ভৈরবে এগারসিন্দুর ট্রেনের সঙ্গে মালবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে এক বিষাদসিন্ধু রচিত হলো সোমবার। রেললাইনের পাত ঘেঁষে পড়ে ছিল দুর্ঘটনায় নিহত কারো বিচ্ছিন্ন আঙুল, কারো আঙুলের নখে ফিকে হওয়া মেহেদির রং। শুধু ছিন্নভিন্ন অঙ্গই নয়, পড়ে থাকা বিয়ের মুকুট, কনের বেনারসির লাল টুকটুকে ওড়না, টিটির মাথার টুপি আর এখানে-সেখানে পড়ে থাকা নানা ধরনের জুতার উপস্থিতি জানাচ্ছে সাবেক জীবনের কথা। দুর্ঘটনার পর থেকেই সারা দেশের মানুষের মুখে মুখে ছিল এ ট্র্যাজেডির বয়ান। আহত যারা তাদের মনে আরেক শঙ্কা। মানুষগুলো চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ জীবনে ফিরতে পারবে তো? এ ধরনের আহতদের চিকিৎসা করাতে অনেক টাকা খরচ হয়,৷ সেটা তারা জোগাড় করতে পারবে তো! কয়েকদিন পর হয়তো দুর্ঘটনার কথা মানুষ ভুলে যাবে, নতুন কোনো দুর্ঘটনা এসে জায়গা নেবে তার। আহতদের অনেকেই হয়তো বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন, আবার কেউ চিকিৎসা করে বাঁচলেও সারাটা জীবন পঙ্গুত্ব নিয়ে কাটাবেন। 

বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভৈরব জংশনের কাছাকাছি গাইনাহাটি এলাকায় গত সোমবার বেলা সোয়া ৩টার দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি র‍্যাব, বিজিবি সদস্যরাও উদ্ধারকাজে অংশ নেন। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে ঢাকার দিকে আসছিল। অন্যদিকে ঢাকা থেকে কনটেইনার নিয়ে মালবাহী একটি ট্রেন যাচ্ছিল চট্টগ্রামের দিকে। পথিমধ্যে বেলা সোয়া ৩টার দিকে ভৈরব স্টেশনের আউটারে (ট্রেন অপেক্ষা করার স্থান। ক্রসিংয়ের সময় যেন মূল লাইন ব্যবহার করে অন্য ট্রেন চলতে পারে) মালবাহী ট্রেনটির অপেক্ষায় থাকার কথা ছিল। কিন্তু না থেমে ট্রেনটি বিপরীত দিক থেকে আসা এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসের পেছনের দুই বগিতে ধাক্কা দিলে হতাহতের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম, সিলেট ও কিশোরগঞ্জের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দুই পাশের বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে বেশ কয়েকটি ট্রেন। দুর্ঘটনার ৭ ঘণ্টা পর ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম ও সিলেটের পথে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। 

কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, ঢাকার লোকোশেডে ইঞ্জিন ঘোরানোর যন্ত্র (টার্ন টেবিল) বহুদিন নষ্ট। এজন্য ইঞ্জিন উল্টো লাগিয়ে চালানো হয় পণ্যবাহী ট্রেন। এতে সিগন্যাল দেখতে চালকের সমস্যা হওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে জানিয়ে টার্ন টেবিল দ্রুত মেরামতের তাগিদ দিয়ে গত রোববার ঢাকার বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলীকে (লোকো) চিঠি দেয়া হয়। এর পরদিন গতকাল সোমবার ভৈরব স্টেশনের আউটারে দুর্ঘটনাটি ঘটল। এতে স্পষ্ট সোমবারের দুর্ঘটনায় শুধু চালকের ভুল নয়, গাফিলতি রয়েছে রেলওয়েরও। তাদের ভুল আর গাফিলতিতে গেল সাধারণ মানুষের প্রাণ। দুর্ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাই প্রাণহানি বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। 

রেল সূত্র জানিয়েছে, ৩০২৮ নম্বরের ইঞ্জিনে পণ্যবাহী ট্রেনটি চালাচ্ছিলেন চালক জাহাঙ্গীর আলম। ২০০৪ সালে চাকরিতে যোগ দেয়ার পর এ চালক ছয় বছর ধরে পণ্যবাহী ট্রেন চালাচ্ছেন। রেলের ইঞ্জিন সামনে-পেছনে দুই দিকে চলতে পারে। উল্টো করে লাগানোর কারণে ইঞ্জিনের পেছন দিক ছিল ট্রেনের সামনে আর চালকের বসার স্থান (ক্যাব) ছিল পণ্যবাহী কনটেইনারের কাছাকাছি। অর্থাৎ চালক সামনে থাকার পরিবর্তে বগির কাছাকাছি বসে ট্রেন চালাচ্ছিলেন। একাধিক চালকের কাছে জানা গেছে, এতে ‘লং হুড’ সমস্যা তৈরি হয়। অর্থাৎ ইঞ্জিনের লম্বা বডি সিগন্যাল ও চালকের মাঝে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। ফলে চালককে সিগন্যাল দেখতে হয় দূর থেকে। তিন হাজার সিরিজের ইঞ্জিনের দৈর্ঘ্য অন্যান্য ইঞ্জিনের তুলনায় বেশি। এ ইঞ্জিনের দৈর্ঘ্য ১৯ হাজার ৬৯ মিলিমিটার বা প্রায় ৬৩ ফুট। চালকের ক্যাব বাদে দৈর্ঘ্য ৫৮ ফুট। ইঞ্জিন উল্টো করে লাগানোর কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫৮ ফুট দূর থেকে সিগন্যাল দেখতে হয় চালককে।

রেল সূত্রের ভাষ্য, ভৈরবের দুর্ঘটনায় উল্টো ইঞ্জিনের একই সমস্যা ছিল। চালকের বরাতে তার সহকর্মীরা জানিয়েছেন, লং হুড সমস্যায় আউটারে থামার সিগন্যাল চালক দেরিতে দেখেন। ব্রেক করতে দেরি হওয়ায় পণ্যবাহী ট্রেনের গতি কমলেও থামেনি। ট্রেনটি ধাক্কা দেয় এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসকে। আবার রেল কর্মকর্তারা বলছেন, চালকেরও ভুল রয়েছে এতে। ভৈরব স্টেশনটি রেললাইন থেকে এমনিতেই নিচু। এজন্য স্টেশনে প্রবেশের আগেই সতর্কতা হিসেবে গতি কমাতে হয়। সিগন্যাল থাকে বাঁ দিকে। ইঞ্জিন উল্টো করে চালালেও চালকের দিকেই থাকে। বড়জোর ৫০ ফুট পরে দেখতে পাবেন। রেললাইনে মানুষের চলাচল দেখতে সমস্যা হলেও সিগন্যাল নজরে না পড়ার কারণ নেই। একটি ভিডিও ক্লিপের সূত্রে জানা গেছে, পণ্যবাহী ট্রেনের বগির ডিস্ট্রিবিউটর ভাল্‌ভ (ডিভি) কাজ করেনি। তাই চালক ইঞ্জিনের ব্রেক কষলেও ডিভি কার্যকর না থাকায় বগির ব্রেক কাজ করেনি। এজন্য ট্রেনটি থামেনি। ৩২টি বগির পাঁচটির ডিভি সচল পাওয়া গেছে দুর্ঘটনার পর। 

দৈনিক সমকালের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত রোববার রেলের চট্টগ্রামের বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) সাজিদ হাসান নির্ঝর স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানানো হয়, ঢাকার লোকোশেডের টার্ন টেবিলটি নষ্ট। তাই লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) টার্ন (ঘোরানো) সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ২৬০০, ২৯০০ ও ৩০০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলো পেছনের দিক সামনে রেখে ট্রেন চালাতে হয়। অনেক স্থানে নিরাপদ দূরত্ব থেকে সিগন্যাল ও লেভেল ক্রসিং দেখা যায় না। টার্ন টেবিলটি দ্রুত মেরামতের তাগিদ দিয়ে চিঠিতে আরো বলা হয়, বিশেষ করে ৩০০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলোর দৈর্ঘ্য বেশি হওয়ায় এ ঝুঁকি আরো বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। যেকোনো সময়ে সিগন্যাল ওভারশুট বা লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, সেখানে রেল দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছে দুর্বল ইঞ্জিন এবং সংস্কারবিহীন নড়বড়ে রেলপথ। যে লোকোমোটিভ ইঞ্জিনগুলো আমদানি করা হয়েছে সেগুলো নিম্নমানের এবং বেশ দুর্বল। বাংলাদেশে রেল ইঞ্জিনের সংখ্যা ছিল ৪৪২টির মতো। বর্তমানে এ সংখ্যা আড়াইশর ঘরে নেমে এসেছে। এই সঙ্গে সেখানে কর্মী কম থাকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

তুলনামূলক ‘নিরাপদ বাহন’ হিসেবে রেল অনেক জনপ্রিয় মাধ্যম হলেও নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং চালক ও সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে রেল দুর্ঘটনা। আগে লাইনচ্যুত হয়ে বা অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যেত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে প্রায়ই দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হচ্ছে। এজন্য রেলওয়ের চালক ও কর্মীদের অবহেলা, ভুল সিগন্যাল বা সিগন্যাল অমান্য করা এবং নানান অনিয়মকেই দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, ভারতসহ অন্যান্য দেশে রেল দুর্ঘটনা হলেও বাংলাদেশে রেল দুর্ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলা যাবে না, বলতে হবে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। কারণ এখানে রেললাইনের অবকাঠামো ঠিক নেই, চালকের খামখেয়ালি আচরণ, ত্রুটিপূর্ণ সিগন্যালের কারণে দুর্ঘটনা হচ্ছে। 

গত ছয় বছরে ১ হাজার ১১৬টি ট্রেন দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৪৫ জন নিহত এবং ১ হাজার ৩০২ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। পরিসংখ্যান বলছে, রেলের এ দুর্ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশই ঘটছে চালক ও স্টেশন মাস্টারদের গাফিলতি এবং লাইনচ্যুতি ও লেভেল ক্রসিংয়ে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ লাইন ও সেতুর কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। 

প্রতিদিন তিনবার করে পুরো রেল লাইন, সিগন্যাল ও সেতু পরিদর্শনের নিয়ম থাকলেও অনেক সময় বছরে একবারও পরিদর্শনে যাওয়া হয় না। দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ, লাইনচ্যুত ও লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ছাড়াও অবহেলায় ট্রেনে কাটা পড়ে শত শত লোকের মৃত্যু হচ্ছে প্রতি বছর। সর্বশেষ সোমবার বিকালে ভৈরবে যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে মালবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনাটি তদন্তের জন্য দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি কমিটিকে তিনদিনের মধ্যে এবং আরেকটি কমিটিকে পাঁচদিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বড় ও মাঝারি দুর্ঘটনায় দুটি করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কমিটির কোনো রিপোর্টই বাস্তবায়ন হয় না। শুধু তদন্ত কমিটি গঠন ও সাময়িক বরখাস্তেই শেষ হয় দুর্ঘটনার অধ্যায়। লোকবলস্বল্পতার কারণে বরখাস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কিছুদিন পরই পুনর্বহাল করতে হয়। ভৈরব দুর্ঘটনা যেন পুরনো কর্মসূচির পুনরাবৃত্তিতে শেষ না হয়। লাভজনক ও জনপ্রিয় এ যোগাযোগ মাধ্যমকে আরো নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। যেসব ব্যক্তির গাফিলতির কারণে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটল তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। ফিটনেসবিহীন ইঞ্জিন নিয়ে যাতায়াত অসংখ্য মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে। রেলপথ সংস্কারের পাশাপাশি ক্রসিংগুলোর নিরাপত্তা ও সংকেত ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করতে হবে।