চিকিৎসাসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। অন্যান্য খাতের মতো চিকিৎসা খাতেও বিদেশ থেকে জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানি করতে হয়। এর ব্যত্যয় হলে চিকিৎসাসেবায় ঘাটতি দেখা দেয়। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের কারণে এ খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যার ফলে চিকিৎসাসেবার জন্য হাসপাতালে আসা রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের জন্য বিদেশ থেকে আমদানির ওপর দেশের হাসপাতালগুলোকে নির্ভর করতে হয়। বিশেষ করে হৃদরোগ, অর্থোপেডিক, চক্ষু, ক্যান্সার, জেনারেল সার্জারি, স্নায়বিক রোগের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের প্রায় শতভাগ সরঞ্জামই আমদানি করতে হয়। বর্তমানে এগুলো আনায় বিদ্যমান ডলার সংকট ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। সরঞ্জামের অভাবে দেশের হাসপাতালগুলোয় এখন বড় অস্ত্রোপচারের সংখ্যাও কমার পথে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ রকম চিত্র খুবই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে হৃদরোগের সার্জারি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া অর্থোপেডিকসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায়ও ব্যাঘাত ঘটছে। ডলার সংকটের কারণে চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির জন্য ব্যাংকে এলসি (ঋণপত্র) খোলা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। আমদানি কমে যাওয়ায় সরবরাহ এখন চাহিদার অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বস্তুত দেশের চিকিৎসা খাতে এ রকম দুর্দশার চিত্র প্রত্যাশিত নয়। এমনটি অব্যাহত থাকলে সামনে ভয়াবহ সংকট তৈরির শঙ্কা রয়েছে। কেননা অসংক্রামক রোগের চিকিৎসার জন্য অতিজরুরি সরঞ্জাম আমদানি ব্যাহত হওয়ায় চিকিৎসায় ব্যাঘাতের পাশাপাশি রোগীদের মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে। বাংলাদেশ মেডিকেল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যান্ড হসপিটাল ইকুইপমেন্ট ডিলার অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র মতে, দেশে বছরে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মেডিকেল ডিভাইসের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। হৃদরোগের চিকিৎসার পাশাপাশি নিউরো সার্জারি, কিডনি সার্জারি, অর্থোপেডিক সার্জারির মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল সার্জারির সরঞ্জামও নিয়মিতভাবে বিদেশ থেকে আনতে হয়। এছাড়া রোগ নিরীক্ষা ও জীবাণুনাশের যন্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ প্রধানত আমদানিনির্ভর। যে কারণে চিকিৎসা খাত আমদানির প্রেক্ষিতে আলাদা গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
দেশে অসংক্রামক রোগে মৃতদের মধ্যে হৃদরোগীদের হার সর্বোচ্চসংখ্যক। বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোয় হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সরঞ্জামের শতভাগই আমদানি করতে হয়। এসব ডিভাইস ও সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে হৃদযন্ত্রের রিং, ভালভ, পেস মেকার, অক্সিজেনেটর। বাংলাদেশে প্রতিদিন কতসংখ্যক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হৃদযন্ত্রে এসব সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ মেডিকেল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যান্ড হসপিটাল ইকুইপমেন্ট ডিলার অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে চারটি প্রতিষ্ঠান হৃদরোগের চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানি করে। প্রতি বছর সারা দেশে প্রায় তিন হাজার পেস মেকার, চার থেকে ছয় হাজার অক্সিজেনেটর, ৩৫ হাজারের বেশি রিং ও প্রায় দেড় হাজার ভালভের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এ চাহিদার অর্ধেকও পূরণ করতে পারছে না।
চিকিৎসা খাতে এমন মাৎস্যন্যায় পরিস্থিতি কাম্য নয়। কিন্তু আমদানি কমায় এসব সরঞ্জামের সরবরাহও এখন সীমিত হয়ে পড়েছে। আমদানিকারকদের ভাষ্য, যে সরঞ্জামগুলো আমদানি হচ্ছে ডলারের বিনিময় হারে অস্থিতিশীলতার কারণে সেগুলোর মূল্য পরিশোধের সময় বিপাকে পড়তে হচ্ছে। ক্রয়াদেশ দেয়ার পর ডলারের যে দর থাকে, পরিশোধের সময় তা আরো বেড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছু সরঞ্জামের মূল্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে নির্ধারিত। ফলে দেশে আনার পর ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধিজনিত ক্ষতি সমন্বয়ের সুযোগও থাকছে না।
এভাবে আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা চিকিৎসা খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। হৃদরোগের পাশাপাশি ক্যান্সার, দীর্ঘমেয়াদি শ্বসনতন্ত্রের রোগ ও ডায়াবেটিসের মতো রোগের চিকিৎসায়ও দেশের হাসপাতালগুলো প্রয়োজনমতো সরঞ্জাম আনতে পারছে না। পাশাপাশি আহত ব্যক্তিদের অর্থোপেডিক অস্ত্রোপচারে ইমপ্লান্টের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক সরঞ্জামের সংকটও এখন প্রকট হয়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় বছরে অন্তত সাড়ে তিন লাখ বড় ধরনের অস্ত্রোপচার হয়। আর মাঝারি পর্যায়ের অস্ত্রোপচার হয় প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ। তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অস্ত্রোপচারের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান না হলে আগামীর দিনগুলোয় পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টরা, যা সচেতনভাবেই কারো কাম্য নয়। এজন্য বিদ্যমান সংকটের মধ্যেও গুরুত্ব বিবেচনায় চিকিৎসা খাতের জন্য প্রয়োজনীয় ডলার বরাদ্দ দেয়া উচিত। আমরা প্রত্যাশা করব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।










