দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির সুযোগে একতরফা ব্যবসা করে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন করছে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান এমন অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের তাদের সক্ষমতাও সীমিত পরিমাণে থাকার কথা বলা হচ্ছে। যে কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না। ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে খাদ্যনিরাপত্তা এবং বাজারে ক্রমাগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। যার রেশ পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, ভোক্তা স্বার্থ দেখার জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং আরো নানা সংস্থা রয়েছে। কিন্তু ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় এসব সংস্থার সক্ষমতা সীমিত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেবারে অকার্যকর বলা যায়। বাজারে অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী বড় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার নজিরও নেই।
এভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার সুযোগে বাজারে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য বিরাজমান রয়েছে। এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে বাজার থেকে অত্যধিক মুনাফা তুলে নিচ্ছে। এবং ক্রমান্বয়েই এটি চক্রাকারে দৃশ্যমান হচ্ছে। যেমন পেঁয়াজ, আদা, কাঁচামরিচ, চিনি, সয়াবিন তেল, ডিম, মুরগির মাংস এসব নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট করে প্রচুর পরিমাণ অর্থ অস্বাভাবিকভাবে উপার্জন করা হয়েছে। এভাবে বাজার ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হলেও সরকারি সংস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
সিন্ডিকেট করে হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেয়া হলেও সংস্থাগুলো নির্বিকার। জড়িতদের আইনের আওতায় আনার কোনো উদাহরণও নেই। এদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যথার্থ মুদ্রা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা আবশ্যক। কেননা বাজারে অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল অবস্থানে নেই। এক্ষেত্রে সরবরাহ সামান্য হ্রাস পেলেই ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণের ফলে দেশের কতিপয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা অর্জন করেছে। বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণে কারসাজির মাধ্যমে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন করছে।
এক্ষেত্রে অনেক সময় সরকারের কিছু নীতি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে অতিমুনাফার সুযোগ করে দেয়। এদিকে ব্যবসায়ীদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ ব্যাংকও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে সুদহার নির্ধারণ করে দেয়—এমন অভিযোগ ভোক্তা অধিকারসংশ্লিষ্টদের। মূলত ব্যবসা হবে প্রতিযোগিতাপূর্ণ, কিন্তু সেখানে ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে মন্ত্রণালয়কে অমনোযোগী দেখা যায়। এমনকি ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পক্ষ থেকে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের প্রভাবমুক্ত পৃথক মন্ত্রণালয় দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করার অভিযোগ থেকে মন্ত্রণালয় মুক্ত নয়—এ অভিযোগও খণ্ডন করা হয় না। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দুর্বলতার এটিও একটি কারণ বলে গণ্য করা যায়।
খাদ্যদ্রব্যের বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে খাদ্য বিভাগ ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিত্যপণ্য সরবরাহ ও বিক্রির ব্যবস্থা আরো জোরদার করা উচিত। এ ধরনের উদ্যোগ নিলে তা মূল্যবৃদ্ধির লাগাম টানতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা যায়। ক্যাবের দাবি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় না। যে কারণে অনেক সময় জনস্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে না বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
টিসিবির বাজারদর উদ্ধৃত করে ক্যাব জানিয়েছে, গত এক বছরে অধিকাংশ পণ্যেরই মূল্যবৃদ্ধি ছিল অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সাধারণ মানুষের জীবনে মূল্যস্ফীতির আঁচ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে সঠিকভাবে প্রতিফলন হচ্ছে না। অনেকে সঞ্চয় ভেঙে বা ধার করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনছেন। এতে নিত্যদিনের অনেক চাহিদাই পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের জীবনমানেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থার এ সময়ে অর্থমন্ত্রী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৬ শতাংশ নির্ধারণ করেছেন। সরকারের ব্যয় মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অধিক ঋণ গ্রহণের সম্ভাবনা শুভ লক্ষণ নয় বলে আশঙ্কা ক্যাবের। কেননা এতে মুদ্রাস্ফীতি আরো লাগামহীন হয়ে পড়তে পারে। মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, ‘নয়-ছয়’ সুদহার নির্ধারণ এবং তা কিছুটা শিথিল করার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক। কিন্তু মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে হলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংককে সুদহার নির্ধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদানের কোনো বিকল্প নেই। সরকারের ব্যবসাবান্ধব ‘সুদনীতি’ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে না মত বিশেষজ্ঞদের।
এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে চিঠি দিয়েও আমদানিকারকদের তথ্য পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত অতিলোভী ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য হাসিল করবে বলে মনে করে সংস্থাটি। এজন্য বাজারে স্থিতিশীলতার স্বার্থে আমদানিসংশ্লিষ্ট তথ্য উন্মুক্ত রাখা উচিত, এতে বাজার সম্পর্কে ভোক্তাদের ধারণা স্পষ্ট থাকবে। আমরা প্রত্যাশা করব, সরকার বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে ভোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনা করবে। এজন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।










