গত এক যুগেরও বেশি সময় উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা যদিও বলছে বাজারে এ ধরনের উত্থান-পতন স্বাভাবিক একটি বিষয় কিন্তু বিনিয়োগকারী এবং বিশ্লেষকরা বলছেন, শেয়ারবাজারে অস্থিরতার বিষয়টি যেন বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি মাথাব্যথার কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য শুধু পুঁজিবাজারই নয় দেশের ব্যাংক, বীমাসহ ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতেও মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সুশাসনের অভাব ও অনিয়ম করে পার পেয়ে যাওয়ার কারণেই আর্থিক খাতে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। আর শেয়ারবাজারে কারসাজি করে মানুষের টাকা হাতানোর ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। শেয়ারবাজারে মানুষের আস্থা এত কম থাকায় বাজার মূলধনও অত্যন্ত কম। এছাড়া বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা কম এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ দিন দিন কমছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো একটি দেশের পুঁজিবাজারের বেহাল দশা কাম্য নয়। পুঁজিবাজারসহ আর্থিক খাতকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারলে দেশের উন্নয়ন যাত্রায় সঠিকভাবে অবদান রাখা সম্ভব হতো।
বাংলাদেশের মতো উদীয়মান ও সক্ষম অর্থনীতির পুঁজিবাজারের তুলনায় পাকিস্তানের মতো দেশের পুঁজিবাজার সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে—এটা বেশ লজ্জার ব্যাপার বৈকি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তান গত বছর দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল। এ অবস্থায় চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশটিকে ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিতে সম্মত হয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে প্রকাশ, এতে দেশটির অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে এসেছে। ঋণ অনুমোদনের খবরে পাকিস্তানের পুঁজিবাজারের সূচক একদিনেই ২ হাজার ৪০০ পয়েন্টের বেশি বাড়ে। অন্যদিকে দেশটির তুলনায় বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আইএমএফের দ্বারস্থ হয় বাংলাদেশও। সংস্থাটির পর্ষদ এ বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশকে ঋণ দেয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করে। যদিও ঋণ অনুমোদনের পরদিন দেশের পুঁজিবাজারের সূচক পয়েন্ট হারায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়ায় অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারে এর প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে না।
বণিক বার্তার প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, তিন বছর ধরে অর্থনৈতিকভাবে বেশ কঠিন সময় পার করছে পাকিস্তান। অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কারণে একপর্যায়ে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে গিয়ে ঠেকে। অতিপ্রয়োজনীয় জ্বালানি কেনারও অর্থ ছিল না দেশটির কাছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে শেষ পর্যন্ত আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হয়। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ভালো করছে পাকিস্তানের পুঁজিবাজার। ব্লুমবার্গের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, দেশটির পুঁজিবাজার সম্প্রতি বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা বাজারের স্বীকৃতি পেয়েছে। অন্যদিকে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে পাকিস্তানের চেয়ে বেশ এগিয়ে থাকলেও মন্থর গতি দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে। ব্লুমবার্গ বিশ্বের ৯০টি দেশের পুঁজিবাজারের সূচক নিয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে পাকিস্তানের কেএসই-১০০ সূচক বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় সেরা পুঁজিবাজার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বর্তমানে সূচকটি ৫০ হাজার পয়েন্ট ছাড়িয়েছে। ছয় বছর পর সূচকটি এ অবস্থানে এসেছে। ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর দেশটির কেএসই সূচক ৪২ হাজার ৪ পয়েন্টে ছিল। সর্বশেষ গত শুক্রবার সূচকটি ৫০ হাজার ৯৫৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে সূচকটি বেড়েছে ২১ শতাংশ। আইএমএফ পাকিস্তানকে ঋণ দিতে সম্মত হওয়ার পর গত ৩ জুলাই দেশটির কেএসই-১০০ সূচক একদিনে ২ হাজার ৪৪২ পয়েন্ট বেড়ে ৪৩ হাজার ৮৯৫ পয়েন্টে উঠে যায়, যা ছিল ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
পাকিস্তানের পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিম্ন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির বিষয়টি পাকিস্তানের পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক উত্থানকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তবে আগামী জানুয়ারিতে দেশটির জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া আইএমএফের সঙ্গে চূড়ান্ত ঋণ চুক্তির বিষয়টিও ২০২৪ সালে দেশটির পুঁজিবাজারের ঊর্ধ্বমুখিতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে পাকিস্তানের তুলনায় এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আশাব্যঞ্জক পারফরম্যান্স করতে পারছে না। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নির্বাচিত কোম্পানির সূচক ডিএস-৩০ ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর ১ হাজার ৮৫৯ পয়েন্টে ছিল। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার এটি ২ হাজার ১৩৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে সূচকটি বেড়েছে ১৫ শতাংশ। অবশ্য গত এক বছরে ডিএস-৩০ সূচক ৫ শতাংশ পয়েন্ট হারিয়েছে। ডিএসইর সার্বিক সূচক ডিএসইএক্স এ সময়ে দেড় শতাংশ পয়েন্ট হারিয়েছে। সূচকের পাশাপাশি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও কমছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পুঁজিবাজারে দৈনিক গড়ে ১৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারের শেয়ার লেনদেন হয়। সেখানে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে দৈনিক গড় লেনদেন নেমে এসেছে ৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারে। এ বছরের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডের সভায় বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এ ঋণ অনুমোদনের পরদিন দেশের পুঁজিবাজারের সব সূচকই কমেছিল।
বর্তমানে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সব সূচকই নিম্নগামী। মূল্যস্ফীতির বাড়বাড়ন্তের প্রভাবে মানুষের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আগের মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো ১২ শতাংশের নিচে নামেনি। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগ পরিস্থিতি বর্তমানে ঋণাত্মক। এর মানে হচ্ছে বিদেশীরা শেয়ার কেনার তুলনায় বিক্রি করছেন বেশি। বিশেষ করে ২০১৮ সাল থেকেই এ পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। সে বছর দেশের পুঁজিবাজারের বিদেশী বিনিয়োগকারীরা কেনার তুলনায় ৫৯৩ কোটি টাকার শেয়ার বেশি বিক্রি করেছেন। একইভাবে ২০১৯ সালে ৪৮৮ কোটি, ২০২০ সালে ২ হাজার ৬০৬ কোটি, ২০২১ সালে ২ হাজার ৫৩৬ কোটি ও ২০২২ সালে ১ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকার শেয়ার বেশি বিক্রি করেছেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা কেনার তুলনায় ১১০ কোটি টাকার শেয়ার বেশি বিক্রি করেছেন। দেশের পুঁজিবাজার থেকে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ক্রমাগত শেয়ার বিক্রির বিষয়টি স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করেছে। কারণ তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিসহ স্থানীয় ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোতেই বিদেশীরা বিনিয়োগ করেন। তাদের কাছে থাকা এসব কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে দেয়ার কারণে বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এমনিতেই বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ক্রেতার পরিমাণ কম। এর মধ্যে ফ্লোর প্রাইসের কারণে শেয়ারবাজারে আগ্রহ আরো কমেছে। ফলে মধ্যস্থতাকারী ও বিনিয়োগকারী উভয়ই শেয়ারবাজার নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বের কোনো শেয়ারবাজারে ফ্লোর প্রাইস নেই। যখন ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মতো মধ্যস্থতাকারীরা শেয়ারবাজারে স্থিতিশীল আয়ের চেষ্টা করছে, তখন ফ্লোর প্রাইসের কারণে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যানুযায়ী, গত এক বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গড় টার্নওভার ৬০০ কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের ১ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকার চেয়ে অনেক কম। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে ২০২১ সাল থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোড শো ও বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করে আসছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। যদিও এর প্রভাব পুঁজিবাজারে বিদেশীদের পোর্টফোলিও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো দৃশ্যমান নয়।
পুঁজিবাজারে যে আস্থার সংকট তা নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা সুশাসনের অভাবই এর মূল কারণ। দিনে দিনে, এ বিষয়গুলো আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পুঁজিবাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার আরেকটি কারণ হলো হঠাৎ নীতি পরিবর্তনের প্রবণতা। এমন অনেক উদাহরণ আছে যেখানে দেখা যায়, সরকার তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে আচমকা হস্তক্ষেপ করেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সার্বিকভাবে সুশাসন পুঁজিবাজারের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনার মূল চাবিকাঠি। সার্বিক অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আস্থা ফিরে না এলে এ বাজার দেশের অর্থনীতিতে প্রকৃত ভূমিকা রাখতে পারবে না। আর তা ফেরানোর জন্য সবার আগে ফেরাতে হবে সুশাসন। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে বাজার কারসাজি কমাতে হবে। এছাড়া অর্থনৈতিক নীতিতে বন্ধ করতে হবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।










