দেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে সংকটকাল অতিক্রম করছে। ডলার সংকট, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের পাশাপাশি খেলাপি ঋণের হার ক্রমাগত বেড়েই চলছে। এক্ষেত্রে ব্যাংক পরিচালনায় যারা যুক্ত আছেন, অভিযোগের তীর তাদের দিকেই ছোড়া হচ্ছে। কারণ ব্যাংক পরিচালকরা প্রায়ই তাদের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে ঋণ প্রদানে ভূমিকা রাখেন; যার ফলে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা দুরূহ হয়ে পড়েছে। এজন্য ব্যাংকের পরিচালকরা কত বছর পর্ষদে থাকবেন সেটি ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এ ঠিক করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিচালকদের মেয়াদ-সংক্রান্ত ধারা ১৫কক-এর সর্বশেষ সংশোধনী অনুযায়ী ২১ জুন জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর এটি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, ২০১৮ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে পরিচালকদের তিন মেয়াদে টানা নয় বছর দায়িত্বে থাকার সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে এবার আইনের ওই ধারা আবারো সংশোধন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংক পরিচালকদের দাবির আলোকে সংশোধনী আনার অভিযোগ উঠেছে। সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনে বলা হয়েছে, এখন থেকে পরিচালকরা চার মেয়াদে টানা ১২ বছর ব্যাংকের পর্ষদে থাকতে পারবেন। এমনকি এক মেয়াদ বিরতি দিয়ে আবারো পর্ষদে ফিরতে পারবেন ব্যাংক উদ্যোক্তারা।

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৫খ অনুযায়ী, ব্যাংক কোম্পানির নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও এর পরিপালনের জন্য পরিচালনা পর্ষদ দায়বদ্ধ থাকবে।

যেহেতু নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের অনেক বেশি ক্ষমতা রয়েছে সে হিসেবে দীর্ঘদিন পরিচালক পদে থাকার এ রকম সুযোগকে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ বলে জাতীয় সংসদেও সমালোচনা হয়েছে। কেননা বর্তমানে ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাবের জন্য পরিচালকদের দায়ী করা হয়। এক্ষেত্রে তাদের সুবিধার জন্যই আইনে সংশোধনী আনা হয়েছে—এমনটি বলা হচ্ছে। আবার এক মেয়াদ বিরতির পর পর্ষদে ফেরার সুযোগ বস্তুত আজীবন মেয়াদের নামান্তর এমন সম্ভাবনাও থেকে যায়।

বর্তমান সংকটকালে ব্যাংক পরিচালকদের নিয়ন্ত্রণহীন হস্তক্ষেপ এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান বাধা। এ পরিস্থিতিতে পরিচালকদের পর্ষদে থাকার মেয়াদ বাড়ানোর পর তা নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের দৌরাত্ম্য কমাতে হলে পরিচালকদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে জোর দেয়া প্রয়োজন। সেটি না করে উল্টো পর্ষদে থাকার মেয়াদ ‍বাড়ানো হলে পরিচালকরা যে ব্যাংকের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবেন তা সহজেই অনুমেয়। এতে দেশের ব্যাংক খাতে নতুন করে সংকট দেখা দেবে, এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। 

পরিচালকরা ব্যাংক পর্ষদে দীর্ঘমেয়াদে থাকলে অনিয়মের আশঙ্কা থাকে। এজন্য ২০১৮ সালের আগে দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় না থাকার আইন ছিল। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, ‘ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন বিল)-২০২৩’ সংসদে উত্থাপন করার সময় ও স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে পরিচালকদের পর্ষদে থাকার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি ছিল না। পরবর্তী সময়ে যখন পাস করার জন্য সংশোধনী প্রস্তাব দেয়া হয়, এক্ষেত্রে যে পন্থা গ্রহণ করা হয়েছে সেটি প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়। অর্থাৎ বিলের শুরুতেই কেন বিষয়টি উত্থাপন করা হলো না, সেটি নিয়ে যে বিরোধিতা করা হয়েছে তা অমূলক নয়। আবার আলোচ্য বিলের সংশোধনীতে খেলাপিদের নতুন করে ঋণ পাওয়ার বিষয়ে বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। আর এ দুটো বিষয়ই ব্যাংক খাতে সুশাসনের জন্য একে অন্যের পরিপূরক। যে কারণে আশঙ্কা বাড়ছে। 

একটি দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য ব্যাংক খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এজন্য এ খাত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি খুব জরুরি। চলতি বছরেই বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের দুটো ব্যাংক সিলিকন ভ্যালি (এসভিবি) ও নিউইয়র্কভিত্তিক সিগনেচার ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ব্যাংকগুলোর পরিচালকদের বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনা থেকে আমাদের দেশের ব্যাংক খাতের শিক্ষা নেয়ার মতো যথেষ্ট বিষয় রয়েছে। এমনিতেই দেশে ব্যাংকের সংখ্যা প্রচুর। অর্থনীতিবিদরা জোর দিয়ে বলেছেন, ব্যাংকের সংখ্যা কম হলে সেগুলো ভালোভাবে পরিচালনা করা যেত। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা ৬১। এর মধ্যে ৪৩টি ব্যাংক বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া নতুন নতুন বেসরকারি ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন জমা পড়েছে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে অব্যবস্থাপনার মধ্যেও ব্যাংক খাতে একশ্রেণীর ব্যবসায়ীর বিনিয়োগের আগ্রহে প্রশ্নের অবকাশ থেকে যায়। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময় আর্থিক অনিয়মের অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছে যে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকদের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাই অধিকাংশ অনিয়মের নেপথ্য কারণ। যে কারণে পরিচালকদের নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যাংক খাতে একাধিক আইন রয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৩২ বছরে সাতবার ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন হয়েছে। এমনকি সর্বশেষ ২০১৮ সালেও ব্যাংক মালিকদের চাপে এক পরিবার থেকে চারজন এবং ছয় বছরের বদলে টানা নয় বছর ব্যাংকের পরিচালক থাকার সুযোগ দিয়ে আইন সংশোধন করা হয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে ব্যাংকের মালিকানা যাদের কাছে রয়েছে, তাদের অনুকূলে আইন সংশোধন হচ্ছে। আমাদের দেশে ব্যাংক খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি অন্তরায় কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আমরা প্রত্যাশা করব, দেশের ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতার স্বার্থে সরকার আমানতকারীদের সঞ্চিত অর্থের নিরাপত্তা প্রদানে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। এজন্য ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধন যেন দেশের বিনিয়োগ খাতকে সচল রাখে, সেদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করে ব্যাংক খাতকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেয়া হবে, সেটিই কাম্য।