দেশে গ্যাসের মজুদ ক্রমেই কমে আসছে। এতে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। অভিযোগ রয়েছে, দেশজ অনুসন্ধানে জোর না দিয়ে সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পথে হাঁটতে শুরু করে। এ আমদানিনির্ভরতা ক্রমে বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে গ্যাসের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) ও ভোক্তা উভয়ের জন্যই আর্থিক চাপ মারাত্মক আকার ধারণের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, গ্যাস খাতে আমদানিনির্ভরতা ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ২৪ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে প্রায় এক টিসিএফ গ্যাস আমদানি করতে সরকারের ব্যয় হয়েছে অন্তত ১ লাখ কোটি টাকা। যেভাবে আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে পেট্রোবাংলার প্রক্ষেপণ অনুসারে ২০৩০-৩১ সালের দিকে তা ৬৭ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছবে। পেট্রোবাংলা আমদানি করা এলএনজি লোকসানের মাধ্যমে কম মূল্যে বিক্রি করে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে পেট্রোবাংলা লোকসান থেকে বের হয়ে আসার পরিকল্পনার বিষয়ে জানিয়েছে। এজন্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে গ্যাসের মূল্য সমন্বয়ের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। এতে বর্তমানে পেট্রোবাংলা যেভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে, ভবিষ্যতে সেটি সম্ভব নাও হতে পারে। যার চাপ পুরোটা ভোক্তার ওপর পড়বে। অবশ্য বিদ্যমান লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসতে এর বিকল্প নেই বলেও দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে আইএমএফ পেট্রোবাংলার কাছে স্থানীয় উৎস, মজুদ ও সরবরাহের বিষয়েও জানতে চেয়েছে।

এক্ষেত্রে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গ্যাসের স্থানীয় অনুসন্ধানে জোর দেয়ার কথা বলে আসছেন। এদিকে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় গ্যাসের পাশাপাশি এলএনজি আমদানি করতে হবে। এটি করতে গেলে গ্যাস খাতে স্বাভাবিকভাবেই চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। এমনকি আর্থিক চাপ তৈরি হওয়ার পূর্বাভাস গ্যাস খাতের মহাপরিকল্পনায়ও রয়েছে। তাই এ চাপ প্রকৃত অর্থে ভোক্তা ও পেট্রোবাংলা কীভাবে মোকাবেলা করবে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যেহেতু আমদানিনির্ভর নীতির মাধ্যমেই পেট্রোবাংলা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সে হিসেবে ভবিষ্যতে গ্যাস খাতে স্বনির্ভর হওয়ার জন্য স্থানীয় অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ ও শিল্প প্রকল্পগুলোর জন্যই অনুসন্ধান বাড়ানো উচিত।

গ্যাস সংকট মোকাবেলায় জ্বালানি বিভাগ ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি করছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ব্যবহৃত (১ হাজার ৭৮ বিলিয়ন ঘনফুট বা বিসিএফ) গ্যাসের মধ্যে ১১ দশমিক ৭০ শতাংশ ছিল এলএনজি (১১৩ বিসিএফ)। এছাড়া মোট ব্যবহৃত গ্যাসের মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ২৩ শতাংশ, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ ছিল আমদানীকৃত এলএনজি। এছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে ব্যবহৃত গ্যাসের প্রায় ২১ শতাংশ ছিল এলএনজি। এ এলএনজি আমদানিতে ২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত অন্তত ৮৫ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছে জ্বালানি বিভাগ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ বাবদ অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। 

সবচেয়ে বড় কথা, এ আর্থিক চাপ সামাল দিতে গ্যাসের দাম বাড়িয়েও লোকসান কমাতে পারছে না পেট্রোবাংলা। বর্তমানে সংস্থাটি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তহবিল এবং গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থ ব্যবহার করে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এটি মোটেও টেকসই কোনো পন্থা নয়, দীর্ঘমেয়াদে এমনটি অব্যাহত থাকলে পেট্রোবাংলা আর্থিক চাপ সামলাতে হিমশিম খাবে।

গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে গৃহস্থালি পর্যন্ত প্রতিটি খাতেই ভোক্তাদের ব্যয় বাড়ে। এমনিতেই বিদ্যমান মূল্যস্ফীতির কবলে সাধারণ মানুষ জর্জরিত। তার ওপর গ্যাসের দাম বাড়লে তা আরো চাপ বয়ে আনবে। এজন্য ভোক্তাদের স্বস্তির বিষয়টি অবশ্যই সরকারকে ‍বিবেচনা করতে হবে। এজন্য জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। কেননা অতিমাত্রায় জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা দেশের জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রমকে হুমকিতে ফেলবে। বর্তমান বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষে ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে যাবে। তার চেয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেয়া বিচক্ষণতার পরিচয় হবে। এতে যেমন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যয় কমবে, পাশাপাশি এলএনজি আমদানি কম হলে ডলারের ওপরও চাপ কমবে।

গ্যাস খাতে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না চালানো ও আমদানিনির্ভরতার কারণে জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। এ ঝুঁকি প্রশমনে জ্বালানি বিভাগকে সঠিক পন্থা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) কার্যকর ভূমিকা জরুরি। নতুন নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধানের পাশাপাশি পরিত্যক্ত গ্যাসকূপগুলোতেও অনুসন্ধান চালাতে হবে। এমনকি বারবার সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে এলেও সমুদ্রে এখনো গ্যাসের অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে না। এটিও মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে জ্বালানি বিভাগ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, এটিই আমাদের কাম্য।