বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় মূল্যস্ফীতি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার গত এক দশকে সর্বোচ্চ ছিল। মূল্যস্ফীতির অনেক কারণের মধ্যে মুদ্রানীতিগত কারণটি হলো মুদ্রা সরবরাহের বৃদ্ধি বা মুদ্রাস্ফীতি আর বাজারকেন্দ্রিক কারণটি হলো বাজারে পণ্যদ্রব্য সরবরাহ সংকোচন। বাজারে পণ্যদ্রব্য সরবরাহ হ্রাসের অনেকগুলো প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ থাকতে পারে। বাজারে পণ্য সরবরাহকারী অসাধু সিন্ডিকেটগুলো প্রায়ই পণ্যদ্রব্য অবৈধভাবে মজুদপূর্বক সেগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সেগুলোর মূল্য স্ফীত করে। ইন্টারন্যাশনাল গ্রেইন কাউন্সিলের (আইজিসি) প্রাক্কলন অনুসারে, ২০২৩-২৪ বিপণন মৌসুমে খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক উৎপাদন ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশ সরকারের কৃষিশুমারি অনুসারেও খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে বৈ কমেনি। অথচ দেশের বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থামার কোনো নাম নেই।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উদ্যোগে ১১ জুলাই জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন হয়। সম্মেলনে ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান নিত্যপণ্যের সরবরাহ সংকটকে মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হওয়ায় দেশের গুটিকয়েক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা অর্জন করেছে। তার মতে, বাজারে প্রতিযোগিতা না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণে কারসাজির মাধ্যমে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন করছে। বাজারে অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল নয়। সরবরাহ সামান্য কমলেই ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। অমর্ত্য সেন ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেন যে খাদ্য উৎপাদন হ্রাসের ফলে সে বছর দুর্ভিক্ষ হয়নি, বরং পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন সত্ত্বেও অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যের সুষম বণ্টনের অভাবে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল।
বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশ সরকারও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন অর্থবছরের প্রথম অর্ধের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। যদিও অর্থনীতিবিদদের অভিমত, সরকারের সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতির সঙ্গে মুদ্রানীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে পণ্যদ্রব্যের বাজারে মজুদদারদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণপূর্বক নিত্যপণ্যের সরবরাহ সংকট নিরসনে সরকারের আইন বিভাগ একই সঙ্গে ৫ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুদ, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’ পাস করেছে, যা ১১ জুলাই রাষ্ট্রপতির সম্মতিক্রমে কার্যকর হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৯৫৬ সালের ফুড (স্পেশাল কোর্ট) অ্যাক্ট এবং ১৯৭৯ সালের ফুডগ্রেইনস সাপ্লাই (প্রিভেনশন অব প্রিজুডিশিয়াল অ্যাকটিভিটি) অর্ডিন্যান্স রহিতপূর্বক পুরনো দুটি আইন সমন্বয় ও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংশোধন করে অবৈধ মজুদবিরোধী নতুন আইনটি প্রবর্তন করা হলো।
নতুন আইনটির ৪ নং ধারা হলো মজুদসংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ড নিয়ে। ধারা ৪-এ বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি সরকার কর্তৃক, সময় সময়, প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত পরিমাণের অধিক পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য মজুদ করিলে বা মজুদসংক্রান্ত সরকারের কোনো নির্দেশনা অমান্য করলে, উহা হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব-১৪ বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন। তবে শর্ত থাকে যে, এইরূপ অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি প্রমাণ করিতে পারেন যে, তিনি আর্থিক বা অন্য কোনো প্রকার লাভের উদ্দেশ্য ব্যতীত মজুদ করিয়াছিলেন, তাহা হইলে তিনি অনূর্ধ্ব ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।’
অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্যস্ফীতির জন্য অবৈধ মজুদদাররা অনেকাংশে দায়ী হলেও অবৈধ মজুদের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা অনূর্ধ্ব-১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের মতো নিবর্তনমূলক কঠোর শাস্তি অবৈধ মজুদের মতো অপরাধ নিবারণে কার্যকর হবে না। যেকোনো অপরাধের সাজা অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। অপরাধের সঙ্গে সাযুজ্যবিহীন শাস্তি বরং লাভের চেয়ে ক্ষতি বয়ে আনে বেশি।
এ পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খানের ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ গ্রন্থের ‘শুয়রের বাচ্চাদের অর্থনীতি’ নামক প্রবন্ধে তার শেয়ারকৃত আমলাজীবনের অভিজ্ঞতা প্রণিধানযোগ্য। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে আমলা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার কর্তৃক ১৯৫৯ সালে বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ (The Pure Food Ordinance, যা পরবর্তী সময়ে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ দ্বারা রহিত করা হয়েছে) জারি হলে খাদ্যে ভেজালের পরিমাণ কমে না গিয়ে বেড়ে গিয়েছিল। বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশের ফলে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর প্রবণতা না কমে বাড়ার কারণ হিসেবে তিনি মাত্রাতিরিক্ত জরিমানাকে দায়ী করেছিলেন। তিনি বলেন যে উঁচু জরিমানা ধার্য করার ফলে বাজারে সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত খাদ্য পরিদর্শকদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায় এবং তারা নিয়মিত ঘুসের দাবি তুলতে থাকেন। আর খাদ্য পরিদর্শকদের ঘুসের টাকা জোগান দিতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল মেশানো বাড়িয়ে দেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে আকবর আলি খান বলেছেন, ‘যে আইন সরকার কার্যকর করতে পারবে না সে আইন প্রণয়ন করে কোনো লাভ হয় না, বরং ক্ষতি হয়।’ তাই একইভাবে, বলা যায় যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা অনূর্ধ্ব-১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অবৈধ মজুদ প্রতিরোধে কার্যকর হবে না। শুধু খাদ্য পরিদর্শকদের দুর্নীতির পরিমাণ বেড়ে যাবে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে অন্য একটি আইনের কথাও বলা যায়। আইনবিদদের বরাতে ডয়চে ভেলে বাংলার ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে অধিকাংশ ধর্ষণের মামলায় কোনো শাস্তি হয় না। কারণ ২০০০ সালে প্রণীত ও সর্বশেষ ২০২০ সালে সংশোধিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো কঠোর নিবর্তনমূলক শাস্তি নির্ধারণ করায় কোনো ধরনের বেনিফিট অব ডাউট থাকলেই কর্তৃপক্ষ ধর্ষণের আসামিদের খালাস দিয়ে দেন।
আবার মজুদবিরোধী নতুন আইনের ধারা ৪-এর দ্বিতীয় বাক্যও বিবেচনার দাবি রাখে। কেননা তাতে বলা হয়েছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে, এইরূপ অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি প্রমাণ করিতে পারেন যে, তিনি আর্থিক বা অন্য কোনো প্রকার লাভের উদ্দেশ্য ব্যতীত মজুদ করিয়াছিলেন, তাহা হইলে তিনি অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।’ অর্থাৎ লাভের উদ্দেশ্য ছিল না প্রমাণ করতে পারলে মজুদদারদের শাস্তি অনেক কমে যাবে। অবৈধ মজুদের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, একইভাবে লাভের উদ্দেশ্য ছিল না প্রমাণ করলে অনূর্ধ্ব-৩ (তিন) মাস কারাদণ্ডও শাস্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। এ অবস্থায় খাদ্য পরিদর্শকদের দৌরাত্ম্য নতুন করে বেড়ে গিয়ে শুধু মজুদদারদের কাছ থেকে তাদের আদায়কৃত ঘুসের পরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনা বেশি।
খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুদ, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩-এর ধারা ৯ কোম্পানি কর্তৃক অপরাধ সংঘটনকে নিয়ে। ধারা ৯-এ বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানির অধীনে আলোচ্য আইনে বর্ণিত কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী, ব্যবস্থাপক কিংবা পরিচালকের মতো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যদি প্রমাণ করতে পারেন যে অপরাধ তাদের অজ্ঞাতসারে হয়েছে অথবা ওই অপরাধ রোধ করতে তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, তাহলে তারা অব্যাহতি পাবেন।
অর্থাৎ কোম্পানির অধীনে সংঘটিত অপরাধের জন্য কোম্পানির নির্বাহী ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে দায়বদ্ধ করার কোনো মেকানিজম নেই আলোচ্য আইনে। রাঘববোয়ালদের আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য মোক্ষম সুযোগ দেয়া হয়েছে এ আইনে। এ প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক উইল ডুরান্টের একটা কথা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘Law is a spider’s web that catches the little flies and lets the big bugs escape.’ অর্থাৎ আইন হলো মাকড়সার জালের মতো যা ছোট ছোট পোকাদের আটকাতে পারে, কিন্তু বড় পতঙ্গদের ঠেকাতে পারে না।
কাজেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির বিধান ও রাঘববোয়ালদের জন্য প্রযোজ্য ফাঁকফোকর সংবলিত ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুদ, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’ বাজারে মজুদদারদের সিন্ডিকেটগুলোর দৌরাত্ম্য রোধে কতটা সক্ষম হবে তা ভাবার অবকাশ আছে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তিসংবলিত নিবর্তনমূলক আইনের চেয়ে বাজার ব্যবস্থাপনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও সংবাদমাধ্যমের সম্পৃক্ততা বাড়ানো বেশি জরুরি।
জামান মঞ্জু: সাংবাদিক










