সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। বিশেষায়িত চিকিৎসার ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষণীয়। দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় হৃদরোগের মতো জটিল রোগের চিকিৎসায়ও উন্নতি হয়েছে। আগে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হলেও এখন দেশেই হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসা মিলছে। আমাদের দেশের চিকিৎসকরা অবশ্যই এ কৃতিত্বের দাবিদার। অনেক সংকটের মাঝেও আমাদের চিকিৎসাসেবার মান এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নত হচ্ছে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশে সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ধীরে ধীরে কমলেও বাড়ছে অসংক্রামক ব্যাধি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। দেশে স্বাস্থ্যসেবা বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির মতে, প্রতি বছর দেশে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত রোগীদের মধ্যে ৬৭ শতাংশই অসংক্রামক রোগে ভুগে মারা গেছে। তাদের মধ্যে হৃদরোগীদের হার সর্বোচ্চ, যা ৩০ শতাংশের বেশি।

সাম্প্রতিক বছরে হৃদরোগের অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে গুণগতমান ও উৎকর্ষ বেড়েছে। তবে অস্ত্রোপচারের সংখ্যা, চিকিৎসা ব্যয় ও আঞ্চলিক অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার উন্নয়নে বাজেট বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের জীবনাচার ও খাদ্যাভ্যাসে সতর্কতা এবং প্রাথমিক পর্যায়ের প্রতিরোধমূলক সচেতনতা আরো বাড়াতে হবে। 

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে প্রথম কার্ডিয়াক সার্জারি শুরু হয়। বর্তমানে চিকিৎসার পরিসর বৃদ্ধি পেলেও তা মোট জনসংখ্যার তুলনায় অপর্যাপ্ত। শুরুর পর তুলনামূলক কার্ডিয়াক সার্জারি ও চিকিৎসা কেন্দ্র বেড়েছে। ১৯৯৭ সালে দেশে দুই শতাধিক কার্ডিয়াক সার্জারি হয়। ২০১৬ সালে এসে তা ১১ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং ২০১৯ সালে প্রায় ১৩ হাজারে দাঁড়ায়। এসব কার্ডিয়াক সার্জারির মধ্যে করোনারি আর্টারি বাইপাস গ্রাফট (সিএবিজি) ৬৭ শতাংশ, ভালভ প্রতিস্থাপন ১২ ও জন্মগত সমস্যার কারণে ২০ শতাংশ। ২০১৭ সালে দেশে হৃদরোগে অস্ত্রোপচারের সুবিধা ছিল ২৫টি চিকিৎসা কেন্দ্রে, যা ২০২২ সালে ৩২টিতে পৌঁছেছে। এর মধ্যে চারটি সরকারি, একটি সেনাবাহিনীর ও একটি স্বায়ত্তশাসিত মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ২৬টি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসা সুবিধার ৯৫ শতাংশই রাজধানীকেন্দ্রিক। ঢাকা বিভাগের ২৪টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, চট্টগ্রাম বিভাগের চারটি হাসপাতাল, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর ও সিলেট বিভাগে একটি করে হাসপাতালে কার্ডিয়াক সার্জারির সুবিধা রয়েছে।

তবে চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় (আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার) ৭০ শতাংশ উল্লেখ করে স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দিন দিন চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষায়িত সেবার পরিসর ও মান বৃদ্ধি পেয়েছে ঠিকই, তবে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সক্ষমতার মধ্যে আনা যায়নি। সবার জন্য অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা না গেলে টেকসই উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।

বস্তুত ৫০ বছর আগে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুর অবস্থা ছিল। দেশের কোনায় কোনায় ছিল অপুষ্টি। মাতৃ ও শিশুর মৃত্যুহার ছিল বেশি। টিকা প্রয়োগের হার ছিল নগণ্য। ছিল না পর্যাপ্ত সুসংগঠিত স্বাস্থ্য কাঠামো ও অবকাঠামো। সেই অবস্থা থেকে বহু আগেই বাংলাদেশ বেরিয়ে এসেছে। বহু পরিমাপকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। ফলে চিকিৎসা নেয়ার জন্য বিদেশনির্ভরতাও কমে এসেছে। দেশেই এখন অনেক জটিল রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে। এতে যেমন অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি সময়ের অপচয় এড়ানো যাচ্ছে। পাশাপাশি রোগী ও রোগীর স্বজনদের ভোগান্তি কমছে।

হৃদরোগের মতো চিকিৎসায় দীর্ঘদিন বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হয়েছে। এখন দেশে চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধি পেলেও জনসংখ্যার তুলনায় তা খুবই অপর্যাপ্ত। সাম্প্রতিক বছরে কার্ডিয়াক সার্জারি বা হৃদরোগের অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে গুণগতমান ও উৎকর্ষ বেড়েছে। তবে অস্ত্রোপচারের সংখ্যা, চিকিৎসা ব্যয় ও আঞ্চলিক অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, এ খাতের উন্নয়নে সরকারের বাজেট বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের জীবনাচার ও খাদ্যাভ্যাসে সতর্কতা এবং প্রাথমিক পর্যায়ের প্রতিরোধমূলক সচেতনতা আরো বাড়াতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (সিভিডি) বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রধান কারণ। ২০১৯ সালেও ১ কোটি ৭৯ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে হৃদরোগে। এসব মৃত্যু বিশ্বব্যাপী গোটা মৃত্যুহারের ৩২ শতাংশ। এর তিন-চতুর্থাংশের বেশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে ঘটছে। বিশেষ করে তামাক সেবন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অ্যালকোহল গ্রহণের মতো আচরণগত অভ্যাস হৃদরোগের ঝুঁকির কারণ। 

অর্থাৎ ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’—এ নীতি মেনে চলা প্রয়োজন। কিন্তু রোগ যদি শরীরে তৈরি হয়, তখন যথাযথ চিকিৎসা যেন পাওয়া যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দাবি, দেশে অসংক্রামক রোগের মধ্যে হৃদরোগের ভুক্তভোগী সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধ ব্যবস্থায় গুরুত্ব কম দেয়া হচ্ছে। এ রোগ যেসব কারণে প্রভাবিত হয়, সেসব ঝুঁকি কমানোর জন্য ব্যবস্থা তেমন একটি দৃশ্যমান নয়। এক্ষেত্রে কাগজে-কলমে কার্যক্রম দেখানো হলেও বাস্তবিক অর্থে কার্যকরী পদক্ষেপ নেই। আমরা প্রত্যাশা করব, হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য সচেতনতা তৈরিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় প্রচারণার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পাশাপাশি হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দূরীভূত করার ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। হৃদরোগের চিকিৎসায় দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি সবার আস্থা বজায় থাকুক এবং আমাদের চিকিৎসাসেবা আরো উন্নত হোক, এটিই আমাদের কাম্য।