পাট (Corchorus sp.) বাংলাদেশের দ্বিতীয় অর্থকরী ফসল। বিশ্বে পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় এবং পাট রফতানিতে প্রথম। ২০২২-২৩ সালে বাংলাদেশে ৭ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে ১৪ লাখ ৯৪ হাজার টন পাট উৎপাদন হয়েছে। পাটের এ উৎপাদন বিভিন্ন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যেসব কারণে পাটের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো কীটপতঙ্গের আক্রমণ। বাংলাদেশে প্রায় ৪০ প্রজাতির পোকামাকড় পাট ফসলের ক্ষতি করে থাকে বলে বিবেচিত। হলুদ মাকড় তাদের মধ্যে অতিপরিচিত এবং খুবই ক্ষতিকর একটি বালাই।
পূর্ণাঙ্গ মাকড় আকারে খুবই ক্ষুদ্র (শূন্য দশমিক ১৭ মিমি লম্বা ও শূন্য দশমিক শূন্য ৯ মিমি চওড়া) এবং অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া খালি চোখে দেখা যায় না। পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী মাকড় কচি পাতার উল্টো দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে একটা একটা করে ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার ৩১ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়, এদেরকে লার্ভা বলে। লার্ভা ঘোলাটে সাদা রঙের। এরা লার্ভা অবস্থায় ১৩ থেকে ১৫ ঘণ্টা থাকে। ক্রমে আকারে বড় হয় এবং খোলস বদলিয়ে পিউপা হয়। ২ থেকে ১৭ ঘণ্টা পর এরা পূর্ণবয়স্ক মাকড়ে পরিণত হয়। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ মাকড় ৫ থেকে ৯ দিন এবং স্ত্রী মাকড় ৮ থেকে ১৩ দিন বাঁচে। সাধারণত স্ত্রী মাকড় দিনে আটটি ডিম পাড়ে এবং তাদের জীবদ্দশায় ২৪ থেকে ৭৪টি ডিম দেয় এবং সমগ্র পাট মৌসুমে এরা প্রায় ২৯ বার প্রজনন করে।
হলুদ মাকড় পাট গাছে আগার কচি পাতা আক্রমণ করে পাতার রস চুষে খায়। এতে কচি পাতা কুঁকড়ে যায় এবং তামাটে রঙ ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত সব আক্রান্ত পাতা পড়ে যায়, এমনকি গাছের ডগা মারাও যায়। এতে শাখা-প্রশাখা বের হয়ে গাছের বৃদ্ধি কমিয়ে দেয়। হলুদ মাকড়ের আক্রমণে গাছের বৃদ্ধি ১৫-৬০ সেমি কমে যেতে পারে। এ মাকড়ের আক্রমণের ফলে মাঠপর্যায়ে পাটের ফলন প্রায় ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। হলুদ মাকড় ফুলের কুঁড়ি ও কচি ফলকেও আক্রমণ করে। আক্রান্ত কুঁড়ি ঠিকমতো ফুটতে পারে না। ফুলের পাপড়ির রঙ হলদে থেকে কালচে রঙ হয়ে যায় এবং পরে ঝরে পড়ে। এতে বীজের ফলন কমে যায়। একটানা খরা/অনাবৃষ্টির সময় হলুদ মাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যায়। হলুদ মাকড়ের আক্রমণের তীব্রতার কারণে পাটের ফলন কম হয়।
এ মাকড় বিভিন্নভাবে দমন করা যায়। পরিবেশে অনেক উপকারী পোকা আছে যারা এ হলুদ মাকড়ের উপদ্রব কমাতে পারে। যেসব উপকারি পোকা প্রাকৃতিকভাবে মাকড় দমন করে তাদের মধ্যে Minute Pirate bug (Orius inssidiosus), Mirid bug (Cyrtorhinus lividipennis) Predatory mite (Amblysieus sp.), Lady bird beetle (Stethorus sp.) Thrips (Scolothrips indicus), Tarnished bug (Adelphocoris sp.), Red bug (Boisea trivittata) এ ছয় শিকারি পোকার নাম উল্লেখযোগ্য। এরা হলুদ মাকড় খেয়ে তাদের সংখ্যা কমিয়ে দেয়।
রাসায়নিক মাকড়নাশক যেমন এবামেকটিন ১.৮ইসি, সালফার ৮০ডব্লিউপি দিয়ে হলুদ মাকড় দমন করা যায়, কিন্তু রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে উপকারি পোকাগুলোও মারা যায়। ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অন্যদিকে প্রাকৃতিক বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ নির্যাস দিয়ে হলুদ মাকড় দমন করা যায়। উদ্ভিজ্জ নির্যাসের মধ্যে নিম পাতা এবং বীজের নির্যাস ব্যবহার করে প্রায় ৭২ শতাংশ পাটের হলুদ মাকড় দমন করা সম্ভব। এর ফলে একদিকে হলুদ মাকড় দমন হয়, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর তেমনি কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে না। নিম পাতা এবং বীজের নির্যাস দিয়ে পাটের হলুদ মাকড় দমনের প্রযুক্তি বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিবেশবান্ধব দুটি প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তিগুলোর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—১. এটা কৃষকের জন্য সহজলভ্য, ২. ব্যবহার পদ্ধতি খুবই সহজ, ৩. পরিবেশ বান্ধব এবং ৪. অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক।
নিম পাতা ও বীজের নির্যাস প্রস্তুত প্রণালি:
গাছ থেকে
কাঁচা নিম পাতা সংগ্রহ করে হামান দিস্তা/শীল পাটা/ গ্রাইন্ডারের সাহায্যে পেস্ট তৈরি করতে হবে। তারপর নিম পাতার পেস্ট
পানিতে ১:২০ অনুপাতে মিশিয়ে নির্যাস তৈরি করতে হবে। তারপর নির্যাসটি ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নিয়ে মাকড় আক্রান্ত পাটক্ষেতে কচি
পাতার উল্টো দিকে ছিটাতে হবে। অন্যদিকে
নিম বীজের নির্যাস তৈরি করার জন্য নিম ফল সংগ্রহ করে ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে যাতে
সহজে বীজের খোসা দূরীভূত
হয়। বীজের খোসা দূরীভূত
হওয়ার পর বীজের কার্নেল বাতাসে ভালোভাবে
শুকিয়ে নিয়ে হামান দিস্তা/শীল পাটা/গ্রাইন্ডারের সাহায্যে পাউডার তৈরি করতে হবে। তারপর বীজের কার্নেল
পাউডার পানিতে ১:২০ অনুপাতে (৫০ গ্রাম পাউডার এক লিটার পানিতে) সারা রাত ভিজিয়ে রাখলে নিম বীজের
নির্যাস তৈরি হবে। তারপর নির্যাসটি ছাঁকনি
দিয়ে ছেঁকে আক্রান্ত
পাট পাতায় প্রয়োগ করতে হবে।
নিমের নির্যাসের কার্যকরী উপাদান হলো—১. অ্যাজাডিরেকটিন, ২. স্যালানিন, ৩. ম্যালিয়েন্ট্রেয়াল, ৪. নিম্বিন, ৫. নিম্বিডিন। এদের মধ্যে অ্যাজাডিরেকটিনের কার্যকারিতাই বেশি।
প্রযুক্তির উপযোগিতা:
১. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত
একুশ শতকের এবং বর্তমান বিশ্বেও
সবচেয়ে গুণধর
আলোচিত ভেষজ বৃক্ষ হলো নিম।
বাংলাদেশের প্রায় সব
অঞ্চলে সহজেই পাওয়া যায় এবং বিষাক্ত গুণাবলির জন্য রাসায়নিক মাকড়নাশক ব্যবহার
না করে নিম পাতা বা বীজের নির্যাস দিয়ে
হলুদ মাকড় সহজেই দমন করা যায়।
২. হলুদ মাকড় আক্রান্ত গাছের ডগার
কচি পাতার উল্টো দিকে নিম পাতা বা বীজের নির্যাস
সরাসরি স্প্রে করলে খুব ভালো
ফল পাওয়া যায়।
৩. পাট চাষ উপযোগী বাংলাদেশের অঞ্চলগুলোয় এ প্রযুক্তি খুবই কার্যকরী।
৪.
এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে পরিবেশের এবং উপকারী পোকার ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে না ।
৫) এ প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে কৃষকের কোনো ঝুঁকি নেই।
প্রযুক্তির আর্থিক সুবিধা এবং জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা:
|
১। নিম পাতা বা বীজ সংগ্রহ
ও নির্যাস তৈরির খরচ: |
পাতা বা বীজ সংগ্রহ ও নির্যাস
তৈরি বাবদ খরচ (১ জন শ্রমিক) = |
৬০০/- |
|
প্রথমবার স্প্রে (দুজন শ্রমিক) = |
১২০০/- |
|
|
দ্বিতীয়বার স্প্রে (দুজন শ্রমিক) = |
১২০০/-
|
|
|
মোট = |
৩০০০/- |
২. এ প্রযুক্তিগুলো ব্যবহারের ফলে
প্রতি হেক্টরে আট মণ ফলন বেশি পাওয়া যায় যার বর্তমান মূল্য ৩০০০ × ৮ = ২৪০০০/-
প্রতি
হেক্টরে লাভ (২৪০০০ -৩০০০) = ২১০০০/-
৩.
কৃষকের মাঠে হলুদ মাকড় আক্রান্ত গাছের ডগার কচিপাতার উল্টোদিকে নিম পাতা অথবা নিম বীজের নির্যাস
সরাসরি স্প্রে করে প্রায় ৭২ শতাংশ
হলুদ মাকড় দমন সম্ভব এবং প্রায় ১২-২০ শতাংশ পাটের আঁশের ফলন বৃদ্ধি পায়।
ড.
মোহাম্মদ শাহীন পলান: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কীটতত্ত্ব শাখা, পেস্ট ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট










