মো. নিজামুল হক নাসিম বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সাবেক বিচারপতি। ২০২১ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। এর আগে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত নবম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা, গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণকর্তা হিসেবে প্রেস কাউন্সিলের কার্যক্রম এবং এটির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন সাবেক বিচারপতি মো. নিজামুল হক নাসিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন
মুক্ত গণমাধ্যমের সূচকে বাংলাদেশ এক ধাপ পিছিয়ে যাওয়ার কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
এরই মধ্যে সরকারের নানা মহল থেকে এ বিষয়ে কথা বলেছে। তাই এ নিয়ে আমি নতুন কিছু যুক্ত করতে চাই না। তবে এ বিষয়ে সমালোচনা, আপত্তি তো আছেই। আমরা চাই, সাংবাদিক থেকে শুরু করে এটির সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই প্রেস কাউন্সিলে আসুক। প্রেস কাউন্সিলের চাওয়া হলো, যেকোনো ধরনের সমস্যা আমাদের অভিহিত করা হোক। আমরা সমস্যা সমাধান করতে সর্বদা প্রস্তুত। এখনো নানা সমস্যা সমাধানে কাজ করছি আমরা। তবে একটা কথা বলব, তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে আমাদের দেশের গণমাধ্যম ভালো। তবে আমাদের আরো ভালো হতে হবে।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চিত্রটি আপনার কাছে কেমন?
বাংলাদেশের গণমাধ্যম নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের মন্তব্যই করা হয়ে থাকে। আমার কাছে মনে হয় গণমাধ্যমের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়া এখনো সম্ভব হয়নি। তার মানে এই নয় যে আমাদের গণমাধ্যম সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। আমি যেহেতু প্রেস কাউন্সিলের কাজগুলো খুব কাছ থেকে দেখছি, তাই আমার কাছে দেশের গণমাধ্যমের অবস্থা সংখ্যাগত দিক থেকে আগের চেয়ে ভালো বলে মনে হয়। বর্তমানে প্রকাশিত পত্রিকার সংখ্যা আগের চেয়ে বেশি। এসব কিছু সত্ত্বেও অনেকে বলে থাকেন সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমগুলোর ভয়ভীতি আছে। এ বিষয়ে বলব—এ ভীতিটা সম্পূর্ণ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে নিয়ে। অন্যদের মতো আমিও এ আইনের বর্তমান প্রয়োগ শতভাগ সঠিক বলে মনে করি না। তাই আইনের প্রয়োগ কীভাবে হবে সেটি নিয়েই আলোচনা করতে হবে। সাংবাদিকতার সব বিষয় নিয়ে আরো স্পষ্ট হলে এবং সাংবাদিক ও সরকার একে অন্যের সহায়তাকারী হলে সাংবাদিকতার মান নিঃসন্দেহে আরো ভালো হবে।
আপনার মতে মুক্ত গণমাধ্যম কী?
গণমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের চতুর্থ অঙ্গ। প্রেস কাউন্সিলের নীতিমালায় সাংবাদিকতা সম্পর্কে বলা আছে। আমি মনে করি, যেহেতু আমাদের একটি আইন আছে, তাই সেটি মেনে তাদের ইচ্ছামতো লেখার স্বাধীনতাই মুক্ত গণমাধ্যম। প্রেস কাউন্সিলের প্রধান চাওয়াই হলো গণমাধ্যমের উন্নয়ন। একই সঙ্গে অন্যতম উদ্দেশ্য হলো জনমুখী সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করা। অন্যায়ভাবে সাংবাদিক বা সাধারণ মানুষ যে কারো ক্ষতি হলে সেটি থেকে তাদের রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য।
প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে আপনি দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রেস কাউন্সিলের কোন বিষয়গুলোয় অগ্রগতি সাধন করতে পেরেছেন বলে আপনি মনে করেন?
চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে প্রেস কাউন্সিলের অগ্রগতির জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। প্রচারণা বাড়িয়েছি। সেমিনার-আলোচনা সভাসহ নানা মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন ইউনিয়নগুলোয় গিয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। মামলাগুলোর সমাধানে গতি এসেছে। এর জন্য আমাদের ট্রাইব্যুনাল কোর্ট আছে। এখানে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাংবাদিকের, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মালিকের এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মামলা রয়েছে। প্রতিদিনই মামলাগুলো মীমাংসা হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাংবাদিকদের ডাটাবেজ তৈরি করা। যার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এতে করে সব সাংবাদিককে একই ছাতার নিচে আনা যাবে। তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে সঠিক খবর প্রচারের প্রবণতা। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের মান আরো বাড়বে, যার সুফল পাবে বাংলাদেশের মানুষ। তবে আমি মনে করি, এ ব্যাপারে আমাদের সাংবাদিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন। তাদের সহযোগিতা পেলে আমাদের জন্য কাজ করা সহজ হবে। একই সঙ্গে সরকারেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।
গণমাধ্যমে স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল কী ধরনের কাজ করছে?
প্রেস কাউন্সিল প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সাংবাদিকদের মান উন্নয়নে কাজ করছে। প্রেস কাউন্সিলের অন্যতম কাজ হলো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাংবাদিকদের উন্নত করা। একই সঙ্গে সাংবাদিকরা হেনস্তার শিকার হলে কোন আইনে তারা রক্ষা পাবেন এবং তারা কোন বিষয়গুলো সামনে রেখে সাংবাদিকতা করবেন সেগুলো নিয়ে সচেতন করাই আমাদের মূল কাজ।
সাংবাদিকতার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে আমাদের কমিটি আছে। প্রেস কাউন্সিলের মতো এত শক্তিশালী কমিটি বাংলাদেশের অন্য কোথাও নেই। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতার জন্য জনগণ ও সাংবাদিকতার জন্য কাজ করতে চাইলেও আমরা করতে পারছি না। আমাদের প্রচারণা অতটা শক্তিশালী নয়। যদিও অনেকে বলেন, এখন প্রচারটা আগের তুলনায় বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রেস কাউন্সিলের অর্থনৈতিক শক্তিও তেমন বাড়েনি। এরই মধ্যে আমরা সারা দেশের সাংবাদিকদের তালিকা প্রণয়নে কাজ করছি। এ তালিকা করার জন্য প্রত্যেক জেলার জেলা প্রশাসককে বলা হয়েছে। এক বছরের মধ্যে ১৯টি জেলার সাংবাদিকদের তালিকা এসেছে।
প্রেস কাউন্সিলের বিরাজমান শাস্তিটি নিয়ে অনেকে কথা বলছেন। এ বিষয়ে আমি মনে করি, শাস্তিটি কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে প্রেস কাউন্সিল থেকে যে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে তা যথেষ্ট বাস্তব। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই প্রস্তাবনাটি ঠিক করা হয়েছে। যদিও সেই সময় আমি ছিলাম না। কিন্তু সেই প্রস্তাবনা সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ একমত।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
এটিকে কঠিন আইন বলেই আমি মনে করি। এটি তো বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে আসে না। ১ কোটি টাকা জরিমানা! ৫ কোটি টাকা জরিমানা! ১৫ বছরের জেল! ১০ বছরের জেল! পাঁচ বছরের জেল! জরিমানা তো এত কোটি হতে পারে না। এ রকম কিছু বিষয় আছে যেগুলো সংশোধন হওয়া দরকার।
প্রথমদিকে এ আইনের অনেক অপব্যবহার হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ আইনের অপব্যবহার আগের থেকে কমে গেছে।একই সঙ্গে কমেছে এ আইনের মাধ্যমে করা হয়রানি। সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হয়েছে জামিন নিয়ে। যেখানে বলা আছে এটি অজামিন যোগ্য। এর অর্থ হলো—কোর্ট চাইলে জামিন দিতে পারে, আবার নাও দিতে পারে। দুটি কর্তৃত্বই কোর্টের আছে। কাকে জামিন দেয়া হবে, কাকে দেয়া হবে না সেটি একান্তই কোর্টের বিষয়। তবে ডিজিটাল আইনে আগে জামিন হতোই না বলা চলে। সেখানে এখন জামিনের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পথে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে বাধা মনে করছে। এটি নিয়ে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল কী ভাবছে?
অবশ্যই, এটি একটি চিন্তার বিষয় বটে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বর্তমান প্রয়োগ নিয়ে সবারই প্রশ্ন আছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে। একটি হলো—এ আইন বাতিল করতে হবে। অন্যটি হলো—এ আইন যেমন আছে তেমনই থাকবে। তৃতীয়টি হলো—এটিতে পরিবর্তন আনা। যেহেতু আমাদের দেশে সাইবার অপরাধ হচ্ছে, তাই সরাসরি নয়, অন্যভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে আইনের দরকার আছে বলে আমি করি। কিন্তু যে আইনই করা হোক না কেন সেটির নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত ব্যবহার করতে হবে। দিনশেষে একটা কথা মনে রাখতে হবে—আইন করা হয় অপরাধ দমনের জন্য।
অনেকে বলছেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে মামলা দিয়ে হেনস্তার ঘটনা ঘটছে। এটি নিয়ে আপনার মতামত কী?
আমাদের দেশের স্বাধীনতার পর থেকেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থারাও অন্যায় করছে। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধেও শাস্তির ব্যবস্থা করার এখন সময় এসেছে বলে আমি মনে করি। কয়েকভাবে তাদের শাস্তি দেয়া যায়। যেমন তাদেরকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া যেতে পারে অথবা জরিমানা আরোপ করা যেতে পারে। এ উপায়গুলোর মাধ্যমে অন্যায় কমাতে হবে। এসবের পাশাপাশি সাংবাদিকরা যখন হেনস্তার শিকার হবেন তাদের নিজেদেরকেই কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। যেহেতু আমরা সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা, তাই আমরা তাদের পাশে থাকব।
একদিকে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাকস্বাধীনতা দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকরা বলছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ আরো কিছু আইন বাকস্বাধীনতার পথে অন্তরায় হয়ে আছে। বিষয়টি সংবিধানের বাকস্বাধীনতার পথে অন্তরায় কি?
মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়। মায়ের ভাষাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন একসময় মহীরুহে পরিণত হয় এবং আমরা পাই নিজেদের ঠিকানা। সে বিষয়গুলোকে ধারণ করে প্রেস কাউন্সিলের পথচলা শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ বাকস্বাধীনতা নিয়ে প্রেস কাউন্সিল কাজ করে যাচ্ছে। যেখানে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। অন্যদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন বা পরিবর্তন করার দায়িত্ব প্রেস কাউন্সিলের ওপর নয়। অতএব এ আইন যারা বাস্তবায়ন করছেন তারাই এটি ঠিক করবেন বলে আমি মনে করি। এটি নিয়ে আমি নতুন করে কিছু বলতে চাই না।
গণমাধ্যম কেন্দ্র করে নতুন চারটি আইনের খসড়া প্রক্রিয়াধীন আছে বলে অনেকে বলছেন। কী আছে ওই খসড়ায়?
আমি আসার অনেক পূর্বেই এ খসড়া নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তাই এ খসড়ায় আমার পক্ষ থেকে নতুনভাবে কিছু যুক্ত করার সুযোগ ছিল না। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে যে খসড়া হয়েছে সেটি সাংবাদিকদের পক্ষেই যাবে। তাদের সাংবাদিকতার বিকাশের জন্যই করা হবে বলে শুনেছি। আমার ধারণা, আইনে যে সংশোধনী হচ্ছে সেগুলোর প্রত্যেকটি প্রেস কাউন্সিলের পক্ষের সংশোধনী। প্রেস কাউন্সিলের কিছুটা পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের উন্নয়নের জন্য এ সংশোধনী।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস-২০২৩ উপলক্ষে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে পাঁচটি দাবি রেখেছে। এ দাবিগুলোর সঙ্গে আপনি একাত্মতা প্রকাশ করেন কি?
উনাদের পাঁচটি দাবির বিষয়ে আমি অবগত। আমরা কিন্তু সে দাবিগুলো নিয়ে অনেক আগে থেকেই কাজ করছি। শুধু তা-ই নয়, এর সঙ্গে আরো অনেক বিষয় আছে যেগুলোর সমস্যা প্রেস কাউন্সিল থেকে সমাধান হয়েছে। উনাদের একটি দাবি থেকে উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। যেমন একটি দাবি ছিল, খসড়া করার আগে সবার সঙ্গে আলোচনা করে নেয়া। আমরা খসড়া নিয়ে মিটিংয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। এখনো খসড়াটি ওয়েবসাইটে দেয়া আছে।
আগামী দিনে দেশের গণমাধ্যমকে কোন অবস্থায় দেখতে চান?
অবশ্যই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যম দেখতে চাই। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যম থাকলে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলে। এক্ষেত্রে সাংবাদিক, সরকার ও সাধারণ মানুষ সবাইকে এটির জন্য লড়াই করতে হবে। সে লড়াইয়ে আমরা তাদের সহায়ক হয়ে আছি এবং থাকব।










