ্য উঠে আসে। ‘‌দি ইমপ্লিমেনটেশন অ্যান্ড মনিটরিং অব দ্য কুনমিং-মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্ক: কমিউনিটি বেজড সলিউশন অ্যান্ড কন্ট্রিবিউশনস টু দ্য গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি টার্গেটস’ শীর্ষক কর্মশালায় উন্নয়ন অন্বেষণের পক্ষ থেকে বলা হয়, সুন্দরবনের জলাধার কমেছে। ২০১০ সালে ৪৪৮ হেক্টর থাকলেও ২০২০ সালে তা ৩২২ হেক্টরে এসে দাঁড়িয়েছে। কাঁকড়ার বিচরণস্থল ৩ হাজার ১১৫ হেক্টর থেকে কমে ১ হাজার ৬৩৪ হেক্টরে নেমে এসেছে। এছাড়া ‌সুপার সাইক্লোন সিডরের আঘাতে সুন্দরবনের ১০ শতাংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।

এভাবে সুন্দরবনের আয়তন ক্রমে হ্রাস পাওয়া কাম্য নয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য ও দূষণ এ তিন বিষয় পারস্পরিক সম্পর্কিত। এজন্য জাতীয় জীববৈচিত্র্য অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে স্থানীয় লোকজনকে বন ব্যবস্থাপনায় সহযোগী হিসেবে রেখে কাজ করা হচ্ছে বলে প্রধান বন সংরক্ষক জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে কুনমিং-মন্ট্রিল প্রটোকল অর্জনের ওপর কর্মশালায় জোর দেয়া হয়েছে। এ প্রটোকল অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৩০ শতাংশে উপনীত করার কথা বলা হয়েছে। 

শুধু বন বিভাগের একার পক্ষে সুন্দরবন রক্ষা করা সম্ভব হবে না। সরকারের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীরও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে এজন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

এদিকে সুন্দরবনের আয়তন কমার পাশাপাশি মৎস্যসম্পদও কমছে। সুন্দরবনকে বাঁচাতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক পদ্ধতির মাধ্যমে সমাধান খোঁজার প্রতিও জোর দেন বক্তারা। সুন্দরবনে পরিকল্পিতভাবে গোলপাতার গাছ রোপণ করে তার সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্থানীয় জেলেদের নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট প্রজাতির মাছ ধরার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। বিপন্ন মাছ ধরা থেকে জেলেদের বিরত রাখতে হবে। পাশাপাশি মাছ রক্ষায় জেলেদের জালের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিয়ম মেনে চলতে হবে। এসব বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে বন সংরক্ষণে সরকারের উদ্যোগ ফলপ্রসূ হবে এ আশা করা যায়।

দেশের জাতীয় অর্থনীতিতেও সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি দেশের বনজ সম্পদের একক বৃহত্তম উৎস। এ বন কাঠের ওপর নির্ভরশীল শিল্পে কাঁচামাল জোগান দেয়। এছাড়া কাঠ, জ্বালানি ও মণ্ডের মতো প্রথাগত বনজ সম্পদের পাশাপাশি সুন্দরবন থেকে ঘর ছাওয়ার পাতা, মধু, মৌচাকের মোম, মাছ, কাঁকড়া ও শামুক-ঝিনুক ব্যাপকভাবে আহরণ করা হয়। বৃক্ষপূর্ণ সুন্দরবনের ভূমি একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় আবাসস্থল, পুষ্টি উৎপাদক, পানি বিশুদ্ধকারক, পলি সঞ্চয়কারী, ঝড় প্রতিরোধক, উপকূল স্থিতিকারী, শক্তি সম্পদের আধার এবং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে।

ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে প্রাকৃতিক প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরবন। সিডর, আইলা, ফণী, আম্ফান, বুলবুলসহ ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় ম্যানগ্রোভের প্রাচীর কতটা শক্তিশালী সেটা সুন্দরবন বারবার জানান দিয়েছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট আঘাত পেতে পেতে এখন সুন্দরবন নিজেই বিপদের মুখে পড়েছে। এজন্য দেশের স্বার্থেই সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে। সুন্দরবন হুমকির মুখে পড়লে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যাবে।

ভূতত্ত্ববিদদের মতে, সুন্দরবনের আয়তন কমে আসায় প্রতিবেশ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কমে আসছে গাছগালা, লতাগুল্ম ও প্রাণী। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে সুন্দরবন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এটি কোনো ইতিবাচক লক্ষণ নয়। 

সুন্দরবনের মধ্যে ছোট-বড় অসংখ্য নদী ও খাল রয়েছে। পানির মতো বিছানো এসব খাল-নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার। এসব নদী-খাল দিনে দুবার জোয়ারের পানিতে ভরে যায়, আবার দুবার ভাটায় পানি নেমে যায়। জোয়ার-ভাটার কারণে নদীর পাড় ভাঙে আবার গড়ে। তবে গত ১০০ বছরে দেখা গেছে, ভাঙনই বেশি, যা আজও ঠেকানো যায়নি।

বস্তুত সুন্দরবন বেঁচে থাকলে তা ঘূর্ণিঝড়ের সামনে শক্তিশালী দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারবে। এছাড়া পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখতে এ বনকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য।