সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হিসেবে সাধারণ জনগণ এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি সর্বমহলকে আতঙ্কিত করেছে। সরকারসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের বক্তব্যের আলোকে বিষয়টি আরো গুরুতর আকারে জনগণের কাছে প্রকাশ পেয়েছে। তথ্য ফাঁসের ঘটনা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন কিছু নয়। ভার্চুয়াল জগতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, বিমান বাংলাদেশের ওয়েবসাইট হ্যাক এবং সংশ্লিষ্টদের তথ্য হ্যাক, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং ব্যাংকের ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়াসহ নানা ঘটনা অতীতে আমাদের সাইবার জগতের নিরাপত্তার বিষয়ে যথেষ্ট চিন্তিত করেছে। যদিও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নকে এক ধরনের সুরক্ষার মাপকাঠি হিসেবে দেখানো হয়েছিল। আইনটি বিভিন্ন কারণে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং সাইবার জগতের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আশানুরূপ ফলাফল দেখাতে পারেনি। সাইবার জগতের নিরাপত্তায় হামলার ঘটনা বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীজুড়েই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা মানুষকে নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। পৃথিবীর কোথাও বসে এক ক্লিকের মাধ্যমে কত বড় ক্ষতি করা যে সম্ভব তা রিজার্ভ ব্যাংক থেকে টাকা চুরি, সনি পিকচার এন্টারটেইনমেন্টের ওপর সাইবার অপারেশন ইত্যাদি ঘটনা প্রমাণ করে। কাজেই প্রথমে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে তথ্যপ্রযুক্তির জগতে অবশ্যই এ ধরনের মারাত্মক অপরাধমূলক ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে এবং এটা প্রতিনিয়ত ঘটতে পারে। ফলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত প্রযুক্তিগত পেশাদারত্ব দক্ষতার মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোপরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং সর্বদা ভিজিলেন্ট থাকা। সিঙ্গাপুরের একজন আইনপ্রণেতার সঙ্গে কুয়ালালামপুরে আলাপকালে তিনি বলেছিলেন যে আমাদের ১ মিলিয়ন টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমপরিমাণ খরচ করতে হয়!

দ্বিতীয়ত, ইদানীং তথ্য ফাঁস নিয়ে যে আলোচনা আমাদের চিন্তিত করেছে তার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, এখানে তথ্য বলতে নাগরিকদের নাম, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, জন্মনিবন্ধন নম্বর, আঙুলের ছাপসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো ফাঁস হয়েছে। একটি দৈনিক ইংরেজি পত্রিকার বরাতে বলা হয়েছে সরকারের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন সম্পর্কিত রেজিস্ট্রার জেনারেলের অফিস থেকে পাঁচ কোটি নাগরিকের তথ্য ফাঁস হয়েছে। এখানে আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে আতঙ্কিত হওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে আমাদের ব্যাংক লেনদেন, প্রয়োজনীয় অফিশিয়াল কার্যসম্পাদন, ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলির সংরক্ষণ এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়ে অংশগ্রহণের জন্য এ তথ্যগুলোর মাধ্যমেই ভার্চুয়াল জগতে আমরা নিজেদের কার্যাবলি পরিচালনা করি। ফলে চিন্তিত এবং আতঙ্কিত হওয়াটাই স্বাভাবিক।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন। সামনের দিকে স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের জন্য সরকার যথেষ্ট বিনিয়োগ করে আসছে। উল্লিখিত উদ্দেশ্যাবলির প্রেক্ষাপটে সরকারের জোরালো অবস্থান প্রদর্শন এবং ভার্চুয়াল জগৎকে যথাযথ প্রক্রিয়া নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমেই কেবল ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে পারে। এ অবস্থায় নাগরিকদের তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি আমাদের বরং অনেকটুকু পিছিয়ে দিয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। এ অবস্থায় আমার কাছে মনে হয় সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নাগরিকদের মাঝে সাইবার জগতের নিরাপত্তার বিষয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনা। এটি সম্ভব বিভিন্নভাবেই।

১. তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি যথাযথ এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে যতটুকু সম্ভব জনসম্মুখে রিপোর্ট পেশ করা যাতে করে সত্য জানার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোয় কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে তা জানানো। আরো গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে ফাঁস হওয়া তথ্যগুলোর বিষয়ে সরকারের অবস্থান বা কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে যাতে করে এ তথ্যগুলো কোথাও কোনোভাবে অপব্যবহার করার সুযোগ থাকছে না—এ মর্মে অবস্থান স্পষ্ট করা। এ ব্যাপারে নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। 

২. তথ্য ফাঁসের এ ঘটনায় যাদের অভিযুক্ত হিসেবে তদন্তের মাধ্যমে পাওয়া যাবে, তাদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ সময়ে বিচারকার্য সম্পাদনের মাধ্যমে উদাহরণ সৃষ্টি করা। সনি পিকচার এন্টারটেইনমেন্ট সাইবার অপারেশনের পর এফবিআই তদন্ত করে উত্তর কোরিয়ার নাগরিক পার্কের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এমনকি লাযারাস গ্রুপ নামের সংগঠনকেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রকাশ হলে জনমনে এক ধরনের আস্থা তৈরিতে সহায়ক হবে। 

৩. ফাঁসের ঘটনায় সরাসরি সহযোগিতা করেনি কিন্তু কোনো অধিদপ্তর বা অফিসের গাফিলতির ফলে যদি তথ্য ফাঁস হয়ে থাকে, তাদের ব্যাপারেও আইনি ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে করে ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট অফিসগুলো সর্বোচ্চ সতর্কতার মাধ্যমে নিজেদের দায়িত্ব পালনে তৎপর থাকে। টর্ট আইনে যেমন দায়বদ্ধতা সব কাজের ক্ষেত্রে সমান নয়, তেমনি ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রশ্নে অবহেলার বিষয়টি কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। 

ইউনিভার্সিটি অব মালায়ার প্রযুক্তি আইন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. এরশাদুল করিম একটি সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন যে বর্তমানের এ ঘটনাকে আমাদের ‘ওয়েকাপ কল’ হিসেবে চিহ্নিত করে যথাযথভাবে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নিতে হবে। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে প্রযুক্তিনির্ভরতা কমানো কখনই উন্নতির দিকে ধাবিত করবে না বরং উল্টোদিকে নিয়ে যাবে। আবার এটাও স্বীকার করতে হবে যে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে নাগরিকদের প্রযুক্তিনির্ভরতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় কমে আসবে যা মোটেও কাম্য নয়। প্রযুক্তিনির্ভরতা অত্যন্ত সতর্কতার বিষয়—এটি বিশ্বাস করে রাষ্ট্রকে যথাসম্ভব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা সমীচীন। পদক্ষেপগুলোর মধ্যে প্রথমত আসবে সাইবার জগতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষ এবং অভিজ্ঞ জনবল তৈরি করা। আমার কাছে প্রযুক্তির বিষয়গুলো অনেকটা বিভিন্ন জটিল রোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য মনে হয়। যেমন ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য আপনাকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে যদিও সে প্রিয়পাত্র না হন। তেমনি প্রযুক্তির বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় করে তাদের মতামত নিয়ে এগোতে হবে। সেটি সম্ভব দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় সংশ্লিষ্ট গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করা, যাতে আগামী দিনের বাংলাদেশে যথেষ্ট সংখ্যক দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে গতানুগতিক রাষ্ট্রের নিরাপত্তার যে সংজ্ঞা আমাদের চালিত করে আসছে সাইবার জগতের নির্ভরতা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সাইবার জগৎকে অন্তর্ভুক্ত করে। এ অবস্থায় অবশ্যই সাইবার নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ ঘোষণা করে প্রয়োজনীয় সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতেই হবে। লেখার শুরুতে যেমনটি বলেছিলাম—পৃথিবীর কোথাও বসে একটা মাউসে ক্লিক করার মাধ্যমে একটা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে তছনছ করে দেয়া যায়। এটা যেন সবসময় আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিচালনাকারীদের বিবেচনায় থাকে। এর ফলে এক ধরনের সতর্কতা সর্বদা আমাদের চিন্তাভাবনাকে সাইবারের বিষয়ে আরো উন্নত ব্যবস্থাপনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে পরিচালিত করবে। একই সঙ্গে বর্তমান ঘটনাটিকে বেজলাইন ধরে দ্রুত আইনি কাঠামো দাঁড় করিয়ে নিতে হবে। ‘নিরাপদ সাইবার জগৎ’ স্লোগানে নয়, বরং জনগণের অনুধাবন করার বিষয়।

মোস্তফা হুছাইন: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি মালায়া এবং সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়