দেশের চিকিৎসাশিক্ষার প্রসার ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জনসংখ্যার অনুপাতে চিকিৎসকের সংকট কাটাতে গত দেড় দশকে ২০টি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৩৭। প্রতি শিক্ষাবর্ষে এসব চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে নতুন চার সহস্রাধিক শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছেন। কিন্তু শিক্ষকসহ সার্বিক জনবল সংকটে ভুগছে দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলো। রয়েছে তীব্র অবকাঠামো সংকট। নেই পর্যাপ্ত আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ও ল্যাব সুবিধা। এর মধ্যেও  শিক্ষার্থীদের আসন সংখ্যা বাড়ছে। জনবল ও অবকাঠামো সংকট সমাধান না করে আসন বাড়ানোর সিদ্ধান্তে চিকিৎসাশিক্ষা বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এতে চিকিৎসাশিক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় এমবিবিএস (ব্যাচেলর অব মেডিসিন, ব্যাচেলর অব সার্জারি) কোর্সে সাড়ে চার হাজারের কিছু কম আসন রয়েছে। এক্ষেত্রে আগামী শিক্ষাবর্ষে (২০২৩-২৪) আরো ১ হাজার ৩০টি আসন বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকারের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ।

অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকটের মধ্যেই এ আসন সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বস্তুত মানসম্মত চিকিৎসাশিক্ষার জন্য যথাযথ শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর সবক’টিতেই শিক্ষক সংকট রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সর্বাধুনিক শিখন পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে ক্লাস, পরীক্ষাগার ও হাসপাতালে প্রশিক্ষিত করা অত্যাবশ্যক। গত দেড় দশকে ২০টি নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু কলেজগুলোয় সে অনুযায়ী শিক্ষা উপকরণ বাড়ানো হয়নি।

অনেক মেডিকেল কলেজের নিজস্ব একাডেমিক ভবনই নেই। বেশ কয়েকটি কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল নেই। পাশাপাশি পরীক্ষাগার, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষক ও দক্ষ অন্যান্য লোকবলের অভাবও রয়েছে। এসব সংকট সমাধান না করে কলেজগুলোর আসন সংখ্যা যত বাড়ানো হবে চিকিৎসা শিক্ষার মানও তত নিম্নগামী হবে। এর ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে দেশের চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য খাত হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজের মধ্যে ২২টিতে নিজস্ব হাসপাতাল রয়েছে। বাকি ১৫টি কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল নেই। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ভাষ্য, চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে সরকার প্রতিটি জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সময়ের প্রয়োজনে মেডিকেল কলেজগুলোয় আসন সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। তবে মেডিকেল কলেজগুলোর আসন বৃদ্ধির সময় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং সীমাবদ্ধতার কথা চিন্তা করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের চিকিৎসা শিক্ষার মান এখন নিম্নগামী। এর মধ্যে শিক্ষক সংকট থাকার পরও কলেজগুলোয় আসন বাড়ানো হয়েছে। বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্যই পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। সেখানে নতুন করে আসন বাড়ানো অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত হিসেবেই গণ্য হবে। চিকিৎসা শিক্ষায় ব্যবহারিক শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশিক্ষণের জন্য অনেক কলেজেরই হাসপাতাল নেই। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ছাড়া একজন  চিকিৎসক তৈরি করা রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার।

এদিকে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর বিদ্যমান সংকট সমাধানের বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশ্বাসের প্রতিফলন দেখতে চাই। এমনিতেই আমাদের দেশের চিকিৎসাসেবা সব ধরনের রোগের চিকিৎসার জন্য পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠেনি। এখনো অনেক জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হয়। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের চিকিৎসাসেবাও আমাদের চেয়ে উন্নত। এজন্য দেশের চিকিৎসাসেবার মান উন্নত করার জন্যই চিকিৎসা শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জনবল ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যেসব দেশের চিকিৎসা শিক্ষা উন্নত, সে দেশগুলোর মডেল বিবেচনা করে চিকিৎসা শিক্ষার বন্দোবস্ত করতে হবে। নাহলে চিকিৎসা শিক্ষায় যে দুর্গতি রয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে যাবে।

একজন শিক্ষার্থী অনেক স্বপ্ন নিয়ে চিকিৎসা শিক্ষায় আগ্রহী হয়। মানবিক এ পেশায় যে দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন তা যদি শিক্ষাজীবনে না পাওয়া যায়, তাহলে পেশাগত জীবনে শিক্ষার্থীরা কতটুকু ভালো করতে সক্ষম হবেন, তা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এজন্য শিক্ষার্থীদের মানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করব, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর প্রকৃত বাস্তবতা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করবে। আমাদের চিকিৎসা শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাক, এটিই সবার কাম্য। এক্ষেত্রে   দ্রুত শূন্য পদে জনবল নিয়োগ দেয়া হোক এবং অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করা হোক। সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ শূন্যতা পূরণের দাবি জানাতেই পারে। সংকটগুলো দূরীভূত হলে দেশের চিকিৎসাসেবার মান আরো বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।