বর্তমান বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। এতে পাল্লা দিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। অক্টোবরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার আগের মাসকেও ছাড়িয়ে গেছে। মূলত খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিই গত মাসে মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এ সময় দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অক্টোবরে রেকর্ড মূল্যস্ফীতির পেছনে ডিম আর আলুকে দায়ী করা হচ্ছে। এছাড়া হরতাল-অবরোধের কারণে পণ্য পরিবহন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়াতে পারে বলে পরিকল্পনামন্ত্রী আশঙ্কা করেছেন। যেসব পণ্যের দাম একেবারেই প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে তার মধ্যে রয়েছে পেঁয়াজ, আলু, কাঁচামরিচ ইত্যাদি। এছাড়া সব ধরনের মাংস ও মাছের দামে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়েই চলেছে। আমদানি করেও পেঁয়াজের দাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।
দারচিনি ও এলাচ ছাড়া সব ধরনের মসলার দাম বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে রসুনের দাম। মসলার মধ্যে শুকনা মরিচ, হলুদ, জিরা, দারচিনি, লবঙ্গ, এলাচ, ধনে ও তেজপাতারও দাম বেড়েছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, চলতি বছর দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার প্রথম দুই অংকের ঘরে ওঠে আগস্টে। ওই সময় থেকে এখন পর্যন্ত দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ১২ শতাংশের ওপরে রয়েছে। গত আগস্টে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। পরের মাসে এ হার ছিল ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যা অক্টোবরে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশে।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদন ও সরবরাহ কম থাকার কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। গত এক বছরে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের অনিয়ম হয়েছে। প্রয়োজনের সময় সঠিক পরিমাণে বৃষ্টি না হওয়ায় ফসলের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। চাল ছাড়া বাংলাদেশ আর কোনো খাদ্যপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। বাকি সব খাদ্যপণ্যই আমদানি করতে হয়। দেশে ৫০ বছর ধরে শুধু চাল উৎপাদনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বাকি খাদ্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিতে যথাযথ নজর দেয়া হয়নি। ফলে বিশেষ কোনো খাদ্যের চাহিদা বেড়ে গেলে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। এ কারণে দামও বেড়ে যায়।
এছাড়া উৎপাদন খরচের পাশাপাশি আমদানি খরচ বাড়লেও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে। পাশাপাশি পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে ব্যবসায়ীদের গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের ভূমিকার কথা বিভিন্ন সময় উঠে এসেছে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় এ লক্ষ্য পূরণ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সংশয় তৈরি হয়েছে।
এক্ষেত্রে অগ্রহায়ণে ধান কাটা শুরু হওয়ার পর চাল আমদানির কারণে ডিম ও মৌসুম হিসেবে শীতে সবজির দাম কমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে। নীতিনির্ধারক পর্যায়ে অর্থনীতির ভাষায় মূল্যস্ফীতি এখনো রান অ্যাওয়ে বা বল্গাহীন হয়নি এমন বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আগামী মাসে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে এ সম্ভাবনার যে দিক পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন তা এখন বাস্তবায়নযোগ্য করে তোলা উচিত।
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে বিপণন ব্যবস্থায় অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলাকে কারণ হিসেবে গণ্য করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এজন্য শুধু বাজার তদারকি ও জেল-জরিমানা করে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থামানো অসম্ভব বলেও মত দিয়েছে সংস্থাটি। বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
বস্তুত কয়েক বছর ধরে আমদানির কয়েকটি জরুরি পণ্যের বাজার গুটিকয়েক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত বলয় তৈরি করে নিজস্ব শর্তে তারা বাজারে পণ্য দিচ্ছে। এমনকি সিন্ডিকেটের কথায় রাজি না হলে অন্যদের ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। বাজারে ম্যানিপুলেশনের অভিযোগে বেশ কয়েকটি বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের জেল-জরিমানা করা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
এজন্য বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপের বিকল্প নেই। বাজারে অস্থিরতা তৈরির জন্য দায়ী প্রধান কুশীলবদের নিষ্ক্রিয় করতে হবে। এক্ষেত্রে বিগত সময়ে সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে কথা বলে বাণিজ্যমন্ত্রী সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় আমদানির জন্য পর্যাপ্ত ডলারের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ রকম সংকটকালে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ দুর্মূল্যের এ বাজারে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে কষ্টে আছে। এ সময় তাদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা প্রত্যাশা করব, সঠিক কারণ উদ্ঘাটন করে মূল্যস্ফীতি কমাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। প্রশাসনের আন্তরিকতা ও ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল ভূমিকার সম্মিলিত প্রয়াসে আগামী মাসগুলোয় খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে আসুক, সেটিই আমাদের কাম্য।










