শিক্ষাক্রম বর্তমানে বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত আলোচিত বিষয়। রাষ্ট্রের মাধ্যমিক পর্যায়ের নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে মাঠ পর্যায়ে তো বটেই পত্র-পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তুমুল তর্ক-বিতর্ক। এ বিতর্ক এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এরই মধ্যে এর দুটো পক্ষ তৈরি হয়ে গেছে। এক পক্ষ মনে করছে, সরকার এ শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। অন্যপক্ষ মনে করছে, এটি একটি বৈপ্লবিক শিক্ষাক্রম। এর মাধ্যমে দেশের শিক্ষাচিত্র বদলে যাবে। কিন্তু এক পক্ষ আরেক পক্ষের কথা মানতে চাচ্ছে না। মাঝখানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক আছেন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ভেতর। এ বিতর্ক ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে এরই মধ্যে দুই বছর অতিক্রম হতে চলেছে।
শিক্ষাক্রম শব্দটি এই প্রথমবারের মতো জনপর্যায়ে ব্যাপক আকারে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ পর্যায়ে শিক্ষাক্রম কী? কীভাবে তৈরি হয়? কীভাবে বাস্তবায়ন হয়? তা কী পর্যায়ে প্রভাব ফেলে? এ নিয়ে হয়তো আবছায়া একটি নিজ নিজ মনের মতো ধারণা আছে, সুস্পষ্ট ধারণা নেই। তাছাড়া আপাতভাবে মনে হতে পারে শিক্ষাক্রম নিয়ে এ রকম তীব্র পরিস্থিতি এর আগে আর কখনো হয়নি। এটিই শিক্ষাক্রম নিয়ে সবচেয়ে দীর্ঘ বিতর্ক। কিন্তু ইতিহাস জানাচ্ছে, এর আগে ১৮১৩ সালে এর চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিতর্ক চলেছে। বিতর্ক চলেছে ১৯০১ সালেও। প্রতিটি পরিবর্তন ও বিতর্ক শিক্ষায় স্থায়ী বা অস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
শিক্ষাক্রমের আধুনিক ধারণা খুব বেশি দিনের নয়। ১৯৩০ সালের আগেও যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষাক্রমের প্রাচীন ধারণা প্রচলিত ছিল। শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যক্রম আপাতভাবে একই রকম শব্দ মনে হলেও দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এ দুটো শব্দকেও একই অর্থে সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে আসছেন। এ দেশে শিক্ষাক্রম বলতে সাধারণ মানুষ পাঠ্যক্রমকেই বুঝে থাকে। কিন্তু শিক্ষাবিজ্ঞানে দুটোর অর্থ একেবারেই ভিন্ন। এনসিটিবি যখন শিক্ষাক্রম শব্দটি ব্যবহার করছে তখন তারা ভিন্ন অর্থেই ব্যবহার করছে।
বাংলা শিক্ষাক্রম শব্দটি এসেছে ইংরেজি Curriculum পরিভাষা হিসেবে। ইংরেজিতে শব্দটি এসেছে লাতিন ক্রিয়াপদ currere থেকে। যার অর্থ ছিল দৌড়ানো, এগিয়ে যাওয়া। এটা মূলত ব্যবহার করা হতো ঘোড়দৌড়ে ঘোড়ার এগিয়ে যাওয়ার নির্দিষ্ট পথ অর্থে। ধ্রুপদী লাতিন শিক্ষায় শব্দটি আসে কোর্স সমগ্র অর্থে। শব্দটি পরে ১৫৮২ সালে ইউনিভার্সিটি অব লিডেনের একাডেমিক রেকর্ডে ব্যবহার করতে দেখা যায়। ১৬৩৩ সালে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অধ্যয়নের বিষয়গুলোকে শিক্ষাক্রম হিসেবে উল্লেখ করতে থাকে আর তারপর ইংরেজি অভিধানেও শব্দটি স্থান পায়। সে সময় থেকে যেকোনো ক্ষেত্রের অধ্যয়নের বিষয়বস্তু বলতে শিক্ষাক্রম ইউরোপে ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৮২৪ সাল নাগাদ শব্দটি একটি কোর্স, একটি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগের একটি নির্দিষ্ট কোর্স বোঝাতে ব্যবহার হতে থাকে। শিক্ষাক্রমের আধুনিক ধারণা আসার আগ পর্যন্ত শিক্ষাক্রম বলতে যা বোঝানো হতো তা আসলে পাঠ্যক্রম বা সিলেবাস। মানে পড়ার বিষয়বস্তুর তালিকা। বর্তমান সময়ে শিক্ষাক্রম বলতে এ পরিকল্পিত সব শিখন অভিজ্ঞতাকেই বোঝানো হয়। আর পাঠ্যক্রম বা পাঠ্যসূচি (Syllabus) হলো বিষয়বস্তুর তালিকা। সাধারণে এখনো এ পাঠ্যসূচিকে অর্থাৎ পাঠ্যপুস্তক ও স্কুলে কী কী বিষয় শেখানো হয় তার সূচিকেই শিক্ষাক্রম অর্থে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বুঝে থাকেন।
এজন্য বর্তমান সময়ে পাঠ্যপুস্তক ও সে পাঠ্যপুস্তকের ভিত্তিতে পরিচালিত ক্লাস এবং এ পাঠ্যপুস্তকের ভিত্তিতে নেয়া খাতা-কলমের পরীক্ষাকেই এত গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু এগুলো আসলে শিক্ষাক্রমের বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি অংশমাত্র।
প্রাচীনকালেও পাঠ্যক্রম ঠিক করেই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হতো। প্রতীচ্যে শিক্ষার আদি নিদর্শন হচ্ছে এথেন্স আর স্পার্টার শিক্ষা ব্যবস্থা। এথেন্সে মনে করা হতো শিশুর মালিক শিশু নিজে। শিশুর নিজের মধ্যে যে গুণাবলি আছে তা-ই পরিচর্যা করা শিক্ষার মূল লক্ষ্য। তাই শিক্ষার বিষয়বস্তু হিসেবে ঠিক করা হয়েছিল মূলত শিল্পকলার করণ উপাদানগুলোকে। যেমন বাগ্মিতা। সক্রেটিসের বিচারসভায় পক্ষে-বিপক্ষে যে সূক্ষ যুক্তির জাল বিস্তারের নমুনা আমরা দেখতে পাই তা ছিল সে শিক্ষার একটি নিদর্শন। স্পার্টায় মনে করা হতো শিশুর মালিক রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের যে প্রয়োজন সে অনুযায়ীই শিশুকে শিক্ষা দেয়া উচিত। তাই স্পার্টার শিক্ষা ব্যবস্থার পাঠ্যসূচি ছিল অনেকটাই ব্যবহারিক। যুদ্ধবিদ্যা তার পাঠ্যসূচির অন্যতম বিষয়বস্তু ছিল। ফলে ছোট রাষ্ট্র স্পার্টা একসময় গ্রিক রাষ্ট্র এথেন্সকে দখল করে নিয়েছিল। এ থেকে পরে রোমানরা শিক্ষা নিয়েছিল। তারা পাঠ্যসূচিতে জ্ঞান, শিল্পকলা ও ব্যবহারিক যুদ্ধবিদ্যার সমন্বয় সাধন করেছিল। পরবতী সময়ে পৃথিবীব্যাপী রোমান সাম্রাজ্য বিস্তারের এটি ছিল একটি মূল কারণ। আধুনিক প্রতীচ্য সে ধারার পাঠ্যক্রমের উত্তরাধিকার।
প্রাচ্যের ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার আদি নিদর্শন বৈদিক শিক্ষা ব্যবস্থা। ম্যাক্সমুলারের অনুমান খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ৬০০ বছরের মধ্যে বেদ রচিত। এ সময়ের মধ্যে বেদের ১ হাজার ২৮টি সূক্ত রচনা করা হয়, যা ১০টি খণ্ড বা মণ্ডলে বিভক্ত। বৈদিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল এ বেদ শিক্ষা কেন্দ্র করে। ঋষি-পুরোহিতরা ছিলেন সে শিক্ষার মূল বাহক। মূলত শ্রুতির মাধ্যমে এ বেদ শিক্ষা দেয়া হতো। গুরুগৃহে ব্রাহ্মণদের পরিবারের সন্তানরা এ শিক্ষালাভ করতেন। বেদের মন্ত্রের ভাষাগুণ—শব্দচয়ন, ওজস্বিতা, ছন্দের বৈচিত্র্য, ধ্বনিমাধুর্য ও শ্রুতিমাধুর্য একই উচ্চগ্রামের ছিল যে সেগুলো শিষ্যরা সহজেই মনে রাখতে পারতেন। বেদের মূল বিষয় ছিল জীবন জগৎ সম্পর্কে দার্শনিক বোধ। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বেদান্ত—উপনিষদ, সূত্র সাহিত্য এ শিক্ষাধারার সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে শিক্ষার বিষয়বস্তু হিসেবে একদিকে আধ্যাত্মিক বিষয় যেমন স্থান পায় তেমনি স্থান পায় যাগযজ্ঞের নিয়মাবলি, লৌকিক ও ব্যবহারিক বিদ্যা। ছন্দোগ্য উপনিষদে গুরু সনৎ কুমারের শিষ্য নারদ তার পাঠ্য বিষয়গুলোর যে দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন তার মধ্যে ছিল—বেদ, ইতিহাস, ব্যাকরণ, তর্কশাস্ত্র (বাকবাক্য), পুরাণ, পিতৃলোক বিষয়ক বিদ্যা, রাশি বা গণিতশাস্ত্র, দৈববিদ্যা, সময়বিদ্যা (নিধিবিদ্যা), নীতিবিজ্ঞান, দেববিদ্যা (নিরুক্ত), ব্রহ্মবিদ্যা, ভূতবিদ্যা, ক্ষত্রিয়বিদ্যা, নক্ষত্রবিদ্যা, সর্পবিদ্যা, দেবযানবিদ্যা, নৃত্য, গীত ইত্যাদি। যুদ্ধবিদ্যার কথাও আমরা পরে পাই। দেখা যাচ্ছে, এ পাঠ্যসূচিতে যেমন পরা বিদ্যা তেমনি অপরা বিদ্যার সমাবেশ ঘটানো হয়েছিল। তবে ঋষির আশ্রম বা গুরুগৃহে শিক্ষালাভের যে চিত্র আমরা পরবর্তীকালের মহাকাব্য ও সাহিত্যে পাই তাতে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষালাভের সুযোগ পেতেন মূলত উচ্চ শ্রেণীর পরিবারের সদস্যরা। মহাভারতে যে কাহিনীগুলো আছে তাতে দেখা যাচ্ছে, রাজপরিবারের সদস্যরাই মূলত পরা ও অপরা বিদ্যার সুযোগ লাভ করছেন। ব্রহ্মজ্ঞান থেকে অস্ত্রবিদ্যা শিখছেন। শূদ্র বা বৃত্তিমূলক পেশার মানুষের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ তাদের পারিবারিক পরিসর থেকেই নিতে হয়েছে। বিশেষত হিন্দু ধর্মে বর্ণবিভাজন তৈরি হলে নিম্নবর্ণের মানুষ অন্যান্য অধিকারের পাশাপাশি শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বৌদ্ধ ধর্মে বর্ণবিভাজন না থাকলেও বৌদ্ধ শিক্ষা ছিল সংঘকেন্দ্রিক। সুতরাং সংঘের সদস্য না হলে এ শিক্ষার সুযোগ থাকার কথা নয়। এ শিক্ষাসূচির মূল বিষয়বস্তু ছিল মোক্ষলাভের জ্ঞান। তথাপি বৌদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থার পাঠ্যসূচিতে নানা বিষয়ের নাম পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে মহাযান ও হীনযান শাস্ত্র, যোগ শাস্ত্র, জাদুবিদ্যা, গণিত, ধাতুবিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র, ব্যাকরণ, ন্যায়শ্রাস্ত্র, রসায়ন, চিকিৎসা হেকিমিবিদ্যা, সর্পবিদ্যা ইত্যাদি।
পরবর্তী মুসলিম শাসনামলেও মসজিদের সঙ্গে যুক্ত মক্তব কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। উচ্চতর শিক্ষার জন্য মাদ্রাসা। এগুলোর শিক্ষার প্রধান মাধ্যম ছিল আরবি-ফারসি। পাঠ্যবিষয়বস্তু মূলত কোরআন ও হাদিস সংক্রান্ত। সঙ্গে নামাজ-রোজাসহ ধর্মীয় আচার সংক্রান্ত নিয়মাবলি। তবে এ শিক্ষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সবার জন্য উন্মুক্ততা। ধনী-গবির, আশরাফ-আতরাফ সবাই এ শিক্ষাধারার সুযোগ পেতেন। মধ্যযুগে এ শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল।
এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই ছিল প্রধানত ধর্মকেন্দ্রিক। ইউরোপ রেনেসাঁর মাধ্যমে ধর্ম থেকে শিক্ষাকে পৃথক করে ফেলে। ভারতবর্ষেও পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষার সূচনা ঘটে। তবে তার আগেই মধ্যযুগেই বাংলায় পাঠশালা নামে এক ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যার বিষয়বস্তু ছিল ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে ব্যবহারিক। এ পাঠশালাগুলো মূলত পরিচালিত হতো বাড়ির আঙিনায়, উঠানে এমনকি মনিহারি দোকানে। পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রে অপুকে যে পণ্ডিত মশাইয়ের চাল-ডাল-লবণ বিক্রির দোকানে পড়তে দেখি তা ছিল সে সময়ের পাঠশালারই এক চিত্র। পাঠশালাগুলোয় নির্দিষ্ট শিক্ষাক্রম মেনে পাঠ দেয়া হতো না। গুরু যে বিষয়গুলো জানতেন তা-ই শিক্ষা দিতেন। তবে বুখানন ও অ্যাডামসের রিপোর্ট থেকে জানা যায় পাঠশালায় নৈতিক ও ব্যবহারিক বিষয়ের সমন্বয় ছিল। অ্যাডাম পাঠশালায় ব্যবহৃত গ্রন্থগুলোর যে তালিকা তুলে ধরেছেন তার মধ্যে রয়েছে—সরস্বতী বন্দনা, গঙ্গা বন্দনা, দুর্গা বন্দনা, চাণক্য শ্লোক, শব্দ সুবন্ত, অষ্ট ধাতু, অষ্ট শব্দী, গুরু দক্ষিণা ইতাদি। আর ব্যবহারিক বিদ্যা শিক্ষার পাঠ্য বিষয়ের যে তালিকা পাওয়া যাচ্ছে, তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভাষা শিক্ষা ও অঙ্কশাস্ত্র। ভাষা শিক্ষায় ব্যাকরণ ও অলংকার শিক্ষা ছিল। ছিল নানা রকম চিঠিপত্র ও দলিল রচনার কৌশল শেখানো। অংকশাস্ত্রে শিক্ষার্থীদের কড়ির হিসাব, সংখ্যা গণনা, ভূমির হিসাব, গাছ মাপার হিসাব, জমিদারি ও মহাজনি হিসাব, শুভংকরের হিসাব, যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ শেখানো হতো। বোঝা যাচ্ছে তৎকালীন সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠ্য বিষয় ঠিক করা হয়েছিল।
ড. শোয়াইব জিবরান: অধ্যাপক, স্কুল অব এডুকেশন, বাউবি ও সাবেক শিক্ষা পরামর্শক, ইউনিসেফ










