ড. সাহাব এনাম খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের রিসার্চ ডিরেক্টর। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তানীতি, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং মিয়ানমারের শরণার্থী সমস্যা, মাইগ্রেশন, ইন্দো-প্যাসিফিক জোনের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্সসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণ, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান, নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনীতিক টানাপড়েন ইত্যাদি নানা ইস্যুতে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

দেশে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পুরনো অনেক চুক্তি আছে। নতুন পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে?

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের কোনো স্পষ্টত অবনতি ঘটেনি। তবে ঘাটতি হয়েছে ভারতের দিক থেকে। কারণ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সে কারণে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে আওয়ামী লীগের অবস্থানটিই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিষয় নয়। ফলে গত সাড়ে ১৫ বছরে ভারত সবসময় বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের ওপরই কেন্দ্রীভূত ছিল। বাংলাদেশের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে ভারত বিভিন্ন তর্ক বা যুক্তির মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করেছে যে তারা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে যে ধরনের প্রস্তুতি বা রাজনৈতিক ক্যাপিটাল দরকার ছিল—সেখানে ঘাটতি অনুভব করেছে। তাই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি ভারতের যে পরিমাণ সৌহার্দপূর্ণ বা প্রাগম্যাটিক মনোভাব থাকা দরকার ছিল, শুরুতে তার অভাব প্রত্যক্ষ করেছি। ড. ইউনূসের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বা বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের যে ধরনের উষ্ণ সম্পর্ক প্রত্যক্ষ করেছি, ভারতের ক্ষেত্রে সেটি অনুপস্থিত ছিল। আমি মনে করি, ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসা জরুরি। সেটি শুধু বাংলাদেশ নয়, তার প্রতিবেশী সব দেশের সঙ্গেই। দিল্লির চেয়ে ঢাকার চিন্তাভাবনা এখন অনেক বিস্তৃত। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বহুমাত্রিক সম্পর্ক এবং বাংলাদেশ ভারতের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখছে। বাংলাদেশের মানুষ ভারতে ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, পড়াশোনা ও ট্যুরিজম উদ্দেশে যাচ্ছে। এমনকি আত্মিক সম্পর্কের কারণেও সেখানে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ভারতকে লাভবান করছে, বাংলাদেশ থেকে রেমিট্যান্সও যাচ্ছে। ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অস্থিতিশীলতা এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে। এ হিসেবে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ সম্পর্কে যে ধরনের বয়ান আছে, সেগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করা দরকার। তবে এক দলের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে সৃষ্ট দুর্বলতাটি দিল্লি এখন অনুধাবন করতে পারছে। সে কারণে ভারতের হাইকমিশনার এরই মধ্যে বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এটি একটি ভালো দিক। তবে দেশের আরো যেসব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের জায়গা তৈরি করা তাদের জন্য প্রয়োজন।

ট্রানজিট ও তিস্তা চুক্তিসহ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত অনেক ইস্যু আছে, সেগুলো কীভাবে সুরাহা করা যায়?

বাংলাদেশের আইন বা সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকগুলো কিন্তু সংসদে আলোচনা হওয়ার কথা, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঘাটতি আছে। এখন অন্তর্বর্তী সরকার যদি মনে করে সেসব চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক পাবলিক পর্যালোচনার জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে সাধারণ মানুষ তাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো তুলে ধরতে পারবে। মনে রাখা দরকার যে বর্তমান সরকার কিন্তু জনগণের সরকার। সরকার পতনের পর ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট বেড়ে যাচ্ছে তা থেকে বের হওয়ার জন্য চুক্তিসংক্রান্ত যেসব নথিপত্র (ডকুমেন্ট) আছে সেগুলো পর্যালোচনা করা দরকার। পররাষ্ট্র উপদেষ্টাও বারবার বলেছেন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমসম্পর্ক (ইকুয়াল হ্যান্ডেড) হওয়া দরকার। সমসম্পর্ক করতে হলে এ বিষয়গুলো ভারতের সঙ্গে আরো খোলামেলা ও বাস্তবসম্মত আলোচনা হওয়া দরকার। যেমন তিস্তার পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রস্তাবনা আছে সেগুলো পর্যালোচনা করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করা জরুরি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি ভারত তার জাতীয় স্বার্থে যা যা দরকার তা করবে। দীর্ঘদিন ধরেই এ সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে ভারত যদি আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসরণ করে তাহলে তাদের রাজ্য-কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তা প্রশমিত হবে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারত প্রায়ই প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার করছে। এ ইস্যু নিয়েও ভারত-বাংলাদেশ বিস্তর আলোচনা হয়েছে এবং ভারত প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করবে না বলে বার বার বলেছে। কিন্তু প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এর বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটতে দেখা গেছে। ইস্যুটি সমাধানের ক্ষেত্রে দুই দেশকেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশ-ভারতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিরাপত্তাগত সম্পর্ক। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল অস্থিতিশীল হলে তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। ভারতের অর্থনীতি স্থিতিশীল না থাকলে তার প্রভাবও বাংলাদেশে পড়বে। সুতরাং পুরনো বাংলাদেশের স্থিতিশীলতাকেন্দ্রিক ন্যারেটিভ থেকে বের হয়ে এসে ভারতের স্থিতিশীলতার বিষয়টি ভাবা দরকার।

৫ আগস্ট নিয়ে দিল্লির যে অবস্থান বা বোঝাপড়া এবং ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে ক্ষমতাসীন বিজেপি জোট সরকারের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। নয়াদিল্লির প্রতিবেশী নীতির গলদ কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ভারত ও দিল্লিকে একটু আলাদা করে দেখা দরকার। সর্বভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও জটিল। যদি দিল্লির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় তাহলে যেসব ক্ষমতাসীন দল রয়েছে তাদের একটি স্পষ্ট এজেন্ডা বা স্বার্থ আছে। এটি নিয়ে তারা কোনো দ্বিমতও করে না। দিল্লির শাসকদের জন্য ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কিন্তু এটি ছিল না। ফলে এখানে একটা বিস্তর পার্থক্য আছে। বাংলাদেশে প্লুরালিজম বরাবরই ছিল। সম্পূর্ণ রাষ্ট্র ব্যবস্থাই সমতার দর্শনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বাংলাদেশের সংবিধান বা সামাজিক ব্যবস্থায় সবাইকে সমান অধিকার দেয়া হয়েছে। পশ্চাৎপদ, ধর্ম বা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভিত্তিতে ডিস্ক্রিমিনিট করার সুযোগ নেই। এটাও সত্য যে ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ। তাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত কার্যকর। সে কারণে ভারতের একটি শক্ত জায়গা তৈরি হয়েছে। বিজিপি সরকার সাধারণ মানুষের সমর্থনে ক্ষমতায় আছে। ভারতের রাজনীতিতে বাংলাদেশকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে সংখ্যালঘু দ্বন্দ্বে সব শেষ হয়ে গেছে। আবার ভারতের মিজোরাম কিংবা মণিপুর অঞ্চলে মুসলমান বা ক্রিশ্চিয়ান বিষয়ে ভারতের জনগণের যে খুব স্বস্তিকর কোনো সূচক আছে তা কিন্তু নয়। প্যারাডক্স বলা যায়। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু বা বাংলাদেশী অবৈধ অভিবাসন ইস্যুটি ভারতের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দিয়ে আঞ্চলিক ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ডাইভারশন প্রদর্শন হয়ে থাকে। বিজিপির রাজনৈতিক দর্শনে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সংখ্যালঘু ইস্যুও গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় দিল্লির জন্য স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় সমস্যা হলো। আওয়ামী লীগ না থাকায় আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই দিল্লির সরকারে বিজেপির সম্পূর্ণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় তাদেরকে তার পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতার জন্য প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে। এটিকে প্রশমন করতে সংখ্যালঘু ইস্যুটিকে সামনে এনে সাধারণ মানুষের সামনে এর যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে। বিজেপির কাছে বাংলাদেশে সহস্রাধিক মানুষ হত্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা চীন সহস্রাধিক মানুষের হতাহতের কথা বললেও ভারত তা বলেনি। কারণ ভারতের জাতীয় স্বার্থে এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভারত তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় যা করার সেটি করবে, এটাই বাস্তবতা। ভারতীয় গণমাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে যেন বাংলাদেশে কেবল সংখ্যালঘু নিপীড়নই হচ্ছে। তারা এ বিষয় বুঝতে চায় না যে বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সবাই সমান ও এক। এ দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তারা বাংলাদেশী।

চীন বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার। ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোন দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে করছেন?

পৃথিবীতে আমরা এখনো এমন একটি ভূরাজনীতিতে বসবাস করছি যেখানে দুটি প্রধান শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। যুক্তরাষ্ট্র যখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে চায় তখন অনেকেই তাদের স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আবার চীনের ক্ষেত্রেও এ রকম বয়ান আছে। দিনশেষে এ দুটিই বিশ্বে পরাশক্তি। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন অটুট রাখা দরকার তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও। চীন বাংলাদেশের বড় সরবরাহকারী দেশ। বিগত সরকার তার শাসনামলের গত জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্য সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রথমে ভারতে, পরে চীন যাওয়ায় এ ভারসাম্য নষ্ট হয়। আমি মনে করি, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বা ভবিষ্যতে যারাই আসবে তাদের উচিত জাতীয় স্বার্থের নিরিখে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।

অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার স্বার্থে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করা দরকার। সামনে সার্কের প্রধান একটি জোট (ব্লক) হিসেবে দাঁড়ানোর কোনো সম্ভাবনা দেখছেন?

সার্ক বা বিমসটেক দুটোই বাংলাদেশের খুব কাছের সংস্থা। আর সার্কের ধারণা বাংলাদেশ থেকেই উৎপত্তি লাভ করেছে। বিমসটেকের সদর দপ্তরও বাংলাদেশে। সার্ককে যদি যথাযথ ব্যবহার করা হতো তাহলে প্রত্যেক সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যেই অর্থনীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে আন্তঃনির্ভরশীলতা তৈরি হতো। দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অবিশ্বাস কমে যেত। নিরাপত্তা ঘাটতি পূরণ ও কাজ করতে পারত। সর্বোপরি অর্থনৈতিক কানেকটিভিটিতে প্রত্যেকটি দেশই লাভবান হতো। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় জলবায়ু, স্বাস্থ্য ও পানিসম্পদ রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে। এর সদস্য দেশগুলোর জনসংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় অর্থনীতি ও এর বাজার অনেক বড়। আন্তঃআঞ্চলিক অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাজার তৈরি করা গেলে এসব দেশের অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা লাঘব হতো। কিন্তু ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কের বলি হলো সার্ক। আমি মনে করি, অর্থনৈতিক জায়গাগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে সার্ককে শক্তিশালী করতে হবে। সন্ত্রাসবাদের ধোয়া তুলে সার্ককে দুর্বল করে রাখা নিতান্তই স্বল্প রাজনৈতিক স্বার্থকেন্দ্রিক চিন্তার ফল। সারা বিশ্বেই তো সন্ত্রাসবাদ আছে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় পারস্পরিক সহযোগিতা দরকার। বৃহৎ অর্থনৈতিক কল্যাণের কথা চিন্তা করলে সার্ক বা বিমসটেকের মতো প্রতিষ্ঠানের দিকে যেতেই হবে। আসিয়ান নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা দরকার।

বিশ্বমঞ্চে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অত্যন্ত সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ও বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তার সমীকরণ আমরা আবার দেখেছি। বাংলাদেশ এ সুযোগকে কীভাবে কাজে লাগাতে পারে?

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ড. ইউনূসের যে অসাধারণ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। এতে বাংলাদেশের সুবিধা সবদিক থেকেই। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বাড়বে। তিনি যেসব সংস্কার কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছেন, সেগুলোও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ থেকে যেসব অর্থ পাচার হয়েছে সেগুলো ফিরিয়ে আনা, সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ও বিচার ব্যবস্থাকে সংস্কার করা—এগুলো বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সম্পর্ক ও যোগাযোগকে আরো বেগবান করবে। তবে যত তাড়াতাড়ি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়া যাবে তত বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল। দিনশেষে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সমাজই পারে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে। ড. ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদ সংস্কারের পরিধি কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারবেন তার অনেকটাই নির্ভর করবে দেশের রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতির ওপর। ড. ইউনূস আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশকে যে পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন তা কল্পনাতীত। কিন্তু আমাদের আরেকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, ড. ইউনূসের যে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, সেটাকে বাস্তবায়ন করার জন্য যে ধরনের মানবসম্পদ ও রাজনৈতিক মতৈক্য দরকার তার জন্য সবারই একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।

ড. ইউনূসের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে তাতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মাত্রা কোন দিকে যাচ্ছে?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দুটি প্রিজম দিয়ে দেখতে হবে। এক. বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক; দুই. সরকারের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক সব সূচকেই অত্যন্ত ভালো। সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যাবে, গত ১৫ বছরের প্রত্যেক নির্বাচনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে এক ধরনের নেগেটিভ ন্যারেটিভ তৈরি করা হতো। দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পায় সেগুলো হলো মানবাধিকার ও গণতন্ত্র। অনেকেই দাবি করেন ওয়াশিংটন কখনো কখনো দ্বিমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে। কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি কী হবে তা ওই দেশই নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কাঠামো কী ধরনের হবে সেটা আমাদেরই নির্ধারণ করতে হবে। সামনে যা-ই হোক না কেন, আমি মনে করি, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে আরো দৃঢ় হওয়া প্রয়োজন। ওয়াশিংটনেরও উচিত হবে বাংলাদেশকে তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রের ভিত্তিতে না দেখা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সরকারের অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আরো বেশি সম্পৃক্ত করতে হলে সব ক্ষেত্রে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থাকে আরো শক্তশালী করতে হবে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের সহায়তা দিতে রাজি আছে। এখন এ সহায়তার কতটুকু নেয়া হবে এবং বাস্তবায়ন করা হবে সেটা একটি বিষয়। অনেকেই বলে থাকেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভূকৌশলগত স্বার্থ আছে। তবে পরাশক্তি হিসেবে দেশটির সে স্বার্থ থাকতেই পারে, ঠিক যেমন চীন, জাপান, মিয়ানমার বা ভারতের আছে। এক্ষেত্রে যদি দুই দেশের কমন স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয় তাহলে আমি মনে করি না, চিন্তার কিছু আছে। একই কথা চীনের বেলাতেও প্রযোজ্য।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতার জায়গাগুলো কোনগুলো?

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অ্যাসার্টিভ হওয়া খুব জরুরি। ন্যারাটিভ নিয়েও জোর দেয়া দরকার। বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের যে ডায়াসপোরা রয়েছে এবং দেশে যে বাজার আছে তাতে সবাই বিনিয়োগ করতে চাইবে। এজন্য সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পাশাপাশি দরকার দুর্নীতির মাত্রা একদম নিচে নামিয়ে আনা। গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি যথেষ্ট সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর গণতান্ত্রিক নীতিনির্ধারণের অভাবে এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেনি। তবে বাংলাদেশের সক্ষমতা আছে, সেটাকে কাজে লাগাতে হলে অ্যাসার্টিভ পররাষ্ট্রনীতিতে যেতে হবে। প্রতিরক্ষা ও সামরিক কূটনীতির সদ্ব্যবহার করতে হবে। কারণ বাংলাদেশর চতুর্দিকে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যু তৈরি হচ্ছে। সমুদ্রসম্পদকে টেকসই ইকোসিস্টেম ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পানি ব্যবস্থাপনাকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চিন্তা না করে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের অনেক বড় আমলাতন্ত্র বিদ্যমান। এটিকে ছোট করে কার্যকর করতে হবে। বেসরকারি খাতের আরো বিকাশের পাশাপাশি জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। অ্যাসার্টিভ পররাষ্ট্রনীতি থাকলে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক যেমন জোরদার হবে তেমনি বাণিজ্যও বিকশিত হবে। এক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত, প্রযুক্তিনির্ভর সুস্পষ্ট জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন জরুরি।