গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে, যার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে একটি সম্ভাবনাময় অর্থনীতি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু সমসাময়িক কভিড-১৯ ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সেই উন্নয়নের গতিবেগ কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। ফলে আসন্ন অর্থবছর ২০২৪-২৫-এর জাতীয় বাজেট সবার কাছে ব্যাপক আগ্রহের বিষয়। বিগত দুই বছরে দেশের অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে রয়েছে। 

আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং টেকসই উন্নয়নের গতিধারা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে সামষ্টিক অর্থনীতির সমস্যাগুলো অনুধাবন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তার ভিত্তিতে আসন্ন জাতীয় বাজেটের জন্য সঠিক কৌশলগত দিকনির্দেশনা গ্রহণ করা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে যদি আমরা মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়াতে চাই। 

বর্তমান পরিস্থিতিতে, আমরা যে অর্থনৈতিক চাপ পর্যবেক্ষণ করছি তার চারটি প্রধান কারণ রয়েছে: ১. বিশ মাস ধরে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশের ঘরে আটকে আছে, ২. গত ২৪ মাসে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে, ৩. বাজেটের সমগ্র উন্নয়ন খাত এখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হচ্ছে (যা উচ্চ সুদহারের জন্য টেকসই কৌশল হতে পারে না) এবং ৪. ব্যাংক খাতের বিপজ্জনক পরিস্থিতি, যা সরকারের দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়ার সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে সীমিত করেছে এবং নেতিবাচক তালিকাভুক্ত দশটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এবং মূলধনের ঘাটতি কীভাবে অর্থায়ন করা হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়।

এ প্রেক্ষাপটে নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সরকারকে অবশ্যই কৌশলগত দিকনির্দেশনায় একটি দৃঢ় পরিবর্তন আনতে হবে: ক. রাজস্ব ও মুদ্রানীতির কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সামগ্রিক চাহিদার সংকোচন করতে হবে (যেমন জিডিপির ৩-৪ শতাংশের মধ্যে বাজেট ঘাটতি রাখতে হবে), খ. কর অব্যাহতি বাতিল, প্রত্যক্ষ করের অংশ বৃদ্ধি, সম্পদ কর আধুনিকীকরণের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, গ. প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি করা যাবে না এবং ঘ. আগামী দুই বছরের জন্য সব সরকারি খাতে নিয়োগ স্থগিতের বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে।

রাজস্ব সক্ষমতার উন্নতির জন্য এটা স্বীকার করে নেয়া অপরিহার্য যে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন, যার ফলে উন্নয়নমূলক ব্যয় অর্থায়নের জন্য বর্তমানে ব্যয়বহুল অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এটি স্বীকৃত যে কোনো দেশ কখনো একটি দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে উচ্চ-মধ্যম আয়ের বা উচ্চ আয়ের দেশে রূপান্তরিত হতে পারেনি। পিআরআই বাংলাদেশের রাজস্ব বাড়ানোর জন্য সম্প্রতি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে কিছু কার্যব্যবস্থা চিহ্নিত করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:

কর প্রশাসনের পুনর্গঠন এবং অটোমেশনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করা। আসন্ন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কর অব্যাহতি হ্রাসের বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত।

এনবিআরের উচিত বেসরকারি কর্মচারীদের বেতন ও মজুরিতে ধার্যকৃত অগ্রিম আয়করের ব্যাপারে মনিটরিং ব্যবস্থা উন্নত করা।

সম্পত্তি কর এবং অন্যান্য সম্পদের ওপর করের বিষয়টি গুরুত্বসহ বিবেচনা করা। 

ভ্যাট ব্যবস্থার সংস্কার ও সরলীকরণ করা।

সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেট প্রবৃদ্ধি খুব কম হবে। এ সংকোচনমূলক রাজস্বনীতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। দীর্ঘ বিলম্বের পর বাংলাদেশ ব্যাংক অবশেষে বিদ্যমান মুদ্রানীতি এবং বিনিময় হার নীতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য যেসব নীতি এরই মধ্যে পরিবর্তন করা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ১. আন্তঃব্যাংক মুদ্রার বিনিময় হার একীভূতকরণ ও বাজারভিত্তিক ক্রলিং পেগ পদ্ধতি অবলম্বন। ২. ৬-৯ সুদহারের সীমা ও পরবর্তী সময়ে নেয়া স্মার্ট পদ্ধতি বাতিল করে বাজারভিত্তিক সুদহার ফিরিয়ে আনা এবং ৩. বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়ানো। 

এ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং বাজারে কোনো রকম অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করা যাবে না। এর পাশাপাশি: ক. এ পদক্ষেপগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের থেকে টাকা নিয়ে বাজেট ঘাটতি অর্থায়ন থেকে বিরত থাকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা অব্যাহত রাখতে হবে, খ. বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত তারল্য সহায়তা প্রদানের বর্তমান যে প্রথা প্রচলিত আছে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বন্ধ করতে হবে, গ. প্রতি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ পয়েন্ট করে বাড়াতে হবে, যাতে এটি জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর মধ্যে ১০ শতাংশে পৌঁছে এবং ঘ. সম্পূর্ণ ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করা এখন অতি আবশ্যক।

সামগ্রিকভাবে কিছুটা স্পষ্টতা অর্জিত হয়েছে যে আসন্ন অর্থবছরের বাজেট দেশের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং এটির জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দৃঢ়ভাবে দৃশ্যমান করতে হবে। বিশেষ করে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য আমাদের অর্থনৈতিক কৌশল সংকোচনমূলক হতে হবে। এ অর্থনৈতিক সংকোচনমূলক কৌশল আগামীতে অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ব্যাপারে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নে সহায়ক হবে।


ড. আহসান এইচ মনসুর: নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) 

ড. আশিকুর রহমান: মুখ্য অর্থনীতিবিদ, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)