বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগই হয়ে থাকে জলপথে। শুরুর দিকে কেবল বিদেশী পতাকাবাহী জাহাজে করে পণ্য পরিবহন হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের পতাকাবাহী জাহাজ এতে যুক্ত হয়েছে। এটা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক খবর। কিন্তু দেশী জাহাজ কোম্পানিকে অন্যায্য সুবিধা দিতে বিদেশী কোম্পানিগুলোকে বঞ্চিত করলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অসম অবস্থান তৈরি হবে।  

বণিক বার্তায় প্রকাশ, বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজকে সুবিধা দিতে গিয়ে রফতানি পণ্য পরিবহনে জটিলতা দেখা দিয়েছে। ওয়েবার সনদপ্রাপ্তিতে বিদেশী পতাকাবাহী জাহাজগুলো ভোগান্তিতে পড়ছে, করা হচ্ছে জরিমানাও। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকরা পণ্য রফতানিতে কালক্ষেপণ, ব্যয় বৃদ্ধি ও ক্রেতা অসন্তোষের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। 

বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ (স্বার্থরক্ষা) আইন, ২০১৯-এর ৩ ধারা অনুযায়ী, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ৫০ শতাংশ দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজে পরিবহন বাধ্যতামূলক। তবে দেশীয় জাহাজে জায়গার সংকুলান না হলে অব্যাহতি সনদ নিয়ে বিদেশী জাহাজে পণ্য পরিবহন করা যাবে।

২০০৯-১১ সাল পর্যন্ত দেশীয় বহরে যুক্ত হয় ৪১টি সমুদ্রগামী জাহাজ। এরপর ২০১২ সালের জুনে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা উন্নীত হয় ৬৮টিতে। ২০১৩ সালে নয়টি জাহাজ নিবন্ধন নেন উদ্যোক্তারা। এরপর থেকে সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা কমাতে থাকেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। খরচ পোষাতে না পেরে অনেকেই পুরনো জাহাজগুলো স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দেন। এর পর থেকে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা কমে আসে।

করোনা মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে এখন নতুন করে জাহাজ কেনায় ঝুঁকছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। এ কারণে ২০২১ সালের জানুয়ারি-অক্টোবরে ১২টি সমুদ্রগামী জাহাজ কিনে চালু করেছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। আগে শুধু খোলা পণ্য পরিবহনে জাহাজ কেনায় ঝোঁক থাকলেও এখন কনটেইনার জাহাজ ক্রয়, এমনকি জ্বালানি তেল পরিবহনের জাহাজও কিনছেন তারা। এর মধ্যে বিদেশী পতাকাবাহী জাহাজের স্থানীয় এজেন্টরা অভিযোগ করেন, অনেক সময় দেশীয় কোম্পানিগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার জন্য বন্দরে আসা বিদেশী জাহাজগুলোর কনটেইনার লোড-আনলোডে বাধা দেয়া হয়ে থাকে; মাদার ভেসেলের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে বাইরের নোঙরখানায় স্থানান্তরিত করা হয় বিদেশী জাহাজ।

বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ (স্বার্থরক্ষা) বিধিমালা-২০২৩ অনুসারে, বিদেশী জাহাজের মালিক বা তাদের প্রতিনিধিদের পণ্য লোড করার আগে বাধ্যতামূলক ওয়েবার সনদের জন্য মার্কেন্টাইল মেরিন অফিসে অনলাইনে আবেদন করতে হবে। ওয়ার্ল্ড শিপিং কাউন্সিল চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশের নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রীকে পাঠানো এক চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দরে ওয়েবার সনদসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে নিয়মের কিছু ধারা সংশোধনে পরামর্শ দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রচলিত নিয়ম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে অসুবিধা সৃষ্টি করছে, যা আমদানি ও রফতানিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।

বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের মতে, ফিডার ভেসেলগুলো বিজিএমইএ-এর আমদানীকৃত পণ্যের প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং রফতানীকৃত পণ্যের ৮৫ শতাংশ বহন করে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রফতানি পণ্যের শিডিউল মিস হলে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) মিস হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। মাদার ভেসেল মিস করলে ইউরোপ-আমেরিকার গন্তব্যে সঠিক সময় পণ্য পৌঁছানো অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তখন রফতানি পণ্যের মূল্য পরিশোধ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় বলে জানান পোশাক রফতানিকারকরা।

বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ (স্বার্থরক্ষা) বিধিমালা-২০২৩ অনুসারে, বিদেশী জাহাজের মালিক বা তাদের প্রতিনিধিদের পণ্য লোড করার আগে বাধ্যতামূলক ওয়েবার সনদের জন্য নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর অফিসে অনলাইনে আবেদন করতে হয় এবং চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগের আগে ছাড়পত্র নিতে হয়। কিন্তু সম্প্রতি এই সনদ সংগ্রহ নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় এমভি এসওএল প্রমিজ এবং এমভি এক্সপ্রেস লোটসি নামের দুটি জাহাজকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। সাধারণত জরিমানা করা হলে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের নিয়ম আছে। তবে এ-সংক্রান্ত আইন সংশোধনে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়েছে। 

সংশ্লিষ্টদের বরাতে জানা গেছে, পণ্য রফতানির ৯১ শতাংশই বিদেশী জাহাজের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে বাংলাদেশের যেগুলো আছে সেগুলো মাত্র ৯ শতাংশ পর্যন্ত নিতে পারে। 

দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বন্দরে ওয়েবার সনদ জটিলতায় আমদানি-রফতানিসংক্রান্ত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সনদ জটিলতার কারণে শিপিং কোম্পানি এবং অন্য স্টেকহোল্ডাররা প্রায়ই তাদের কার্গো না নিয়ে বন্দর ছাড়ছে বা বিলম্বের শিকার হচ্ছে এবং একই সঙ্গে গুনছে জরিমানা। ফলে ক্ষতির মুখে পড়ছেন পণ্য রফতানিকারকরা। ওয়েবার সার্টিফিকেটসংক্রান্ত জটিলতায় ১৪ অক্টোবর কলম্বোগামী একটি জাহাজের যাত্রার সময়সূচি একদিন পিছিয়ে যায়। ফলে জাহাজটি একদিন পর প্রায় ৪০০ কনটেইনার কম নিয়ে রওনা করে। 

সিঙ্গাপুরভিত্তিক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি এক্স-প্রেস ফিডার এক বিবৃতিতে জানায়, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) মাত্র ২৪ ঘণ্টার জন্য কার্গো পরিচালনার অনুমতি দেয় এবং ১২ অক্টোবর সকাল ৮টার পর রফতানি কার্গো লোডিং স্থগিত করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে (সিপিএ) অবহিত করে। চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা বিবেচনায় বেঁধে দেয়া ২৪ ঘণ্টা সময়সীমার মধ্যে এ পরিমাণ কনটেইনার লোড ও আনলোড করার বাস্তবতা নেই। এই সময়ের মধ্যে জাহাজটিতে মাত্র ১১০ টিইইউএস রফতানি কার্গো লোড সম্ভব হয়েছিল। বাকি প্রায় ৬০০ টিইইউএস বাদ পড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।

করোনা মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে দেশীয় উদ্যোক্তারা যে নতুন করে জাহাজ কেনায় ঝুঁকছেন এটা অভিনন্দন জানানোর মতো ব্যাপার। কিন্তু বিশ্ববাজারে পণ্য পরিবহনে আমাদের সক্ষমতা কতটুকু বেড়েছে তা তদারকি করতে হবে। পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি হলে, বিলম্বিত হলে আমাদের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে। দেশের অর্থনীতির ক্রান্তিকালে তা সুখকর কোনো বিষয় নয়। দেশীয় পণ্যবাহী জাহাজ কোম্পানিগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখা গেছে, অন্যান্য খাতের মতো রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অল্প কিছু ব্যক্তির আধিপত্য এখানে। সুবিধাভোগী কিছু গোষ্ঠীকে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ করে দিতে গিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য হুমকিতে পড়ে কিনা সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।    

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সম্প্রতি সিঙ্গাপুরভিত্তিক দুই প্রতিষ্ঠানের দুই কনটেইনার জাহাজকে জরিমানার বিষয়টি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা তা বিবেচনা করা দরকার। যদিও বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ (স্বার্থরক্ষা) আইন অনুযায়ী অব্যাহতি সনদ ছাড়া কনটেইনার বোঝাই করায় এ জরিমানা করা হয়েছে বলে আদেশে উল্লেখ করা হলেও চলমান ডলার সংকটের মধ্যে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়ার এ সিদ্ধান্ত রফতানিকারকদের মাথাব্যথার কারণ বৈকি!