১৯৪৮ সালের আইন অনুযায়ী জুলাই-আগস্টের ম্যাসাকারকে ‘জেনোসাইড’ বলা সম্ভব না হলেও ‘মাস কিলিং’ অর্থে বাংলায় গণহত্যা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এ হত্যাযজ্ঞে সারা দেশে ১ হাজার ৫৮১ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক উপকমিটি। এ হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছে বহুদিন ধরে। অন্তত দেড় দশক ধরে চলমান একটি সিস্টেমেটিক কিলিং মিশনের চূড়ান্ত ধাপ ছিল জুলাই-আগস্টের গণহত্যা।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গণহত্যাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘জেনোসাইড ওয়াচ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর গ্রেগরি স্ট্যানটন বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত জেনোসাইডগুলো পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন, যেকোনো গণহত্যা ১০টি ধাপে সম্পন্ন হয়। ১০টি ধাপ হচ্ছে—১. পৃথকীকরণ (ক্ল্যাসিফিকেশন) ২. প্রতীকীকরণ (সিম্বোলাইজেশন) ৩. বৈষম্য (ডিসক্রিমিনেশন) ৪. অমানবিকীকরণ (ডিহিউম্যানাইজেশন) ৫. সংগঠন (অর্গানাইজেশন) ৬. মেরুকরণ (পোলারাইজেশন) ৭. প্রস্তুতি (প্রিপারেশন) ৮. নিপীড়ন (পারসিকিউশন) ৯. নির্মূল (এক্সটারমিনেশন) ও ১০. অস্বীকার (ডিনায়াল)। এ ১০টি ধাপ ক্রমান্বয়ে ঘটবে এমন নয়। কোনোটি আগে-পরে বা একই সঙ্গে একাধিক ধাপ সংঘটিত হতে পারে।
ডক্টর গ্রেগরি স্ট্যানটন কোনো জাতিগোষ্ঠীকে গণহত্যার মাধ্যমে নির্মূল করার যে ধাপগুলোর কথা তুলে ধরেছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিমের সঙ্গে তুলনা করলে দেখব, তারাও একইভাবে বহুদিন আগে থেকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের উদ্দেশ্যে ওই ধাপগুলো অনুসরণ করেছে।
ডক্টর স্ট্যানটনের প্রথম ধাপ হচ্ছে, পৃথকীকরণ (ক্ল্যাসিফিকেশন)। এ ধাপে ভিন্নমত পোষণকারী জনগোষ্ঠীকে সহ্য করা হয় না। সমাজে ‘আমরা বনাম তারা’ এভাবে বিভক্তি সৃষ্টি করা হয়। বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিমও শুরু থেকে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে জাতির মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে।
দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে, প্রতীকীকরণ বা সিম্বোলাইজেশন। এ ধাপে প্রতিপক্ষকে ঘৃণার পাত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিম তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে স্বাধীনতাবিরোধী, জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকসহ নানা প্রতীকীকরণ করে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছে। ‘জিন্দাবাদ’ স্লোগানকেও স্বাধীনতাবিরোধী স্লোগান হিসেবে পরিচিত করা হয়েছে। সাধারণ ধর্মীয় পোশাক বা বইপত্রকেও জঙ্গিবাদসংশ্লিষ্ট বলে চিত্রিত করেছে।
বৈষম্য বা ডিসক্রিমিনেশন গণহত্যার তৃতীয় ধাপ। এ ধাপে প্রতিপক্ষ জনগোষ্ঠীর প্রতি প্রচণ্ড রকমের বৈষম্য করা হয়। ফ্যাসিস্ট সরকার তাদের বিরোধী পক্ষের ওপর নজিরবিহীন বৈষম্য করেছে। সরকারি চাকরিতে সুযোগ না দেয়া, ভ্যারিফিকেশন আটকে দেয়া, ব্যবসা করতে না দেয়া, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ দিয়ে নিজেদের লোকজনকে প্রশাসনে বসানো, বিরোধী মতের মানুষকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিতাড়ন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কৌশলে বিতাড়িত করার মতো ঘটনা ঘটেছে। বৈষম্য অতি প্রকট হওয়ার কারণেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামেই গণ-অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছে।
ডিহিউম্যানাইজেশন বা অমানবিকীকরণ গণহত্যার চতুর্থ ধাপ। এ ধাপে প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীকে স্বাভাবিক মানুষ বিবেচনা করা হয় না। তাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। তাদের মানবাধিকারের স্বীকৃতিও অগ্রাহ্য করা হয়। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট সরকার বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের শুরু থেকেই ডিহিউম্যানাইজ করেছে। তাদের জীবনের অধিকার বা আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। শিবির সন্দেহে বুয়েটের আবরার ফাহাদকে হত্যা করা, বিএনপি-জামায়াত, ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ছাত্রশক্তি, ছাত্রশিবিরসহ অন্যান্য বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীর ওপর নজিরবিহীন হামলা, আহতদের চিকিৎসা করতে না দেয়া, আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ না দিয়ে সুকৌশলে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য করেছে। কাউকে বিরোধী দলসংশ্লিষ্ট দেখিয়ে হত্যাসহ যেকোনো নির্যাতনকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
গণহত্যার পঞ্চম ধাপ হচ্ছে সংগঠন বা অর্গানাইজেশন। যারা এ গণহত্যা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে তাদের আগে থেকেই সুসংগঠিত করা হয়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গুম, খুন, ক্রসফায়ার করার জন্য কিছু বিশেষায়িত গোষ্ঠীকে তৈরি করেছিল বিগত সরকার। যেমন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবকে দেশে-বিদেশে ডেথ স্কোয়াড বলা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে স্যাংশন দিয়েছে। আন্দোলনের সময়ে র্যাবের বিরুদ্ধে হেলিকপ্টার দিয়ে গুলি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারি দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনও দমন-পীড়নের কাজে প্রশিক্ষিত ছিল।
পরবর্তী ধাপে মেরুকরণ বা পোলারাইজেশনের ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে টার্গেট গ্রুপকে উদ্দেশ করে ‘হেইট স্পিচ’ বা ঘৃণা ছড়ানো হয়। ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া, এমনকি পাঠ্যপুস্তকেও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের টেলিভিশন চ্যানেল এবং পত্রিকার মাধ্যমে বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে ভয়াবহ মাত্রার হেইট স্পিচ ছড়িয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির আড়ালে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে হেইট স্পিচ ছড়ানো এবং রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন করা হয়। পাঠ্যপুস্তকেও ইতিহাস বিকৃত করে প্রতিপক্ষের নামে কুৎসা ছড়ানো হয়েছে।
গণহত্যার অষ্টম ধাপ হচ্ছে প্রস্তুতি বা প্রিপারেশন। তারা এক্ষেত্রে নিজেদের অপরাধের ন্যায্যতা সৃষ্টির জন্য দেশরক্ষা বা উগ্র জাতীয়তাবাদী বয়ান তৈরি করে। প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। ভুক্তভোগী গোষ্ঠীকে নানাভাবে ভীতিকর পরিবেশের মধ্যে রাখে। তাদের পক্ষে যাতে কেউ কথা বলতে না পারে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সেই ব্যবস্থা করা হয়। অন্যদিকে হত্যাকারী বাহিনীকেও প্রস্তুত রাখা হয়। ফ্যাসিস্ট সরকার শুরুতে বিরোধী দলকে দমন করে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সরকারি বাহিনী ও বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে সব অপরাধ করার ব্লুপ্রিন্ট করে রেখেছিল।
গণহত্যার পরবর্তী ধাপ হচ্ছে নিপীড়ন বা পারসিকিউশন। এ ধাপে ভিকটিম গ্রুপ এবং তাদের সম্ভাব্য রক্ষকদের শনাক্ত করে হত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন করা হয়। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার বিডিআর বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র করে প্রথমে সেনাবাহিনীর অফিসারদের হত্যা করে সেনাবাহিনীকে পঙ্গু করে দেয়। আয়নাঘর সৃষ্টি করে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের গুম করে রাখে। বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইলিয়াস আলীদের গুম করে রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রচণ্ড রকমের ভীতি সৃষ্টি করে। জামায়াতের দুজন শীর্ষ নেতার সন্তানদেরও গুম করে রাখে। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ মিলিয়ে প্রায় ৭০০ মানুষকে গুম করে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয় ২ হাজার ৬৯৯ জন এবং গুমের শিকার হয়েছে ৬৭৭ জন। বিএনপির মামলার তথ্য ও সংরক্ষণ শাখা কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শুধু বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে লক্ষাধিক মামলা দেয়া হয়েছে, যেখানে আসামির সংখ্যা ৪০ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে তিন থেকে চার শতাধিক মামলা রয়েছে।
অরাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্ট, সাংবাদিক, শিক্ষক, আইনজীবীসহ অনেকেই হামলা-মামলা এবং রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ছিল নিপীড়নের একটি বড় অস্ত্র। অনেক বিচারক ফৌজদারি আইনের অপপ্রয়োগ করে নিপীড়নের সহযোগী হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
নির্মূল বা এক্সটারমিনেশন গণহত্যার শেষের দিকের ধাপ। এ পর্যায়ে প্রতিপক্ষকে সমূলে উৎখাত করার জন্য প্রাণঘাতী আক্রমণ করা হয়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একপর্যায়ে ‘দেখামাত্র গুলির নির্দেশ’ দিয়ে এ গণহত্যা চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে। কিন্তু এর আগেও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের সমাবেশে গুলি চালানো হয়েছে। মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ সালের আন্দোলনে, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে, ২০২২-২৩ সালের আন্দোলনে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গুম করে, মিছিল-সমাবেশে গুলি করে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ক্রসফায়ার ও হেফাজতে নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে পুলিশ, র্যাব ও সরকারি দলের ক্যাডারদের হামলায় এখন পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার আগেও আরো তীব্র বলপ্রয়োগ করে আন্দোলন দমন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনী গুলি চালাতে রাজি হয়নি।
গণহত্যার সর্বশেষ বা দশম ধাপ হচ্ছে অস্বীকার বা ডিনায়াল। এ পর্যায়ে অপরাধীরা গণহত্যার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংঘটিত সব ধরনের অপরাধ অস্বীকার করে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ থেকে শুরু করে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরামদের হত্যাকাণ্ডের কথাও অস্বীকার করেছে। সরকার ও তাদের বশংবদ সাংবাদিক, শিক্ষকসহ অনেকে আয়নাঘরের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে, গুম-ক্রসফায়ারে হত্যাকাণ্ডগুলো অস্বীকার করেছে, ভোট ডাকাতি অস্বীকার করেছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরও বিভিন্ন সরকারি বাহিনী তাদের অপরাধের দায় অস্বীকার করেছে। এমনকি আন্দোলনের সময় হেলিকপ্টার থেকে গুলি করার দায়ে অভিযুক্ত র্যাবের পক্ষ থেকে সম্প্রতি দাবি করা হয়েছে, তারাও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পক্ষে ছিল। অতীতে তারা গুম, খুন, ক্রসফায়ার ও হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ডক্টর গ্রেগরি স্ট্যানটনের তত্ত্ব অনুযায়ী, জেনোসাইড ১০টি ভিন্ন ভিন্ন ধাপে সংঘটিত হয়। এর মধ্যে একাধিক ধাপ একত্রে চলমান থাকতে পারে। জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে আন্দোলনকারীদের ওপর যে ‘মাস কিলিং’ হয়েছে, সেটাও একদিনে ঘটেনি। দীর্ঘ ১৫ বছরে ধীরে ধীরে এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলে তাদের দমন করার যে চেষ্টা তা আরো ১৫ বছর আগে থেকে প্রয়োগ করা হয়েছে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। শেষ ধাপে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা শহীদ হলেও প্রথম ধাপগুলোয় ভুক্তভোগী হয়েছে বিএনপি, জামায়াত এবং অন্যান্য বিরোধী দল ও বিরোধী মতের অ্যাক্টিভিস্টরা।
হাবিবুর রহমান: আইনজীবী, ঢাকা আইনজীবী সমিতি










