দেশের অর্থনীতি সংকটকাল অতিক্রম করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে নির্দিষ্ট ও নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট হচ্ছে। এদিকে জীবনযাপনের বর্ধিত খরচের তুলনায় ব্যাংকে আমানতের সুদহার কম হওয়ায় গ্রাহকরা ব্যাংকে টাকা রাখতে আগ্রহ পাচ্ছেন না। এতে ক্রমাগত তারল্য সংকটে ভুগছে ব্যাংকগুলো। অর্থনীতিতে এ দ্বিমুখী চাপ অব্যাহত থাকলে সংকট আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সব মিলিয়ে অন্য দেশগুলোর উদাহরণ অনুসরণ ও ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই বলে অর্থনীতিবিদরা জানাচ্ছেন।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, মুদ্রাবাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার পদক্ষেপ নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি মাসের শুরুতে নীতি সুদহার (রেপো রেট) বাড়ানো হয় দশমিক ৭৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। একই সঙ্গে দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয় ব্যাংক ঋণের সুদহার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তে সুদহার বাড়লেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এখনো তা কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখেনি। উল্টো পেঁয়াজ, আলুসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বেশির ভাগ পণ্যের দাম ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। 

একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের ব্যাংকে টাকা জমানোর সক্ষমতা কমে গেছে, অন্যদিকে আমানতের সুদহার কম। তাই বেশি সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে ব্যাংকগুলো। এমনিতেই আমাদের অর্থনীতির ৬০ শতাংশের বেশি এখনো ব্যাংকের আওতার বাইরে রয়েছে। অথচ উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি প্রায় শতভাগ ব্যাংকনির্ভর। নানা কারণেই আমাদের অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়নি। আবার প্রভাব খাটিয়ে খেলাপি ঋণের দৌরাত্ম্য ব্যাংকগুলোকে নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে। অবস্থা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে অন্য ব্যাংক থেকে ধার নিয়ে চলতে হচ্ছে। 

চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে ৪ অক্টোবর নীতি সুদহার বা রেপো রেট এক ধাক্কায় দশমিক ৭৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু অর্থনীতির অন্য সব উপাদানের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে কেবল সুদহার বাড়ানোর পদক্ষেপ কার্যকর হবে না বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। কেননা নীতি সুদহার বাড়ানোয় দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোকে এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বেশি সুদে অর্থ ধার করতে হচ্ছে। অথচ অর্থের সরবরাহ হ্রাসের উদ্দেশ্য থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু এর বিপরীত চিত্রই দেখা যাচ্ছে। সুদহার বেশি হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংকগুলো এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আগের চেয়ে বেশি অর্থ ধার করছে।   

সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে। এ দুই উপায়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে তারল্য বের হয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের হাতে সঞ্চয় থাকছে না। এ কারণে ব্যাংকগুলোয় আমানতের প্রবৃদ্ধি খুবই কম। অনেক ব্যাংকের আমানত না বেড়ে উল্টো কমে যাচ্ছে।

আবার দৈনন্দিন কেনাকাটা, বিভিন্ন ধরনের বিল পরিশোধ, বাড়ি ভাড়াসহ নানা কারণে অনেকেই সবসময় নগদ অর্থ কাছে রাখে। এছাড়া ব্যবসায়িক লেনদেন করতেও নগদ টাকার প্রয়োজন হয়। যখন মূল্যস্ফীতি বা জিনিসপত্রের দাম বাড়ে তখন নগদ টাকা রাখার প্রয়োজনীয়তা বেশি হয়। এর বাইরে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নগদে লেনদেন হয়। যা মানুষের হাতে থাকে। এছাড়া হুন্ডিতে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বাড়লেও নগদ টাকার প্রবাহ বেড়ে যায়। তখন নগদ টাকার চাপ বাড়ে। এভাবে বাজারে নগদ টাকার সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোতে নগদ প্রবাহে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। যার ফলে তারল্য সংকট বাড়ছে। ব্যাংকগুলোকে অন্য ব্যাংক থেকে বেশি সুদে ধার নিতে হচ্ছে। এমনকি দুর্বল ব্যাংকগুলোও উচ্চ সুদে টাকা নিচ্ছে।

এদিকে ২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকেই দেশের মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। বাজারে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে দেশের মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে এলেও সেটির হার ছিল ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অথচ এক বছর আগে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করা শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি এখন ২ শতাংশের নিচে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের মূল্যস্ফীতিও ৫ শতাংশের ঘরে। কিন্তু আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি কমানো যাচ্ছে না।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগের মধ্যেই চলতি মাসে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরো বাড়তে শুরু করেছে। আলু ও পেঁয়াজের দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। চালসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও এখন ঊর্ধ্বমুখী। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ বিপরীতমুখী প্রভাব ফেলছে কিনা, সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগ গড় মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছে। কিন্তু ব্যাংক খাতে রেপো রেট বাড়ানোর সুফল আদৌ পাওয়া যাবে কিনা সেটি নিয়ে সন্দিহান অর্থনীতিবিদরা। প্রথাগত মুদ্রানীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অনুসরণে সুদহারসহ অর্থনীতির সব কাঠামোই বাজারভিত্তিক করার প্রতি জোর দেয়া হচ্ছে। নাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে, তাতে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা অনুসরণ জরুরি। আমরা প্রত্যাশা করব সঠিক নীতি অনুসরণের মাধ্যমে মুদ্রাবাজারে অর্থের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাযথ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।