দেশে টানা ২২ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে তাদের ব্যয় বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়ছে না আয়। ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় তারা প্রয়োজনীয় অনেক পণ্যই কিনতে পারছে না। দেশের এ উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছিল। দেশেও সরকার পণ্যটির দাম বাড়ায়। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম কমেছে। কিন্তু সে অনুপাতে দেশের বাজারে পণ্যটির দামের সমন্বয় হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতির (হেডলাইন) গড় হার ছিল ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এ মূল্যস্ফীতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অবদান ছিল ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। গত বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে গড় হেডলাইন মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অবদান ছিল ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবা খাতের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে মূল্যস্ফীতি এতটা তীব্র হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুসারে, গত মার্চে দেশে জ্বালানি তেলের ‘স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ’ পদ্ধতি চালু রয়েছে। জ্বালানি বিভাগসংশ্লিষ্টদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে এ মূল্য নির্ধারণ হচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববাজারে পণ্যটির দাম কমতির দিকে থাকলেও চলতি মাসে জ্বালানি বিভাগ ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম বাড়িয়েছে। জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়ের এ পদ্ধতি ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন,  মূল্য সমন্বয়ের পদ্ধতি বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে অন্যত কারণ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অতিমাত্রায় মুনাফার প্রবণতা। জ্বালানি তেলের এ উচ্চ মূল্যকেই দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসার অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন তারা। 

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে উঠলে সরকার নির্বাহী আদেশে দেশে সরবরাহকৃত সব জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। উদ্দেশ্য ছিল বিপিসির লোকসান কমানো ও ভর্তুকি বন্ধ করা। কিন্তু বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমছে। গত মাসেও বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি গড় মূল্য ছিল ৮১ ডলার ৪০ সেন্ট। আর আন্তর্জাতিক বাজারে গতকাল মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ছিল ৭৬ ডলারের নিচে। মূল্যপতন অব্যাহত রয়েছে অন্যান্য বাজার আদর্শেও। ফলে জ্বালানি তেল বাবদ বিপিসির ব্যয়ও কমেছে; যদিও চাহিদা কমেনি। বিপিসি এখন উচ্চ মুনাফা করছে। কিন্তু বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার কোনো সুবিধা দেশের সাধারণ ভোক্তারা ভোগ করতে পারছে না। কারণ সরকার জ্বালানি তেলের দাম কমায়নি। জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব রাখছে। দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের ক্ষেত্রে বিপিসিকে শুধু মুনাফার কথা চিন্তা করলে হবে না; তাকে সর্বোচ্চ জনকল্যাণের বিষয়টিও চিন্তা করতে হবে। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের যে কথা বলা হচ্ছে সেটি বাস্তবে সমন্বয় হচ্ছে না। সমন্বয় বলতে মূলত বিপিসির ৫ শতাংশ মুনাফা রেখে ভোক্তা পর্যায়ে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্যটি সরবরাহ করার কথা। কিন্তু এখানে সরকার তথা বিপিসি সেটার পাশাপাশি অতিরিক্ত মুনাফা করছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটা তো তারা করতে পারে না। এ বছরও তাদের ৪ হাজার কোটি টাকার মুনাফার প্রাক্কলন রয়েছে। যেখানে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা কীভাবে এটা করছে বোধগম্য নয়। 

কিন্তু দেশের মানুষকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে মুক্ত করতে হলে বিপিসিকে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জনকল্যাণকে গুরুত্ব দেয়া দরকার। জ্বালানি তেলের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। 

জ্বালানি তেল হলো একটি কৌশলগত আবশ্যিক পণ্য। জ্বালানি তেল ব্যতীত এখনো কোনো উন্নয়নকাজ সমাধার কথা চিন্তা করা যায় না। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম নির্ধারণে নতুন কোনো ফর্মুলার প্রয়োজনও নেই, শুধু সদিচ্ছা প্রয়োজন। আমদানি করা জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে বিশ্বে প্রধানত তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। অধিকাংশ দেশ মার্কেট ডিটারমাইন্ড বা বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় পদ্ধতি অনুসরণ করে। আবার কোনো কোনো দেশ সর্বোচ্চ দর বা প্রাইস সিলিং পদ্ধতি অনুসরণ করে। বাংলাদেশের মতো কিছু দেশ ফিক্সড প্রাইস বা নির্ধারিত দরে জ্বালানি তেল বিক্রি করে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে বহুদিন ধরেই ডায়নামিক ডেইলি প্রাইসিং মেথড অবলম্বন করা হচ্ছে। সেখানে প্রতিদিন ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বিবেচনায় দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়। বিশ্বের যেসব জায়গা থেকে তেল আমদানি করা হয়, তার সঙ্গে সরকারি কর ও মুনাফা যোগ করে প্রতিদিন তেলের দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয় ভারতে। প্রতিদিন সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয় ঠিক করে দেয়, কত দামে ডিজেল-পেট্রল বিক্রি হবে। অনেক কিছু বিকেন্দ্রীকরণ করা হলেও এখানে ভারত সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণ আছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ঘণ্টায় তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়। যুক্তরাজ্যে প্রতিদিনই জ্বালানি তেলের দাম ওঠানামা করে। কিন্তু সেখানে সরকারি কোনো সংস্থা সেটা নির্ধারণ করে না। ক্রুড অয়েলের দাম, সরকারি কর, ভ্যাট ইত্যাদির সঙ্গে নিজেদের মুনাফা মিলিয়ে পাম্প মালিকরাই প্রতিদিন সেটা ঠিক করেন। ফলে একই দিন একেক এলাকায় তেলের দাম একেক রকমও হতে পারে। ভারতেও এলাকাভেদে তেলের দাম ভিন্ন হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সব জায়গায় একই দামে তেল বিক্রি হয়। দাম নির্ধারণেও বাংলাদেশে কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। বাংলাদেশ এনার্জি কমিশনকে এড়িয়ে সরকার নির্বাহী আদেশে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করে। এতে বিপিসি অতিমুনাফা ও চুরি-দুর্নীতি করলেও তা রোধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয় না। এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ জনগণকে। 

বাংলাদেশে তেলের দামের সঙ্গে অনেক কিছুর সম্পর্ক আছে। বোরো চাষ শতভাগ সেচনির্ভর, যাতে ডিজেল ব্যবহার হয়। তেলের দামের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির বিরাট সম্পর্ক আছে। এরই মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ ভয়াবহ চাপে আছে। এ অবস্থায় সরকার যদি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করে তাহলে মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়বে। আমরা আশা করব, সব দিক বিবেচনা করে সরকার এবার তেলের দাম কমাবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কৃষি, শিল্পসহ পরিবহন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির হারও বেড়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দামও বেশি। এ মুহূর্তে উদ্যোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস। এক্ষেত্রে অনেকে বলেন, জ্বালানির দাম কমালেও জনগণ তার সুফল পাবে না। কারণ ব্যবসায়ীরা দাম কমাবেন না। এটি কোনো যৌক্তিক কারণ হতে পারে না। জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সুফল ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। জ্বালানির দাম বাড়ানোর সময় সরকার এক সপ্তাহের মধ্যে পরিবহনের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারলে কমানোর সুফল কেন নিশ্চিত করতে পারবে না, তা বোধগম্য নয়। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাই এক্ষেত্রে যথেষ্ট।

সরকার একক আমদানিকারক হিসেবে জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্য নিয়ে উচ্চ মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনা করছে। কোনো বেসরকারি কোম্পানি এটি করলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকার তাকে জেল-জরিমানার আওতায় নিয়ে আসত। বিপিসির বেলায় কোনো পদক্ষেপ কেন নেয়া হবে না তা একটি প্রশ্ন বটে। বাংলাদেশে বিপিসি জ্বালানি পণ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। তারা ব্যবসা করে বিধায় রেগুলেটরের আওতায় জ্বালানির দাম নির্ধারণ করা উচিত। সরকারের জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে দেশীয় দামের সমন্বয় করা উচিত।