বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হুন্ডি ব্যবসার দৌরাত্ম্য। বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদের অভিমত, হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচারের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আজ সংকটে পড়েছে। অনেকে হুন্ডি ও অর্থ পাচারকে অর্থনীতির জন্য কর্কট রোগ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
স্বয়ং অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল কিছুদিন আগে বলেছিলেন, প্রায় অর্ধেক রেমিট্যান্স এখন হুন্ডি পদ্ধতিতে দেশে আসছে। বিশ্বব্যাংকের পুরনো তথ্যানুসারেও দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃদেশীয় পর্যায়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনের পরিমাণ প্রাতিষ্ঠানিকের অর্ধেক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্যানুসারে, প্রবাসীরা বিদেশ থেকে দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান তার ৪০ শতাংশ আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে। ৩০ শতাংশ আসে সরাসরি প্রবাসী বা তাদের আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে নগদ আকারে এবং বাকি ৩০ শতাংশ আসে হুন্ডির মাধ্যমে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুন্ডির এ দৌরাত্ম্যের জন্য বিভিন্ন সময়ে আর্থিক ও মুদ্রাবাজারে বিনিময় হার ও সুদের হার নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর গৃহীত নানা পদক্ষেপকেই দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, আর্থিক ও মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণের অদূরদর্শী প্রয়াস দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণের দিক থেকে প্রায় সময় বুমেরাং হয়েছে।
ডলারের বিপরীতে নিজস্ব মুদ্রার অবস্থান কৃত্রিমভাবে স্থিতিশীল রাখতে গিয়ে বিপত্তিতে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। বাংলাদেশে গত এক দশক ডলারের বিপরীতে টাকার শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে তৎপর ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর প্রতি ডলারের বিনিময় হার ৭৯ টাকা ১০ পয়সা বেঁধে রেখেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২০-২১ অর্থবছর শেষেও প্রতি ডলারের বিনিময় হার ৮৪ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকটের কারণে টাকার অবস্থানের ব্যাপারে নমনীয় হয় ব্যাংক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় তদারকি প্রতিষ্ঠানটি। এরপর গত দেড় বছরের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার প্রায় ২৭ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। প্রকৃত বিনিময় হার ও বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত বিনিময় হারের এ পার্থক্যের কারণে প্রবাসীরা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠালে ডলারপ্রতি ৫-৭ টাকা বেশি দাম পাচ্ছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান এ রকম কৃত্রিমভাবে স্থিতিশীল রাখার কারণে প্রবাসীরা হুন্ডির মাধ্যমের টাকা প্রেরণে আগ্রহী হন উত্তরোত্তর। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদও এমন কথাই বলেছেন। তাই এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য মুদ্রাবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ডলারের বিপরীতে টাকার মান নির্ধারণ করা উচিত। বণিক বার্তাকে এ অর্থনীতিবিদ বলেছেন, ‘সরকারের দায়িত্ব ছিল ভোগ্যপণ্যের বাজারে তেল-চিনি কিংবা পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণ করা। সরকার সেটি না করে বিনিময় হার ও সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করতে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেকটা গায়ের জোরে টাকার শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছিল। এ কারণে দেশের রফতানি খাত ও রেমিট্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপরীতে চাঙ্গা হয়েছে হুন্ডিসহ অননুমোদিত লেনদেন।’ তিনি বলেছেন, ‘সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোঝার দরকার ছিল, বিনিময় হার ও সুদের হার নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়। রিজার্ভের অস্বাভাবিক ক্ষয় ও বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির ফল।’
মূলধনপ্রবাহে কঠোর বিধিনিষেধও অপ্রাতিষ্ঠানিক বৈদেশিক লেনদেনকে উৎসাহিত করে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ট্রেড কস্ট ডাটাবেজের হিসাব অনুযায়ী, আন্তঃদেশীয় লেনদেনে অশুল্ক বাধার (নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার) প্রভাব কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুল্কবাঁধার (ট্যারিফ ব্যারিয়ার) ২১৪ শতাংশও হতে পারে।
বণিক বার্তার সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সিংহভাগ রেমিট্যান্স প্রেরকরা হুন্ডি পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ ২১ বিলিয়ন ডলার যদি ফরমাল চ্যানেলে দেশে রেমিট্যান্স আসে, তাহলে কমপক্ষে আরো ২১-২২ বিলিয়ন ডলার বা তার চেয়েও বেশি রেমিট্যান্স (টাকার আকারে) হুন্ডি পদ্ধতিতে দেশের অর্থনীতিতে ঢুকছে।’ ড. মইনুল ইসলাম হুন্ডি পদ্ধতিতে পুঁজি পাচার দমনে ব্যাংক খাতে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি প্রয়োজনে ‘খেলাপি ঋণ ট্রাইব্যুনাল’ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছেন।
আমরা মনে করি, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টিও জরুরি। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে সুশাসন ও স্বচ্ছতা বজায় থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে বিনিময় হারের পার্থক্যের অবসান হবে এবং ন্যায্য বিনিময় হার নিশ্চিত করলে প্রবাসীরা অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ প্রেরণে উৎসাহী হবেন না।
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অর্থের আন্তঃদেশীয় স্থানান্তর প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও দ্রুতকরণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অর্থ প্রেরণে প্রণোদনার সঙ্গে অর্থ প্রেরণ প্রক্রিয়ার ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে বিনিময় সংঘটনের স্থানগুলোয় অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আমরা প্রায় খবরে দেখি, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রবাসী শ্রমিকরা ও তাদের স্বজনরা হেনস্তার শিকার হন। যার কারণে তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অর্থ প্রেরণে নিরুৎসাহিত হতেও পারেন।
একই সঙ্গে হুন্ডি ব্যবসা বা পুঁজি পাচারের প্রধান গন্তব্যগুলোয় তদন্ত টিম প্রেরণ কিংবা গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ করে হুন্ডি ব্যবসায় জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একইভাবে দেশের অভ্যন্তরে কালো টাকার দৌরাত্ম্য প্রতিরোধে সরকারের তদারকি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে সদাজাগ্রত থাকতে হবে। কারণ দেশের অভ্যন্তরে কালো টাকা পুঞ্জীভূত হলে কালো টাকার মালিকরা সে টাকা পাচারের জন্য হুন্ডি ব্যবসায়ীদের শরণাপন্ন হয়।
কাজেই মুদ্রা ও অর্থবাজারে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে হুন্ডি ব্যবসা তথা অর্থ পাচার প্রতিরোধ করা হবে বলে আমরা আশা করি।










