দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের ক্ষেত্রে (সিএমএসএমই) এনবিএফআইয়ের ভূমিকা প্রশংসনীয়। দেশের অর্থনীতির সুসামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সঠিক সময়ে ঋণের সহজলভ্যতা জরুরি। এক্ষেত্রে এনবিএফআই আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। কিন্তু এনবিএফআইগুলো যেন ঠিকভাবে ক্রিয়াশীল থাকতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। সদ্যপ্রণীত ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন ২০২৩-এর বেশকিছু ধারা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে এনবিএফআই খাতে। এক্ষেত্রে আমানতের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেয়া নিয়ে উদ্বেগ বেশি দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েছে এনবিএফআইগুলো।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে গত মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা (সিইও) বৈঠক করেছেন। সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এনবিএফআই খাত যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়টি দেখা হবে বলে আশ্বাস দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে থাকলে আমানতের সীমায় ছাড় দেয়া হবে বলেও এনবিএফআইগুলোর ঊর্ধ্বতনদের জানানো হয়। 

ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআই হলো এক ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান যারা সম্পূর্ণ ব্যাংকিং লাইসেন্স পায় না বা কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় না। এনবিএফআই মেয়াদি আমানত সংগ্রহ করে এবং বিভিন্ন মেয়াদে ঋণ বা বিনিয়োগ সেবা প্রদান করে। তবে ব্যাংকের মতো চাহিদা আমানত সংগ্রহ করতে পারে না এবং চাহিবামাত্র আমানতের অর্থ গ্রাহককে ফেরত দিতে পারে না, কারণ এখানে ক্যাশ বা নগদ কাউন্টার সুবিধা থাকে না। তাই এরা মেয়াদ পূর্তিতে বা নির্দিষ্ট সময় পর আমানত পরিশোধ করে। 

আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০২৩ অনুসারে কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ, যৌথ নামে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা কিংবা সময় সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার বেশি আমানত সংগ্রহের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সর্বশেষ বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে যাদের খেলাপি ঋণ ৮ শতাংশের মধ্যে থাকবে তাদের ক্ষেত্রে আমানতের সর্বোচ্চ সীমা প্রযোজ্য নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে যাদের খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে তাদের ক্ষেত্রে আমানত সংগ্রহে সর্বোচ্চ সীমার বিষয়ে ছাড় দেয়া হবে। অন্যদিকে যাদের খেলাপি ঋণ বেশি তাদের ঋণ আদায়ে বেশি জোর দিয়ে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের জন্য কাজ করতে হবে।

এছাড়া এনবিএফআইয়ের আমানতের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেয়ার পাশাপাশি ঋণের বিপরীতে জামানত, পরিচালকদের মেয়াদ, সম্পর্কিত পক্ষের শেয়ারধারণের সর্বোচ্চ সীমা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক থাকার মতো বিষয়গুলো নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এনবিএফআইগুলোর প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এসব বিষয়ে তাদের উদ্বেগ ও মতামত তুলে ধরেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এ খাতে যেন সার্বিকভাবে কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে সেদিকে লক্ষ রাখা হবে। 

আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকার বিষয়ে আশাবাদী হতে চাই। কারণ এনবিএফআই খাতকে দুর্বল রেখে দেশের অর্থনীতি এগোতে পারবে না। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী এক্ষেত্রে আমানতকারীদের নিরাপত্তা ও ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা অনুসারে সর্বোচ্চ আমানত সংগ্রহের সীমা বেঁধে দেয়ার বিষয়ে একটি ফর্মুলা তৈরি করা যেতে পারে। একইভাবে জামানতবিহীন ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেয়া হলেও এক্ষেত্রে কোন ধরনের সম্পদ জামানতের অন্তর্ভুক্ত হবে সেটিকে আরো স্পষ্ট করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে আমানতকারী ও ঋণের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ব্যবসায়িকভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়তে হবে না। বিদ্যমান আইনের মধ্যে থেকেই এর সমাধান করা সম্ভব। তবে নতুন আইন যেন এনবিএফআইয়ের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখে সেটিই কাম্য। 

জামানতবিহীন ঋণের বিষয়ে নতুন আইনে বলা হয়েছে, কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানি কোনো ব্যক্তিকে ১০ লাখ টাকা কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত পরিমাণের অধিক জামানতবিহীন ঋণ দিতে পারবে না। তবে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের ক্ষেত্রে (সিএমএসএমই) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। এ বিষয়ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তুলে ধরেছিল। এক্ষেত্রে সম্প্রতি অনুমোদন করা সিকিউরড ট্রানজেকশন (মুভেবল অ্যাসেট) আইন ২০২৩ আমলে নেয়া হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে জামানতবিহীন ঋণ নিয়ে নতুন আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে সমস্যায় পড়তে হতো সেটির সমাধান হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

তবে ব্যাংকের ক্ষেত্রে আমানত সংগ্রহের সীমা না থাকলেও এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে সেটি রয়েছে। এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য, এনবিএফআইগুলো স্বল্পমেয়াদে মানুষের কাছ থেকে আমানত নিতে পারে না, বিশ্বের অনেক দেশেই এ ধরনের নিয়ম রয়েছে। তাদের তহবিল সংগ্রহের উৎস ভিন্ন হওয়ার কথা। এটি সত্ত্বেও তাদের আমানত সংগ্রহের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কিন্তু এনবিএফআইয়ের আমানতের বিপরীতে কোনো ধরনের বীমা করা নেই। ফলে এক্ষেত্রে একটি নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে যায়। ব্যাংকের ক্ষেত্রে ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স থাকায় কোনো কারণে ব্যাংক লিকুইডিশনে গেলে আমানতকারীরা কিছু টাকা পাবেন। এ জায়গাগুলোয় কিছুটা সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সব আইনের অধীনেই কিছু নীতিমালা ও বিধি প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। আইনটি হাতে পাওয়ার পর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এর প্রভাব কী হবে সবকিছু আলোচনা করা হবে। এক্ষেত্রে পুরো এনবিএফআই খাত যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং সে ধরনের উপযোগী নীতিমালা ও বিধি তৈরি করা হবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে। বস্তুত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির আওতায় দেশের আর্থিক খাতের সংস্কারে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়ার শর্ত দেয় সংস্থাটি। এর মধ্যে ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন প্রণয়নের বিষয়টিও ছিল। এ বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে আইনটি পাস করার সময়সীমা নির্ধারিত ছিল। যদিও জাতীয় সংসদে সেটি ১ নভেম্বর পাস হয়। প্রায় এক দশক ধরেই এনবিএফআইগুলোর জন্য নতুন আইন প্রণয়নের কাজ চলছিল। বিভিন্ন সময়ে অংশীজনদের মতামতও নেয়া হয়েছে। সর্বশেষ ২০২১ সালে আইনটির যে খসড়া করা হয়েছিল সেটির বিষয়েও অংশীজনদের কাছ থেকে মতামত নেয়া হয়। তবে যে আইন পাস করা হয়েছে তাতে এমন কিছু ধারা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যেগুলো আগের খসড়ায় ছিল না এবং অংশীজনরা এ বিষয়ে জানতেন না। আমরা প্রত্যাশা করব দেশের ব্যাংক খাতের পাশাপাশি এনবিএফআই খাতও যেন সামনে এগিয়ে যেতে পারে, এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে যথাযথ ভূমিকা পালন করা হবে।