ড. সেলিম রায়হান। অর্থনীতির অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক। বাংলাদেশের মুদ্রা ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা, ডলারের বিকল্প মুদ্রার রিজার্ভ, বাণিজ্যে ডলার আধিপত্য, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও বৈদেশিক বিনিয়োগসহ অন্যান্য প্রসঙ্গে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন
সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের টাকা ভারতের রুপিতে লেনদেন করবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেয়া নির্দেশনায় বাংলাদেশে এলসি খোলার ক্ষেত্রে চীনের মুদ্রা ইউয়ান ব্যবহারের অনুরোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ তো সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউয়ানের সঙ্গে লেনদেন করবে, তার মানে ভারতের রুপির সঙ্গেও তা করতে পারে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
এ রকম কারেন্সি সোয়াপের সুযোগ বাংলাদেশের অবশ্যই এক্সপ্লোর করা উচিত। কারণ বাংলাদেশের দুটো বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার ভারত ও চীন। এ দুই দেশ থেকে আমরা ৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সমান বা তার বেশি আমদানি করি। গত অর্থবছরে এ দুই দেশে বাংলাদেশের ৩ বিলিয়ন ডলারের রফতানি ছিল। এখন বিকল্প মুদ্রায় ভারতীয় রুপি অথবা চীনের ইউয়ান ব্যবহার করতে চাইলে আমাদের দুটি বিষয়ে নজর দিতে হবে। প্রথমত, কারেন্সি সোয়াপের কতটুকু সুযোগ আছে এবং তা কতটা সম্ভব? দ্বিতীয়ত, এটা করার জন্য কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন? আমি যেভাবে বুঝি তাতে সম্ভাবনা সীমিত। কারণ ভারতে আমরা মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার রফতানি করি, কিন্তু ভারত থেকে আমদানি করি ১৪-১৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। সেক্ষেত্রে আমদানীকৃত পণ্যের সবটাই আমরা রুপিতে পরিশোধ করতে পারব না। কারণ সে পরিমাণ রুপি কোথায়? যেহেতু রফতানি করেছি হয়তো সর্বোচ্চ ২ বিলিয়ন ডলারের মতো। সে পরিমাণ রুপি ভারতের কাছ থেকে নিলে সেটা আমরা ২ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য পণ্য আমদানি করতে পারি। অর্থাৎ ১৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমদানির ২ বিলিয়ন যদি রুপিতে পরিশোধ হয়; বাকি ১২ বিলিয়ন ডলার তো ডলারেই দিতে হচ্ছে। কারণ রুপি কিনতে বাংলাদেশকে ডলার ব্যবহার করতে হবে। সেটা বাস্তবসম্মত কিনা বিবেচ্য। চীনের ইউয়ানের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। তবে রফতানি বাড়ালে সম্ভাবনা বাড়বে। দ্বিতীয়ত, এটা করার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা কতটুকু প্রস্তুত? কারেন্সি সোয়াপের জন্য আর্থিক খাতের ব্যাংক এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে ভারতের সঙ্গে লেনদেনের সময় একটা এগ্রিমেন্টে আসতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে বা বাংলাদেশ ব্যাংককে রুপিতে একটা রিজার্ভ মেইনটেইন করতে হবে। যাতে প্রয়োজনের সময় রুপির চাহিদা মেটাতে পারে। এ ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় কিছু এগ্রিমেন্টের বা চুক্তির প্রয়োজন পড়বে। এ জায়গায় ফিজিবিলিটি স্টাডি ইমিডিয়েটলি করার সুযোগ আছে। ফিজিবিলিটি স্টাডি করলে চ্যালেঞ্জগুলো খুঁজে বের করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক যে নির্দেশনা দিল চীনের ইউয়ান দিয়ে এলসি ওপেনিং করা যাবে, এটাও তো একই রকমভাবে হবে?
হ্যাঁ। এলসি ওপেনিং করতে গেলে ব্যাংক কোথা থেকে ইউয়ান দেবে? ব্যাংককে তো ডলার খরচ করে ইউয়ান কিনতে হবে। অথবা বাংলাদেশ রফতানি করে চীন থেকে ইউয়ান আয় করতে পারে। সে ইউয়ান দিয়ে ব্যাংকগুলোকে আমদানিকারকদের জন্য এলসি ওপেনিং করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা চীন থেকে ১৫-১৬ বিলিয়ন ডলার আমদানি করি আর রফতানি করি ১ বিলিয়ন ডলারেরও কম। সামগ্রিকভাবে ভারত ও চীন থেকে আমরা প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার আমদানি করি আর প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের মতো রফতানি করি। দুই দেশ থেকে রফতানির প্রায় ১০ গুণ আমদানি করি। তাই আমদানির ক্ষেত্রে হয়তো সর্বোচ্চ ১০ শতাংশে বিকল্প মুদ্রা ব্যবহার করা যাবে। এক্ষেত্রে বিকল্প মুদ্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের সমকক্ষ চাহিদা কমাতে পারলেও আমাদের কিছুটা স্বস্তি দেবে। আর রফতানি বাড়ালে স্বস্তির জায়গাটা বাড়বে।
বাংলাদেশে চীন ও ভারতের যে বিনিয়োগ আছে, সে বিনিয়োগ সাধারণত ডলারে আসে। যদি চীনের বিনিয়োগ ইউয়ানে আসে, ভারতের বিনিয়োগ রুপিতে আসে, তাহলে বাংলাদেশে রুপি বা ইউয়ানের রিজার্ভ কি বাড়বে না?
সেটার সুযোগ আছে। তবে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য কম। ভারতের বিনিয়োগ খুব সামান্য। চীনের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আছে। সেটাও কম। ওদের বিনিয়োগগুলো ওদের নিজস্ব কারেন্সিতে করার জন্য এগ্রিমেন্টের সুযোগ থাকতে পারে। বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এ দুটো বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে তাদের মুদ্রায় বাণিজ্য করতে চাইলে অবশ্যই এ সুযোগটা খুঁজে বের করতে হবে। এ কারণে ফিজিবিলিটি স্টাডিজ গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা ভারত ও চীনের সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটে কিছু প্রকল্প করছি, সে প্রকল্পগুলো থেকে কি মনে হয় আসতে পারে?
সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, ঋণ আমরা ফেরত দেব কীভাবে? আমরা ঋণ যেটা নিই, ভারত অথবা চীন কি তা নিজস্ব কারেন্সিতে ফেরত নেবে? সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে রিজার্ভে ইউয়ান অথবা রুপিতে অ্যাকাউন্ট ওপেন করতে হবে। রিজার্ভের একটা অংশ ইউয়ানেও রাখতে হবে এবং রুপিতেও রাখতে হবে। বিদেশী ঋণে দুপক্ষই যদি তাদের মুদ্রায় লেনদেন করতে রাজি হয় তাহলে সে সুযোগ আছে। তবে স্মর্তব্য যে বিশ্বব্যাপী ডলারের ওপর আস্থা আছে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি। রুপি ও ইউয়ানের ওপর অতটা আস্থা নেই। আবার চীন ও ভারত থেকে আগত বিনিয়োগকারীরা সবকিছু তো চীন বা ভারত আমদানি করবেন না; তাদের কিছু পণ্য বা উপকরণ হয়তো জার্মানি থেকে আমদানি করতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা ইউয়ান বা রুপি ব্যবহার করতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে ডলারই ব্যবহার করতে হবে। তবে এটা ঠিক, চীনা ও ভারতীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহারের সুযোগ খোলা থাকবে। বিদেশী মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডলারের বিকল্প মুদ্রা দরকার। এককেন্দ্রিক ডলারভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় ভিন্ন মুদ্রাকে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তারা ডলার ছাড়া অন্য কোনো মুদ্রা নিতে চান না। তারা বলেন, ইউয়ান দিয়ে শুধু চীন থেকেই আমদানি করা যাবে কিন্তু ডলারে সারা পৃথিবী থেকেই করতে পারব।
চীনের ইউয়ান মানুষের কাছে ডলারের মতো আস্থা অর্জন করেনি। এক্ষেত্রে ইউয়ান বা রুপির ব্যবহার শুধু বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এর বাইরে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত। ব্যবসায়ীরা তাই অনাগ্রহী হতে পারেন। তবে তাদের আগ্রহী করতে তাদের সঙ্গে এনগেজমেন্ট বাড়ানো জরুরি এবং স্কোপিং ও ফিজিবিলিটি স্টাডিজ দরকার।
ডলার লেনদেনের ক্ষেত্রে সুইফট আছে, ফেড আছে। উচ্চ সিকিউরিটি বজায় রাখা হয়, তবুও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার হ্যাক হয়ে গেল। কিন্তু চীন ও ভারতের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দরকার বলে আপনি মনে করেন। তাতে রিস্ক আছে কিনা?
বিশ্বব্যাপী আস্থার জায়গাটা ডলারে খুব বেশি। কারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাটা খুব শক্তিশালী। রুপিকে ভারত আন্তর্জাতিক মুদ্রায় পরিণত করতে আগ্রহী হলেও ডলারের বিকল্প হওয়াটা সোজা বিষয় নয়। ইউরো চেষ্টা করেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা সফল, কারণ তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একটা বৃহৎ শক্তিশালী অর্থনৈতিক অঞ্চল। যে কারণে কোনো কোনো জায়গায় একটা বিকল্প মুদ্রা হিসেবে ইউরোর ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে। ইউয়ানও ভবিষ্যতে বিকল্প হতে পারে, কারণ চীন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। কিন্তু ভারতের অর্থনীতি এখনো সে রকম শক্তিশালী নয়। রুপির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউটের মতো জায়গাগুলোর লেনদেনে সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে হবে; না হলে ব্যবসায়ীদের আস্থার জায়গাটায় যেতে সমস্যা হবে।
বাংলাদেশের রিজার্ভ তো ৩০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এল। রিজার্ভ বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য আমরা কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলাম কিন্তু রিজার্ভ তো কমছে। আমাদের কি শঙ্কার কোনো কারণ আছে?
রিজার্ভ নিয়ে উদ্বেগের জায়গাটা তো বেশ কয়েক মাস ধরেই আছে। ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে এটা কমে এল ৩০ বিলিয়নের নিচে। এখন বাড়ার চেয়ে সেটা কমেছে। চলতি অর্থবছরে (২০২২-২৩) সরকার আমদানি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নানাভাবে উদ্যোগ নিয়েছে। এলসি ওপেনিং কমেছে, আমদানি কমেছে। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে আমরা কিছু ইতিবাচক ধারা দেখছি। কিন্তু তারপরও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি অনেক কম। আর রফতানির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত বড় কোনো ধাক্কা দেখিনি, যদিও প্রবৃদ্ধি অনেক কমে গেছে। উদ্বেগের জায়গা এখনো আছে। রিজার্ভের পতন ঠেকাতে না পারলে, বড় ধরনের কোনো সংকট সৃষ্টি হতে পারে। তবে আশা করি, বাংলাদেশ এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে।










