আমদানি-রফতানি চাঙ্গা থাকা কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়। বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পর্যাপ্ত থাকা অর্থনীতির সবলতার নিদর্শন। কোনো দেশের ঋণমান সূচক ইতিবাচক থাকলে তা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও রিজার্ভের জন্য ভালো। কিন্তু আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ফিচ রেটিংসের মূল্যায়নে বাংলাদেশের ঋণমানে আরো এক ধাপ অবনমন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত রেটিংসে বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি ইস্যুয়ার ডিফল্ট রেটিং (আইডিআর) ‘বিবি মাইনাস’ থেকে ‘বি প্লাস’-এ অবনমন করা হয়েছে। তবে দেশের অর্থনীতি সম্পর্কিত পূর্বাভাস স্থিতিশীল রেখেছে ফিচ রেটিংস। ফিচের ঋণমান অবনমনে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক আরো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়বে। তাই ঋণমান উন্নয়নে সরকারের জোরালো পদক্ষেপ কাম্য। 

এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের ঋণমান ‘বিবি মাইনাস’-এ অবনমন এবং গত ডিসেম্বরে নেতিবাচক পূর্বাভাস বহাল রেখেছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে বিদেশী ঋণ ও তারল্য পরিস্থিতি আরো প্রতিকূলে গেলে এ ঋণমান আরো কমবে। এতে দেশের রিজার্ভে ও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে আরো চাপ বাড়বে। 

এদিকে দুই বছর ধরে কমছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বেঁধে দেয়া লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও আগামী কয়েক মাস বাংলাদেশের রিজার্ভ স্থিতিশীল থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন রেটিং এজেন্সি মুডি’স। সম্প্রতি প্রকাশিত মুডি’সের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গত জানুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার পর ব্যবসায় অনিশ্চয়তা ধীরে ধীরে কমতে থাকার পাশাপাশি আমদানি বিধিনিষেধ চলমান থাকায় চলতি অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স ইতিবাচক হয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ দেয়া চলমান রাখায় রিজার্ভে এ ইতিবাচক দিক দেখা যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী মুডি’স, এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ রেটিংস—মার্কিন এ তিন প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত ঋণমানের গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি। যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক শক্তি, বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যে এ তিন প্রতিষ্ঠানের দেয়া ঋণমানের প্রভাব পড়ে। বিশ্বের তিনটি ঋণমান নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠান গত এক বছরে বাংলাদেশের ঋণমানের অবনমন করেছে। 

এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ফিচ রেটিংস বাংলাদেশের ঋণমান ‘বিবি মাইনাস’-এ অবনমন এবং গত ডিসেম্বরে নেতিবাচক পূর্বাভাস বহাল রেখেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে ফিচ বলছে, ঋণদাতাদের সঙ্গে অনুকূল শর্তের কারণে বাংলাদেশের বিদেশী ঋণ পরিস্থিতি এখনো সহনীয় পর্যায়ে। সরকারের ঋণও গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে আছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির আওতায় গৃহীত সংস্কারের কারণে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উন্নতি ঘটাবে এবং ব্যাংক খাতের সমস্যা ঠিক করবে। মধ্যমেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হবে বলে প্রত্যাশা করছে ফিচ রেটিংস। এ কারণে সংস্থাটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস স্থিতিশীল রেখেছে।

ঋণের দিক থেকে ভালো অবস্থানে রয়েছে দেশ। কিন্তু রাজস্ব আয়ে পিছিয়ে রয়েছে। দেশের রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত এখন ৮ দশমিক ২ শতাংশ। এটাকে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব দুর্বলতা হিসেবে বলছে ফিচ রেটিংস। রাজস্ব আদায়ে আরো জোরালো পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেটিং ক্রমাগত অবনমন ঘটতে থাকলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগ করতে আকৃষ্ট হবেন না। বর্তমানে আর্থিক হিসাবে যে ঘাটতি রয়েছে তা থেকে সহজে উত্তরণ ঘটবে না। বিদেশী বিনিয়োগ না থাকলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে পড়বে। দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে না পারলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে না। ফলে আইএমএফ রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা কমালেও দেশের প্রয়োজনেই রিজার্ভের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক উন্নতি করতে হবে। সরকার যদি বাজারভিত্তিক সুদহার ও বিনিময় হার বজায় রাখে তাহলে মূল্যস্ফীতি কমে আসার পাশাপাশি রিজার্ভে উন্নতি হবে। এছাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের নীতি শৈথিল্য দেখানো যাবে না। নীতি শৈথিল্যের কারণেই দেশের অর্থনীতিতে এ সংকট বিরাজ করছে। 

চলমান সংকট যতটা না বাইরের কারণে, তার চেয়ে অনেক বেশি অভ্যন্তরীণ কারণে। কাঠামোগত ঘাটতি, সমন্বয়হীন পরিকল্পনা, আর্থিক অব্যবস্থাপনা, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অভাব—এ সবকিছু আমাদের অর্থনীতির ভিত্তিকে ভঙ্গুর করে ফেলেছে। বর্তমান সংকটের ধরনটাকে পর্যালোচনা করতে হবে। কিছু ঝুঁকির প্রভাব দৃশ্যত ও বিচ্ছিন্নভাবে খুবই ছোট ও তাৎপর্যহীন মনে হলেও এদের সম্মিলিত ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ। 

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং বিদেশে টাকা পাচারকারীরা এতই ক্ষমতাঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী যে তাদের আইনের আওতায় আনা যায় না। দুর্নীতি, একচ্ছত্র ক্ষমতা ও জনতুষ্টিবাদ—এ রকম অনেক কারণ সম্মিলিতভাবে শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের মতো অনেক দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য দায়ী। বাংলাদেশকে অবশ্যই সেই পথ এড়িয়ে চলতে হবে। সংকটের আগাম লক্ষণ নির্দেশকারী আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোর রেটিং অবনমন উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। 

ফিচের পূর্বাভাস ও রেটিংয়ের অবনমন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অস্থিতিশীলতা, বিশৃঙ্খলা ও ভঙ্গুরতাকেই নির্দেশ করছে। বিশেষত বিনিয়োগ না হওয়া, রফতানি বাণিজ্যে বৈষম্য ও ক্রমবর্ধমান ঘাটতি, ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারের কারণে দেশের অর্থনীতি দুর্বল হচ্ছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা, মানুষের আয় কমে যাওয়ার মধ্যেও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বহ করে তুলেছে। আমদানি-রফতানি বাণিজ্য বৈষম্য বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ায় রিজার্ভের স্থিতি দ্রুত কমে গিয়ে আমদানি সক্ষমতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। 

ডলার সংকটের কারণে আমদানিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা ও আস্থার সংকট এখন অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে তলানিতে এনে দাঁড় করিয়েছে। দেশে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না হওয়ার পেছনের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ কাম্য। ফিচের রেটিংয়ে ঋণমান কমে যাওয়া বাজেট ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নতুন প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গণ্য হতে পারে। বৈদেশিক বাণিজ্য ও ঋণের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কারণে ঋণদাতারা সুদের হার বাড়িয়ে আরো কঠিন শর্ত আরোপ করতে পারে। আইএমএফের শর্তের কারণে ব্যাংক ঋণে সুদের হার বৃদ্ধি, বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানো এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে মূল্যবৃদ্ধির চক্রে মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে জনজীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। 

অর্থ পাচারসহ দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের নিবিড় যোগসূত্র বিদ্যমান। দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, সামাজিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনৈতিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার বাস্তবে কঠিন হয়ে পড়বে। সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা নিশ্চিত করতে সর্বক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রয়োজন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির প্রয়োগ নিশ্চিত ও দৃশ্যমান করতে হবে।

ফিচের বাংলাদেশের ঋণমান অবনমন একটি সতর্কবার্তা। সংস্থাটি দেশের অর্থনীতির যেসব দুর্বলতা তুলে ধরেছে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ একান্তভাবে প্রত্যাশিত। আর্থিক ও ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। ঋণমান উন্নয়নে আর্থিক ও ব্যাংক খাতে যথাযথ সংস্কার ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে অর্থনীতি হুমকিতে পড়বে, যা এ মুহূর্তে কাম্য নয়।