ড. মাহবুবুল হাসান সিদ্দিকী অণুজীববিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য গবেষক। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটি থেকে এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড পাবলিক হেলথ মাইক্রোবায়োলজির ওপর পিএইচডি করেছেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সাবেক প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এবং বর্তমানে সহযোগী অধ্যাপক। তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংক্রামক রোগ ও তাদের প্রতিকার নিয়ে অসংখ্য গবেষণায় যুক্ত।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল ফাতাহ মামুন
প্রথমেই আপনার কাছে জানতে চাই ডেঙ্গু রোগের ক্ষেত্রে বড় সমস্যাটি আসলে কী?
ডেঙ্গু নিয়ে আমরা যারা কাজ করছি, আমাদের সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো ঢাকার পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও সারা দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু উপদ্রব ছড়ানো এক ব্যাপার, আর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হওয়া ভিন্ন ব্যাপার। দেখুন, ভাইরাস বা অন্য জীবাণু বহন না করলে মশার কামড় খুব বড় সমস্যা নয়। এমনকি ডেঙ্গুতে শুধু জ্বর হওয়া নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তার কারণ নেই। কারণ এটি একা একাই সেরে যায়। জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা হলো, ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে জটিলতা তৈরি হওয়া কিংবা মারা যাওয়া। এখন দেখুন, ডেঙ্গুতে দুই কারণে জটিলতা সৃষ্টি হয়—হেমোরেজিক ডেঙ্গু হলে অথবা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হলে। ডেঙ্গু হেমোরেজিকে মারা যাওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। সবচেয়ে বেশি মারা যায় শক সিনড্রোমে। এটাকে আমরা ইন্টারনাল লিকেজ বলি। বডির ভেতর প্লাজমা লিকেজ হতে থাকে। লিকেজ হয়ে টিস্যুতে চলে আসে। এ প্রক্রিয়া বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। ফলে শেষ সময়ে রোগীর বাঁচার আশা থাকে না। ততক্ষণে রোগীর ব্লাড প্রেশার ফল করে, বডিতে অক্সিজেন সার্কুলেশন কমে যায়, লিভার, কিডনি, ফুসফুস, হার্ট এগুলো ফেইলিউর হয়ে যায়।
শক সিনড্রোম কিংবা প্লাজমা লিকেজের ঝুঁকি তৈরি হয় কখন?
ডেঙ্গু বলতে সাধারণত একটা জ্বর বোঝানো হলেও আক্রমণকারী ভাইরাসটির চারটি আলাদা ধরন (সেরোটাইপ) আছে, যারা DENV 1-4 বা সহজ করে টাইপ ১ থেকে ৪ পর্যন্ত নামে পরিচিত। ডেঙ্গু ভাইরাসের এ চার আলাদা টাইপের বৈশিষ্ট্য কিছুটা ভিন্ন। প্রতিটি সেরোটাইপের মধ্যে আবার ভিন্ন ভিন্ন জেনোটাইপ হতে পারে। এখন একজন ব্যক্তি ভাইরাসের কোন টাইপে আক্রান্ত হচ্ছে তার ওপরই নির্ভর করছে রোগী ঝুঁকিতে আছে কি নেই। মনে করুন, কেউ টাইপ-৩ দিয়ে প্রথমবার আক্রান্ত হলো। পরবর্তী সময়ে বাকি জীবনে সে টাইপ-৩ দিয়ে আক্রান্ত হলেও তার সাধারণত কোনো ঝুঁকি নেই। কারণ তার ভেতর লাইফ-লং ইমিউনিটি তৈরি হয়ে গেছে। এই যে দীর্ঘস্থায়ী অ্যান্টিবডি তৈরি হলো—এর সুবিধা যেমন আছে অসুবিধাও আছে। সুবিধা হলো, একই টাইপে যতবার আক্রান্ত হবে কোনো অসুবিধা হবে না। আর অসুবিধা হলো, একবার এক টাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুর অন্য কোনো টাইপে যদি আক্রান্ত হয় তাহলে তার ভেতর যে অ্যান্টিবডি ছিল সেটা এ নতুন টাইপের ডেঙ্গু ভাইরাসের সঙ্গে অল্প মাত্রায় বাইন্ড করবে। এ অল্প মাত্রায় বাইন্ড করাটা প্রটেকশন দেয়ার বদলে বরং অ্যান্টিবডি ডিপেনডেন্ট এনহ্যান্সমেন্টের মতো সিরিয়াস রিয়েকশন তৈরি করে। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভেতরে ভেতরে ব্লাডের প্লাজমা লিক হয়ে টিস্যুতে ঢুকে যায় এবং দ্রুত রোগীকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়।
তার মানে দ্বিতীয়বার যারা ডেঙ্গুর প্রথমবারের থেকে ভিন্ন কোনো টাইপে আক্রান্ত হয়েছে তারাই শুধু ঝুঁকিতে আছে?
ঠিক তাই! প্রথমবার যারা আক্রান্ত হচ্ছে তাদের জন্য তেমন দুশ্চিন্তার কারণ নেই। তাহলে আমাদের জানতে হবে কারা কারা আগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে এ-সংক্রান্ত রিসার্চ ডাটা খুবই কম হওয়ায় আমরা জানতেই পারছি না কারা কারা বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে। কিন্তু সারা দেশের চিত্র বোঝার জন্য যে একটা মাত্র রিসার্চ হয়েছিল ২০১৪-১৫ সালে, তখনই ঢাকা আর চট্টগ্রামের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষের রক্তে ডেঙ্গুর অ্যান্টিবডি পাওয়া গিয়েছিল, যা অতীতে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হওয়াকে ইঙ্গিত করে। এখন ২০২৩ সালে (বিশেষ করে ২০১৯-এর মহামারীর পর) ডেঙ্গুতে অতীতে আক্রান্ত মানুষের অনুপাত নিশ্চয়ই আরো বেশি হবে। এটি এখন ৯০-৯৫ শতাংশ হলেও অবাক হব না। এ থেকে বোঝা যায়, ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের একটি বিরাট জনগোষ্ঠী বিরাট ঝুঁকির মধ্যে আছে। কিন্তু এটি নির্ভর করবে রোগীরা সামনে ভাইরাসের কোন টাইপ দিয়ে আক্রান্ত হবে তার ওপর। তাই ডেঙ্গুতে জটিলতা বা মৃত্যু কমাতে ভাইরাসের টাইপের দিকে বিশেষ নজর দেয়ার কোনো বিকল্প নেই।
কিন্তু আমাদের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা তো মশাকেন্দ্রিকই। ভাইরাস নিয়ে কাজ হয়েছে এমনটা শুনতে পাইনি।
আমাদের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গে যদি আসি তাহলে প্রশ্ন করব—আমাদের উদ্দেশ্য কী? আমরা কী চাই? আমরা চাই মানুষ যেন মারা না যায়। এটাই তো? মশা মানুষকে কামড়াবে না বা মানুষের জ্বর হবে না—এটা একটা অবাস্তব টার্গেট। কেননা মশা যেমন পুরোপুরি নির্মূল করা যাবে না তেমনি জ্বর-সর্দির মতো মৌসুমি অসুখগুলোও একেবারে বন্ধ করা যাবে না। এখানে বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা হলো—মশা যেন ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার মতো কোনো সংক্রামক জীবাণুর বাহক না হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় যারা আছে, যেমন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইইডিসিআর, সিটি করপোরেশন—সবার ফোকাস মশার দিকে। আমি মনে করি, শুধু মশাকে টার্গেট করে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা আসলে ভুল টার্গেট সিলেক্ট করার মতো। পৃথিবীর কোনো দেশ পুরোপুরি মশা নির্মূল করতে পেরেছে—এমনটা শুনেছেন কখনো? আর বাংলাদেশের মতো রিসোর্স লিমিটেড, অপরিচ্ছন্ন এবং অপরিকল্পিত পরিবেশ-ব্যবস্থাপনার একটা দেশের প্রেক্ষাপটে এটা একেবারেই আকাশকুসুম কল্পনা। বাংলাদেশের আবহাওয়াই মশার জন্য উপযোগী। মশা সংখ্যায় এত বেশি এবং এত ব্যাপক জায়গায় জন্ম নিচ্ছে যে শুধু মশক ব্যবস্থাপনায় জোর দিয়ে ডেঙ্গু নির্মূল সম্ভব নয়।
আমি বলছি না মশা নিধনের চলমান কার্যক্রমগুলো ভুল। বরং বলতে চাচ্ছি, এ কার্যক্রমগুলো সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে সেসব জায়গায় পরিচালনা করা উচিত যেখানে ভাইরাসের অস্তিত্ব আছে। আর এটি করা উচিত ডেঙ্গু মৌসুমের একেবারে শুরুর দিকে ভাইরাসটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই। আমরা কিন্তু করোনা মহামারীর সময় ঠিক এ কাজটাই করেছি। যেসব এলাকায় মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, সেসব এলাকা বা বাড়িকে ঘিরে ম্যানেজমেন্ট করা হয়েছে। তাই যদি হয়, তাহলে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে ভাইরাসকে একেবারে ইগনোর করে অন্ধের মতো শুধু মশার পেছনে সামর্থ্যের প্রায় পুরোটা ব্যয় করা হচ্ছে কেন, যেখানে মশা পুরোপুরি নির্মূলযোগ্য নয়? অথচ আমরা মাত্রই আলোচনা করলাম ডেঙ্গুতে জটিলতা বা মৃত্যুর পেছনে মূল কারণ ভাইরাসের টাইপের ভিন্নতা, যে সম্পর্কিত তথ্য একেবারেই অপ্রতুল।
আপনি বলতে চাচ্ছেন, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও ভাইরাসের প্রতি ফোকাস করা উচিত?
অবশ্যই। মশক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ভাইরাস ব্যবস্থাপনায় নজর দেয়ারও সময় এসেছে। নয়তো সামগ্রিকভাবে মৃত্যু কমানো সম্ভব নয়। ডেঙ্গু আসে মৌসুমের একটা নির্দিষ্ট সময়ে। শুরুতেই কিন্তু ডেঙ্গু সারা দেশে ছড়ায় না। ছোট ছোট লোকাল ক্লাস্টার দিয়ে শুরু হয়, ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে এ ভাইরাস আসে কোথা থেকে? হয় আগের মৌসুমের ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী মশার ডিম থেকে অথবা পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী আমাদের দেশে প্রবেশ করার মাধ্যমে। এ দুই ক্ষেত্রেই শুরুতে সমস্যাটির ধরন থাকে ভাইরাসকেন্দ্রিক, স্থানীয় এবং ছোট আকারের। এ অবস্থায় ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিশেষ করে শুরুর দিকে আপনি কি সারা ঢাকার মশার পেছনে ছুটবেন নাকি কোথায় কোথায় ভাইরাস আছে তা খুঁজে বের করার দিকে মনোযোগী হবেন? কোন কোন জায়গায় এডিস মশার ভাইরাস বহনকারী ডিম/লার্ভা আছে সেটা খুঁজে বের করা, আর বিমানবন্দর বা স্থলবন্দরগুলোয় জ্বর নিয়ে যারা দেশে প্রবেশ করবে, বিশেষ করে ডেঙ্গুপ্রবণ দেশগুলো থেকে, তাদেরকে বন্দরগুলোতেই ডেঙ্গুর র্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট করে আক্রান্ত মানুষকে আলাদা করতে পারলেই পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হতে পারে বলে মনে করি। নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় কিন্তু ঠিক এ ধরনের কাজই করা হয়েছিল। মোট কথা, মৌসুমের শুরুতে যেখানেই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যাবে সেখানেই মশা নির্মূলে আমাদের সর্বোচ্চ প্রয়াস দিতে হবে।
ভাইরাস মনিটরিং এবং ম্যানেজমেন্টের কাজ কে করবে?
খুবই দুঃখজনক একটি প্রশ্ন। এ নিয়ে বাইরে থেকে আমরা যা বুঝি তাতে মনে হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআরের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা আছে। আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভেতর সিডিসি নামে আরেকটা সেল আছে। সিডিসি হলো কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল, যা আছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে। আইইডিসিআর সারা দেশের রোগতত্ত্ব নিয়ে মনিটরিং, সার্ভিল্যান্স এবং গবেষণা করার কথা। কিন্তু বাস্তবে মহামারীর মতো পরিস্থিতিতে রোগের সার্ভিল্যান্স এবং ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে কার কাজ কী, সেটা বাইরে থেকে অনেক সময় পরিষ্কার বোঝা যায় না। ডেঙ্গু আক্রান্তের তথ্য এর একটা উদাহরণ। কেন এখন পর্যন্ত সারা দেশে, এমনকি ঢাকা শহরেই, খুবই অল্প সংখ্যক হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিদিন প্রচার করা হচ্ছে? বাকি সব হাসপাতালের তথ্য করোনার সময় খুব সহজে সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে কেন করা হচ্ছে না? এ প্রশ্নের কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা অনুপস্থিত।
তার সঙ্গে উল্লিখিত তিন সংস্থাতেই স্বাস্থ্য খাতে নীতিনির্ধারণের জন্য চিকিৎসকদের বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষকদের যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। অথচ মাইক্রোবায়োলজি, ভাইরোলজি বা অ্যান্টোমোলজির মতো ক্ষেত্রে এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বহু প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী এবং গবেষক আছেন যাদের যুক্ত করা গেলে স্বাস্থ্য গবেষণা এবং ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা এক লাফে অনেকখানি বেড়ে যেত। এসব সীমাবদ্ধতার সন্মিলিত প্রভাবেই হয়তোবা সারা পৃথিবীতে ডেঙ্গুতে আমাদের দেশে মৃত্যুহার বেশি। এটা খুবই দুঃখজনক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশন তো ডেঙ্গু নির্মূলে কাজ করছেই
আমি আগেই বলেছি, এডিস মশা নিধনের জন্য চেষ্টা করা আর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা দুটি ভিন্ন ব্যাপার। ডেঙ্গুর তিনটি উপাদান আছে। একটি হলো স্বয়ং ডেঙ্গু ভাইরাস। বাকি দুটি হলো ভাইরাসের বাহক এডিস মশা ও ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষ। ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগীকে চিকিৎসা দেয়ার জন্য গাইডলাইন তৈরি করা এবং চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজগুলো করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সিটি করপোরেশন করছে ভাইরাসের বাহক মশা নিধনের কাজ। কিন্তু স্বয়ং ভাইরাস নিয়ে বলার মতো পর্যাপ্ত কাজ হচ্ছে না, যদিও মলিকিউলার এপিডেমিওলজির কাজটি আইইডিসিআরের করার কথা। শুধু হাতেগোনা কিছু বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্র ছাড়া সারা দেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের কোনো টাইপ কোথায় ছড়াচ্ছে সে তথ্য জানা যাচ্ছে না। যেটুকু জানা যাচ্ছে তা দিয়ে সারা দেশের চিত্র কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই। অথচ ডেঙ্গু মহামারীর ব্যাপকতা বা সিরিয়াস ইনফেকশনের পেছনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে নতুন সেরোটাইপের রি-ইমার্জেন্স, যেমনটা ২০১৯ সালে টাইপ-৩ ডেঙ্গু ভাইরাসের কারণে হয়েছিল। ভয়ের বিষয় হচ্ছে, এবার আবার টাইপ-১ ও টাইপ-৪ বেশি রি-ইমার্জ (পুনঃআগমন) করতে পারে। তাই যদি হয়, তাহলে পরিস্থিতি অনেকটাই খারাপ হবে। কারণ বিশেষ করে টাইপ-১ কয়েক বছরে খুবই কম দেখা গেছে।
আগেই বলেছি, ডেঙ্গু একটা মৌসুমে ছড়িয়ে পড়ে। মৌসুমের শুরুতেই যদি এবার কোন ভাইরাস ছড়াবে বা ছড়াচ্ছে সেটা ল্যাব টেস্ট করে জানিয়ে দেয়া যেত, তাহলেই কিন্তু অনেকখানি এগিয়ে যাওয়া যেত। এটা খুব কঠিন কাজও নয়। মশার লার্ভার প্রাক-মৌসুমি জরিপ যখন করা হয় তখন নমুনাগুলো ল্যাবে নিয়ে টেস্ট করা যায় যে ওই নমুনাগুলোয় ভাইরাস আছে কিনা, আর থাকলে কোন টাইপের। এর ফলে কী হবে, ভাইরাসের উপস্থিতি যেসব জায়গায় পাওয়া যাবে সেসব জায়গায় মশা নির্মূলের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। তার সঙ্গে আগে থেকেই ধারণা পাওয়া যাবে যে সামনে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কেমন হতে পারে, যেটাকে আমরা আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম বলে থাকি। চিকিৎসকদেরও সেভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা যাবে। ভাইরাস নিয়ে এ কাজের উদ্দেশ্য কিন্তু এটা নয় যে কেউই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবে না। বরং উদ্দেশ্য হলো মৃত্যুঝুঁকি কমানো। শুরুতেই বলেছি, জ্বর হওয়া বা মশা কামড়ানোর চেয়ে আমাদের জন্য বড় টার্গেট মৃত্যু ঠেকানো।
মলিকিউলার এপিডেমিওলজি সার্ভে কখন করা উচিত বলে মনে করেন?
সামনে কয়েক মাস পর ডেঙ্গু রোগী ধীরে ধীরে কমে যাবে। মানুষের মধ্যে যখন ডেঙ্গু জ্বর থাকে না, তখন ভাইরাসটা কোথায় থাকে? মজার ব্যাপার হলো, লার্ভার মধ্যেও ডেঙ্গু ভাইরাস লুকিয়ে থাকতে পারে। মলিকিউলার এপিডেমিওলজি তখনই করা উচিত। সব এডিস মশার ভেতরে ডেঙ্গু ভাইরাস থাকে না। তাই সব লার্ভার ভেতরও ডেঙ্গু থাকে না। আমরা ভাইরাসের প্রতি এজন্যই জোর দিচ্ছি, এটা সংখ্যায় কম, তাই এটা নিয়ে কাজ করাও সহজ। যেমন এখন ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা মুগদা মেডিকেলে। কারণ ওই এলাকায় ডেঙ্গু ভাইরাসের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। কুর্মিটোলায় এখনো হাসপাতালে খালি শয্যা পাওয়া যাবে। শুনেছি ডিএমসিতেও শয্যা খালি আছে। তার মানে বোঝা যাচ্ছে, ডেঙ্গু একটা এলাকাভিত্তিক সমস্যা। শুরুতে লোকাল থাকলেও পরবর্তী সময়ে এটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতেই যদি এটা স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেত তাহলে কিন্তু পুরো ঢাকায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ত না। এখন কী হচ্ছে? আমরা ভাইরাস নিয়ে কাজ না করে বসে থাকি কখন ভাইরসাটা ছড়িয়ে পড়বে, মানুষ আক্রান্ত হবে, সারা দেশে হইচই শুরু হবে। এরপর শুরু হয় আমাদের কর্মযজ্ঞ। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় না ডেঙ্গু কমানো যাবে, না মশা কমানো যাবে। এটা আমাদের জন্য একেবারেই কার্যকর পদ্ধতি নয়।










