একটি দেশের জনসাধারণের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নতিতে শৃঙ্খলাপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিপরীতে সড়ক যত বেশি বিশৃঙ্খল হয়, সেটি তত বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে ওঠে। সড়কে বিশৃঙ্খলায় একদিকে মানুষের ভোগান্তি বাড়ে, অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আবার এমন ভঙ্গুর সড়ক ব্যবস্থা ব্যবসায়ের গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। এতে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয় সে দেশ। এদিকে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুসংখ্যা ক্রমে বেড়েই চলেছে। ২০১৮ সালে তরুণ শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ প্রণয়ন করা হলেও এর কোনো ফলপ্রসূ ও কার্যকর প্রয়োগ নেই। এ আইনে অপরাধের দণ্ডের মাত্রা বাড়ানোসহ বেশকিছু কঠোরতা আরোপ করা হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, এ আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে, দুর্ঘটনা ও মৃত্যু কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং সড়কে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ সড়কে দুই ও তিন চাকার যানবাহনকে প্রাধান্য দেয়া।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, সারা দেশে গত সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬১ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১০৫ জনই প্রাণ হারিয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। তাছাড়া গত মাসে সংঘটিত ৫৮৩টি দুর্ঘটনার ১৩২টিই হয়েছে মোটরসাইকেলে। অর্থাৎ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানিতে দুই চাকার বাহনটি শীর্ষে রয়েছে। এমনকি একক যানবাহন হিসেবে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির জন্য দায়ী মোটরসাইকেল। আবার শুধু দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি নয়, সড়কে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলার পেছনেও এ যান মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।
আবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যানুসারে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৫৯৮ জন মারা গেছে। তাদের মধ্যে ৩৪ শতাংশের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। এছাড়া আহত হয়েছে ৯ হাজার ৬০ জন। গত বছর ৬ হাজার ৯১১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে কমপক্ষে ৬ হাজার ৫২৪ জন এবং ১১ হাজার ৪০৭ জন আহত হয়েছে। সে বছর ২ হাজার ৫৩২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪৮৭ জন নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ৩৮ দশমিক ১২ শতাংশ। পরিসংখ্যানগুলো দেশের সড়ক ব্যবস্থার বেশ উদ্বেগজনক পরিস্থিতি প্রকাশ করছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের কারণে হতাহতের সংখ্যা খুবই হতাশা উদ্রেককারী। সরকারের এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে অকালমৃত্যু কিংবা আর্থসামাজিক ক্ষতি কোনোটাই কাম্য নয়। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে মোটরসাইকেলসহ অন্য যানবাহন নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। সড়ক পরিবহন আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশ, যারা সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার নজির রেখেছে, তাদের মডেলও এক্ষেত্রে অনুসরণীয় হতে পারে।
উন্নত দেশে গণপরিবহনকে প্রাধান্য দেয়া হয়। গ্রাহক সন্তুষ্টির দিক থেকে সিঙ্গাপুরের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে প্রথম সারিতে। এশিয়ার মধ্যে চীন, জাপান, দুবাই, ইউরোপের সুইডেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি প্রভৃতি দেশের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে আদর্শ। প্রতিটি দেশের প্রশাসন সংশ্লিষ্ট আইন বাস্তবায়নে খুবই কঠোর। যেখানে বাংলাদেশে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।
দেশের সড়কে দুই ও তিন চাকার গাড়ির সংখ্যা বাড়ছেই। রাস্তায় হরেক রকম যান, সেগুলোর বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধে চলাচল, চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়া মনোভাব, অন্যদিকে যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, রাস্তা পারাপারের সময় ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার না করা—সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশের সড়ক ব্যবস্থা ভঙ্গুরপ্রায়। আবার একদিকে নেই আইনের বাস্তবায়ন, অন্যদিকে সড়কে ঘুস প্রদান ও গ্রহণের প্রবণতা রয়েছে অধিকাংশের। সড়ক পরিবহন আইন কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ। প্রভাবশালী ও সবলদের ওপর আইন প্রয়োগ না করে কেবল দুর্বলের ওপর আইন প্রয়োগ করা হয়। উপরন্তু যোগ হয়েছে দু-তিন চাকার ছোট যানবাহনের আধিক্য। তীব্র যানজট-দুর্ঘটনা প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদিও দেশের সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামো মোটরসাইকেলের মতো বাহনের জন্য খুব একটা উপযোগী নয়। মানহীন সড়ক-মহাসড়কগুলোয় ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় বিশৃঙ্খলাই যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, মিশ্র যানবাহন ও পথচারীর আধিক্য রয়েছে এমন পরিবেশের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে চার চাকার যানবাহন কিছুটা হলেও সামাল দিতে পারে। কিন্তু দুই চাকার মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে এ চাপ সামলানো কঠিন। এরই মধ্যে আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালে ৩৫০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিন সক্ষমতার মোটরসাইকেল চলাচলের অনুমোদন দেয়া ছিল একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত মোটরযান রয়েছে ৬১ লাখ ৭৫ হাজার। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৫ লাখের বেশি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১ লাখ ৮৯ হাজারের বেশি এ দ্বিচক্রযানটির নিবন্ধন দিয়েছে বিআরটিএ, যা একই সময়ে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের ৮৫ শতাংশ।
মোটরসাইকেলের সংখ্যা যত বেশি হবে, বাহনটির কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যাও তত বাড়বে—এমন মতও রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। সেজন্য বিভিন্ন দেশে দুর্ঘটনা কমাতে মোটরসাইকেলের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। সরকারের শিগগিরই এ বাহনের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা প্রয়োজন। নয়তো আগামীতে সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিল আরো বেড়ে যাবে। মোটরসাইকেল ব্যবহারে মানুষকে নিরুৎসাহী করা দরকার। যদিও দুঃখজনকভাবে, যেখানে সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, সেখানে গত সোমবার ৩৫০ সিসি ইঞ্জিন ক্ষমতার রয়েল এনফিল্ড মোটরসাইকেল বাজারজাত করা হয়েছে। অথচ সড়কের বাস্তবতায় ভালো বিকল্প হিসেবে গণপরিবহনের মান উন্নত করা অত্যন্ত জরুরি হয়েছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক, বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো—এগুলো প্রতিহত করতে হবে। আবার দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রয়োজনীয় রোড সাইন (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন ও জেব্রা ক্রসিং অঙ্কন করার পাশাপাশি পথচারীদের তা মানতে বাধ্য করতে হেবে। গাড়িচালকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা আবশ্যক।
তবে রাস্তা পারাপার ও গাড়ি চালানোবিষয়ক প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের শিক্ষা প্রাথমিক স্তর থেকেই পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকারের মধ্যে তরুণদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি, তাই অভিভাবকদের আরো সতর্ক হতে হবে সন্তানের হাতে এ যান তুলে দেয়ার বিষয়ে। পাশাপাশি ঘুসের মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স সংগ্রহ করা বন্ধ করতে হবে।
বিশ্বে সড়ক নিরাপত্তায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা কয়েকটি উন্নত দেশের মধ্যে রয়েছে নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও জাপান। উন্নয়নশীল দেশ থাইল্যান্ড, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাইওয়ানসহ অনেক দেশ সড়ক নিরাপত্তায় যথেষ্ট উন্নতি করেছে। দেশগুলোয় উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ, চালক-যাত্রী নির্বিশেষে ট্রাফিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়েছে। আমাদেরও দেশের সড়ককে নিরাপদ করতে সে পথেই এগোতে হবে।










