শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ও গ্রহণের মতোই অবিচ্ছেদ্য অংশ খেলার মাঠ। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি আদর্শ প্রতিষ্ঠান দাবি করতে পারে না খেলার মাঠ ছাড়া। কিন্তু আজ খেলার মাঠই শিশুদের জন্য সোনার হরিণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ১০ হাজারেরও বেশি সরকারি বিদ্যালয়ে নেই খেলার মাঠ। এতে দেশের ভবিষ্যৎ শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা যেমন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি খেলাধুলার অভাবে শিশুদের মধ্যে স্থূলতা, মাদকাসক্তি, ভিডিও গেম আসক্তি বাড়ছে। জাতি গঠন প্রক্রিয়া শুরুতেই বড় বাধার মুখোমুখি হচ্ছে। 

গতকাল বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যশোরে খেলার মাঠ নেই ২২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। জেলায় মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১ হাজার ২৯০টি, যার মধ্যে স্বল্প পরিসরে মাঠ রয়েছে ২৪৮টি বিদ্যালয়ে। সবচেয়ে খেলার মাঠ কম শার্শা উপজেলায়। এ উপজেলায় ৫৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই খেলার মাঠ। ভাবা যায়, একটি উপজেলার অর্ধশতকেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো খেলার মাঠ নেই? সেখানকার শিশুরা কীভাবে লেখাপড়া করছে বা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ কোন দিকে যাচ্ছে তা চিন্তা করলে ভয়ে শিউরে উঠতে হয়। 

শিক্ষাবিদরা বলছেন, খেলার মাঠ ছাড়া একটি বিদ্যালয় কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। তাই খেলার মাঠ ছাড়া কোনো বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সমীচীন নয়। যেসব অনুমোদিত বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নেই, সেসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রকল্পের আওতায় খেলার মাঠ স্থাপন করা প্রয়োজন। খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি হয়। খেলতে গিয়ে একে অন্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, সামাজিকীকরণ হয়। তাই বিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন অবশ্যই মাঠের বিষয়টি খেয়াল রাখা উচিত। 

দেশের প্রাথমিক শিক্ষার নানা দিক নিয়ে প্রতি বছর ‘অ্যানুয়াল প্রাইমারি স্কুল সেনসাস’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। ২০২১ শিক্ষাবর্ষের তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজার ৫৬৬টি। এর মধ্যে খেলার মাঠ রয়েছে ৫৪ হাজার ৮২৬টিতে। সে হিসাবে দেশের ১০ হাজার ৭৪০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নেই।

খেলার মাঠের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে সিলেট বিভাগের বিদ্যালয়গুলো। অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সিলেট বিভাগে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় ৫ হাজার ৫৮টি। এর মধ্যে খেলার মাঠ রয়েছে ৩ হাজার ২০৩টিতে। সে হিসাবে সিলেট অঞ্চলের প্রায় ৩৭ শতাংশ বিদ্যালয়েই খেলার মাঠ নেই। ফলে এসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও খেলাধুলায় পিছিয়ে রয়েছে শিক্ষার্থীরা। 

রাজধানী ঢাকাতেও হতাশার চিত্রই দেখা মেলে। বণিক বার্তার গত বছরের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দুই দশকে হারিয়েছে ঢাকার প্রায় অর্ধশত মাঠ। চলতি শতকের শুরুতে রাজধানী ঢাকায় অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের অধীন খেলার মাঠ ছিল ৭০টির মতো। এখন দুই সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে টিকে রয়েছে মোটে ২০টি। যেগুলো টিকে রয়েছে খেলাধুলার স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ হারিয়ে ফেলছে সেগুলোও। মাঠ বেদখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠছে প্রায়ই। আবার নানা স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে মাঠে খেলার জায়গা সংকুচিত করে ফেলার নিদর্শনও পাওয়া যায় অনেক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বসবাসের জন্য আদর্শ একটি শহরের প্রত্যেক বাসিন্দার জন্য কমপক্ষে নয় বর্গমিটার খোলা জায়গা দরকার। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫০ হাজার মানুষ বাস করা ঢাকা শহরে সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কম, মাত্র এক বর্গমিটার। 

রাজধানীতে একসময় প্রতিটি ওয়ার্ডে একাধিক খেলার মাঠ থাকলেও এখন অবস্থা একেবারেই হতাশাজনক। খোলা জায়গা বা খেলার মাঠের সংকটে নতুন প্রজন্ম একটা বদ্ধ পরিবেশে বড় হচ্ছে। এটা তাদের মনঃসামাজিক বিকাশের জন্য মোটেই শুভ নয়। কাজেই সর্বাগ্রে বেদখল হওয়া মাঠগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে। এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৪ সালে হাইকোর্ট রাজধানীর ৬৮টি খেলার মাঠ ও পার্কের জন্য সংরক্ষিত জায়গা ১৫ দিনের মধ্যে দখলমুক্ত করার নির্দেশ দেন। এ আদেশ যথাযথভাবে পালনে দুই দশকে কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি। বরং দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়নে দুই সিটি করপোরেশনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু পুরনো মাঠ পুনরুদ্ধার নয়, জনসংখ্যানুপাতে নতুন নতুন মাঠ তৈরির ব্যাপারেও কর্তৃপক্ষের উদ্যোগী ভূমিকা কাম্য।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, বড় মাঠ হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এলাকার মধ্যে ছোট ছোট খোলা জায়গা রাখা চাই, যেখানে সব বয়সের মানুষ খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটি করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সেই জায়গাগুলোও নেই। এমনকি আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন হাউজিং প্রকল্পেও এ ধরনের পর্যাপ্ত খোলা জায়গা রাখা হচ্ছে না। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) শিশুদের চাহিদার বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়। প্রয়োজনীয় খেলার মাঠের কথা বলা হয়। অথচ আবাসন প্রকল্প বা অন্য অবকাঠামোর ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন দৃশ্যমান নয়। ফলে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার পরিসর। এটা ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর। 

মাঠের অভাবে শিশুদের সুষ্ঠু মানসিক বিকাশ হচ্ছে না। শহরে-মফস্বলে গড়ে উঠছে বিভিন্ন কিশোর গ্যাং। তারা মাদক, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। নিয়মিতই কিশোর গ্যাংয়ের হাতে শিক্ষার্থী খুনের ঘটনা ঘটছে। মাঠ না থাকার কারণে সিংহভাগ শিশু-কিশোর বড় হচ্ছে চার দেয়ালে, সেলফোনের স্ক্রিনে আবদ্ধ থেকে। এতে যেমন তাদের পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ হচ্ছে না তেমনি অল্প বয়সেই চোখের সমস্যা, স্থূলতাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিটি শিশুকে দিনে অন্তত ১ ঘণ্টা বাইরে খেলাধুলা করার পরামর্শ দিচ্ছে। জাতিসংঘের শিশু সনদে বলা হয়েছে, শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের উপযোগী পরিবেশ রক্ষা ও সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। জাতীয় শিশুনীতি ও শিক্ষানীতিতেও শিশুর বিকাশ নিশ্চিত করার জন্য অনেক কথা বলা হয়েছে। অথচ বাস্তবে সুযোগ সৃষ্টি তো হচ্ছেই না। যেটুকু সুযোগ আছে, তাও রক্ষা করা যাচ্ছে না। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে খেলার মাঠ চাই। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের দিকে নীতিনির্ধারকদের সর্বোচ্চ মনোযোগ চাই। কারণ আজকের শিশুই আগামী দিনের দেশ নির্মাতা। তারা সবল ও সুস্থভাবে বড় হলে দেশও এগিয়ে যাবে।