ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান এবং ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন। দেশের সর্বশেষ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ২০২৩-২৪ সালের বাজেট, মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিয়ে শর্ত আরোপসহ নানা প্রসঙ্গে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৌফিকুল ইসলাম, সঙ্গে ছিলেন আনিকা মাহজাবিন
দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আমরা বাংলাদেশে অগ্রগতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, এ রকম একটি বর্ণনা বা ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছিল। এ ন্যারেটিভের উল্লেখযোগ্য বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। যেমন আমাদের মনে আছে, হাতিরঝিলে বড় করে উল্লাস প্রকাশ করে বলেছিলাম, বাংলাদেশে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেকর্ড করেছি। একই সঙ্গে আমরা লক্ষ করেছিলাম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, সেটি বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন বাতি দিয়ে ঘোষণা করল। তার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে বলা হলো যে মুদ্রার মান কত? কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, যেসব বিষয় নিয়ে গর্ব করা হতো, সেসব এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে, যে ধরনের কৌশলের কথা বলছি, যেসব বিষয় নিয়ে গর্ব করছি, সেসব বিষয়ে বহিঃস্থ আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা ছিল কিনা, অথবা প্রশ্ন করতে হবে, যে ধরনের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করেছি, সেসব প্রবৃদ্ধি কার জন্য ছিল, কী জন্য ছিল এবং কী উপায়ে ছিল? এগুলো আদৌ টেকসই কিনা। এখন এসব বড় প্রশ্ন যেমন করতে হবে, সেই সঙ্গে বসে থাকলে চলবে না। কারণ ক্রান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, এ ক্রান্তি কারো জন্যই কোনো মঙ্গল আনছে না। বড় পরিতাপের বিষয়, বড় চিন্তার বিষয়। এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হবে।
বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী দেশে গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ এখন ২৯ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। আর আইএমএফের শর্ত মেনে হিসাব করে দেখা যাচ্ছে, এর প্রকৃত পরিমাণ ২৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। গত দুই বছরে রিজার্ভে যে বড় ধরনের ক্ষয় হয়েছে, সেটি শুধু আন্তর্জাতিক নয়, অভ্যন্তরীণ কারণেও হয়েছে। এ অভ্যন্তরীণ কারণের দায়দায়িত্ব গভর্নরদের ওপরেও বর্তায়।
তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন রিজার্ভ ক্ষয়ের সঙ্গে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি ও সুশাসনের অভাব জড়িত?
এক কথায়, আমরা যদি শেষ দিয়ে শুরু করি, তাহলে আমরা কতগুলো নির্দেশক পাব। আমরা যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের একটা ঋণ কর্মসূচির মধ্যে আছি, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি মুডি’স তখন ঋণমান অবনমন করেছে। এক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে উল্লেখ করেছে। প্রথম বিষয় হচ্ছে, বাহ্যিক যে ভঙ্গুরতা বা ঝুঁকি, দ্বিতীয় কথা বলেছে তারল্যের সংকট এবং তৃতীয় কথা বলেছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। এগুলোই আসলে মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সে কারণেই আজকের এ অবস্থা। আপনি যদি খেয়াল করেন, আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত বছরের এ সময়ের তুলনায় এখন যেকোনো হিসাবে ১২-১৩ বিলিয়ন ডলার কম। তাহলে কেন কম হলো? আমরা একটি আকার লক্ষ করেছি যে ২০২১-২২ অর্থবছরে অতিরিক্ত পরিমাণে আমদানি হয়েছে। এ আমদানির পরিমাণ যেকোনো বছরের তুলনায় অত্যধিক। ৩৫ শতাংশ বেশি আমদানি হয়েছে। যে কারণে চলতি লেনদেন অর্থাৎ ব্যালান্স অব পেমেন্টে মোটা দাগে তিনটি অ্যাকাউন্ট আছে। আমদানি, রফতানি ও প্রবাসী আয় যেটাকে আমরা বলি কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স বা চলতি লেনদেন। দ্বিতীয়ত, আমাদের একটা ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট আছে। তৃতীয়ত, আমাদের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট বা আর্থিক হিসাব আছে। আগের বছরে আমাদের ক্ষয় শুরু হলো এবং যে ক্ষয় শুরু হলো ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার আক্রমণের ছয় মাস আগ থেকেই। বিরাট একটা উল্লম্ফন হলো আমদানির, বলা হয় এবং বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বলে যে ওভার-ইনভয়েস ও আন্ডার-ইনভয়েসের মাধ্যমে পুঁজি পাচার ঘটেছে। সেটা একটা প্রথম শুরুর দিক, আমাদের যে দ্বিতীয় বিষয়টি আঘাত করল সেটা আগে কখনো করেনি। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট বা আর্থিক অ্যাকাউন্ট—এ অ্যাকাউন্টের দুটো দিক। একটা অংশ হচ্ছে, আমাদের এখানে কেমন বিদেশী মালিকানা রয়েছে। আরেকটা হচ্ছে, বিদেশে সম্পদের ওপর আমাদের কী ধরনের মালিকানা রয়েছে। মোটা দাগে বুঝতে গেলে, আমাদের এখানে কী ধরনের ঋণ আছে এবং সেসব দেশে কী পরিমাণ ঋণ যাবে। আমরা লক্ষ করেছি, সাম্প্রতিক কালে চলতি লেনদেন বা কারেন্ট অ্যাকাউন্টে বিশেষ করে ক্যাপিটাল মেশিনারি ও ইন্টারমিডিয়েট গুডস ব্যাপক কমানোর ফলে আমাদের চলতি লেনদেন মোটা দাগে একটা স্থির অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু ফাইন্যান্সিয়াল খাতে অর্থাৎ আমাদের দেশ থেকে একের পর এক অর্থ বের হয়ে যাচ্ছে। দুটো হিসাব বা পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যাবে। প্রথম হচ্ছে যে স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত ৪২ বিলিয়ন ডলার ঋণ করা হয়েছে। কিন্তু গত সাড়ে সাত বছরে ঋণটা বেড়েছে দ্বিগুণ। ৯২-৯৩ বিলিয়ন ডলার। একইভাবে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণ। এ ঋণগুলো ২৫ বিলিয়ন ডলারের মতো হবে। ঋণগুলোর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ বেশি। অর্থাৎ একের পর এক ডলার বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে এ রকম অবস্থা যদি চলতে থাকে, ক্রমাগতভাবে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার যে রিজার্ভ রয়েছে সেটা ক্ষয় হতেই থাকবে। মানে একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে, সাধারণত ধরে নেয়া হয় কোনো দেশ যদি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে কোনো কর্মসূচিতে থাকে তাহলে ঋণমান সাধারণত কমানো হয় না। কেন? কারণ ধরে নেয়া হয় একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়েছে কীভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমাগত হারে কমে যাচ্ছে, সেটাকে আমরা কীভাবে স্থিতিশীলতায় আনব? সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটা বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়েছে, স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
মূল্যস্ফীতি কি আগামীতে আরো বাড়বে না কমানো সম্ভব? বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে তা সম্ভব কিনা?
যদি আপনি জিজ্ঞাসা করেন, বাংলাদেশে কর ও মোট দেশজ উৎপাদনের কী অবস্থা? প্রতি বছরই দেখছি লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হচ্ছে, কিন্তু গত ৮-১০ বছরে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। যেমন গত দুই মাসে গড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো রাজস্ব আয় হয় এনবিআরের। তার মানে লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন হচ্ছে না। একই কায়দায় এ বছর মুদ্রাস্ফীতির একটা লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ৬ শতাংশ। সেটি নিয়ে সরকারের মধ্যেই সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এটি কোনোভাবেই বাস্তবতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। কারণ ১২ বছরে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে আছি। অর্থাৎ ২০২২ সালের মে মাসে যদি আপনার ১০০ টাকা লাগত, এখন লাগছে ১০৯ টাকা ৯৪ পয়সা। কভিডে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছে। রাষ্ট্র সে অনুযায়ী অর্থ দিতে পারেনি। কারণ রাষ্ট্রের নিজেরই তো অর্থ নেই, ঋণ করছে। সে ঋণটা কোত্থেকে করছে? ব্যাংক থেকে তো ঋণ করতে পারছে না। ব্যাংকে যে লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছিল তা পারছে না। কারণ ব্যাংক খাত নিজেই থুবড়ে পড়েছে। কখন ঋণ করতে হচ্ছে? আপনি দুভাবে এটা মোকাবেলা করতে পারেন, পণ্যের মজুরি বাড়িয়ে দিয়ে, আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক নির্ধারিত ১৪৫টি পণ্যের মজুরি আছে, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না। তার মানে বড় আকারে প্রকৃত মজুরি কমছে। অন্যদিকে যখন এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে মানুষ যায়, তখন রাষ্ট্র সহায়তা করে। সেক্ষেত্রে আমরা লক্ষ করেছি কভিডকালে ইউরোপ, আমেরিকার রাষ্ট্রগুলো বড় রকমের সহায়তা করেছে। আমাদের রাষ্ট্র সেভাবে হয়তো করতে পারছে না। কারণ রাষ্ট্রের আয় নেই, রাষ্ট্রকে নিজেই ঋণ করে চলতে হচ্ছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সে ঋণ করতে পারছে না। তখন তাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ ছাপিয়ে ঋণ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশে আমরা এটাকে বলি বাজারে ১ টাকা যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রবেশ করে, তাহলে সেটি ৫ টাকা হয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা জানাচ্ছে, গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৭০ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করেছে। তার মানে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। বাজারে যখন এত টাকা আসে, তখন মূল্যস্ফীতি আরেকভাবে বাড়ে। তার মানে একদিকে এমনি বাড়ছে। বাড়ছে কেন? সরকার বলেছিল যে বাইরের পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য এ দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু দামটা স্বাভাবিক হলেই এ দামটা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে। তাহলে আন্তর্জাতিক কারণকে আর কোনোভাবেই কারণ দেখানো যাচ্ছে না। একে তো সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা যে দাম কমানোর কথা বলেছিল, সেটা কমেনি। আগস্টে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ। তাহলে সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলেছিল তার মাধ্যমে দাম কমাবে। সে দাম কমেনি, মজুরি বাড়েনি। তার মধ্যে সরকার আরেকভাবে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ সরকার ঋণ নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপাচ্ছে। সেটি আরেকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে। এ তিনটি কারণই সরকারের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, কোথাও তো আমরা দায়বদ্ধতা তৈরি করতে পারছি না এবং কেউ দায়বদ্ধতা নিচ্ছেন না। আপনি যদি বিদ্যুতের কথা চিন্তা করেন, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কি দায়বদ্ধতা নিচ্ছে? কিছুদিন আগেই টক অব দ্য টাউন ছিল, বাংলাদেশের প্রধান শহর ঢাকার একটি রাস্তায় কোনো সময়েই বিদ্যুৎ যায় না। কারণ সে এলাকায় বিদ্যুৎ উপদেষ্টা থাকেন, তিনি দায় নিচ্ছেন না। তিনটি বড় কথা আমরা উল্লাস করে বলেছিলাম। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষেত্রে আর ক্রেডিট মানির ক্ষেত্রে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকেও অস্বাভাবিক রিজার্ভের জন্য তো দায়বদ্ধ হতে হবে। তাকে তো বলতে হবে কেন আজকের এ পরিস্থিতি? তার মানে জবাবদিহিতা, দায়বদ্ধতার অভাব অথবা বিচারহীনতার সংস্কৃতি রয়েছে। আজকের মূল্যস্ফীতির তিনটি সূত্রই সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেমন আজকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের কারণ দুটো। একটি হচ্ছে অতীতে বড় মাত্রায় পুঁজি পাচার এবং সাম্প্রতিক কালের ঋণ। ব্যক্তি খাতের ঋণের জন্য ব্যক্তি দায়ী। বিষয়টা এমন নয়, কারণ এখানে সার্বভৌমত্ব গ্যারান্টি দেয়া আছে। শেষ বিচারে এ ঋণ পরিশোধের দায় রাষ্ট্রের অর্থাৎ জনগণের।
অন্য দেশগুলোয় নিত্যপণ্যের মূল্য কমছে, বাংলাদেশে কমানো যাচ্ছে না, এ প্রসঙ্গে বলুন।
দুটো কারণ, একটা হচ্ছে যে সরকারের কারণে কমছে না। আরেকটা হচ্ছে সরকার শাসন ব্যবস্থা জারি রাখতে পারছে না বলে কমছে না। সেটা হচ্ছে আপনি চিন্তা করেন, বাংলাদেশের যেকোনো সময়ের তুলনায় এ বছর কৃষি উৎপাদন কিন্তু কম হয়নি বরং বেড়েছে। কিন্তু কৃষক তার দাম পাচ্ছেন না। অর্থাৎ কৃষক তার খামারে যে দাম পাচ্ছেন আর ভোক্তা যখন খুচরা বাজারে গিয়ে কিনছে, এ দুইয়ের মধ্যে বিরাট পার্থক্য। এর মানে মধ্যস্বত্বভোগীরা সেটি খেয়ে ফেলছে। সেটি ফড়িয়াদের ক্ষেত্রে হতে পারে, যারা দাদন দিয়েছে তারা হতে পারে, চাতাল মালিক হতে পারে। অথবা যেটা হতে পারে পরিবহনের ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। অর্থাৎ সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনের মধ্যে আইন প্রতিষ্ঠার অভাবের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। কৃষক কিন্তু লাভ পাচ্ছেন না, বরং উৎপাদন খরচ দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। কারণ উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়ে যাচ্ছে। সেটা সারের কথা বলা যায়, বিদ্যুৎ এমনকি পানির কথা বলা যায়। অন্যদিকে প্রকৃত মজুরি কমে যাচ্ছে, কিন্তু বিরাট দাম, মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কারণে এটি হচ্ছে। অর্থাৎ, আইন বাস্তবায়ন করার যে পদ্ধতি বা কাঠামো সেটির একটি বড় রকমের বঞ্চনা আছে। তৃতীয় হচ্ছে, সরকার নিজস্ব কায়দায় কতগুলো পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। যেমন তেলের দামের ক্ষেত্রে, কতগুলো পণ্যের আমদানিকারক তাদের সঙ্গে আলোচনা করে আটটি পণ্যের দাম নির্ধারণ করেছে। এ কারণেই মূল্যস্ফীতি ধরে রাখতে পারছে না। কিন্তু মূল্যস্ফীতি যে ঘটছে, এক্ষেত্রে কোনোভাবেই বৈদেশিক কারণকে দোষী করা যাবে না। কারণ বিদেশে দাম কমেছে, উৎপাদনও বেড়েছে। তাহলে ভোক্তা কেন বর্ধিত দামে কিনছে? যে কারণে আমরা লক্ষ করেছি সমাজে একটা ভাঙন তৈরি হয়েছে। কারণ মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত হয়েছে এবং নিম্নমধ্যবিত্ত দরিদ্রে পরিণত হয়েছে। বিআইডিএস সাম্প্রতিক নগরের জরিপে বলেছে, ৫০ শতাংশ মানুষের নতুন দারিদ্র্য তৈরি হয়েছে। উন্নয়ন কৌশলগুলো কাজ করছে না। জবাবদিহিতা নিশ্চিত হচ্ছে না। নতুন দারিদ্র্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মূল্যস্ফীতি এভাবে চলায় এখন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। কে বিনিয়োগ করবে এ সময়? উৎপাদনের দাম বেশি, গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বেশি। সে কীভাবে উৎপাদন করবে? এতে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না এবং মজুরি বাড়ছে না। ফলে আমরা দেখছি, নতুন দারিদ্র্য তৈরি হচ্ছে এবং দারিদ্র্য হ্রাসের হারও কমে গেছে। বিবিএসের ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, ছয় বছর পরপর দারিদ্র্য কমার হার গড় করলে দেখা যাবে দারিদ্র্য কমার হার কমছে। কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। আমরা বড় একটি চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ফলে অর্থনীতিতে দীর্ঘায়িত নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। এ কারণে একদিকে মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে কারখানা সচল রাখার জন্য যে জ্বালানি দরকার সেখানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ, সেগুলোকে অর্থায়নের জন্য যে পরিমাণ বৈদেশিক বা দেশী মুদ্রা দরকার তার চেয়ে আমাদের ঋণ ও জিডিপির আকার বেড়ে যাচ্ছে। আবার রাজনৈতিক বন্দোবস্ত থেকে বলা হচ্ছে, এ ধরনের লক্ষ্যমাত্রা কখনই অর্জন হবে না। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী নিজেই বলছেন, ৬ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা একটা বায়বীয় লক্ষ্যমাত্রা। তার মানে একটা অস্বীকার করার প্রবণতা আছে। এ দোষটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেয়ার বড় রকমের একটা চেষ্টা রয়েছে। দায়বদ্ধতার কোনো সংস্কৃতি নেই এবং গোষ্ঠীতান্ত্রিক সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। উপদেষ্টা হোন আর যে-ই হোন, নিজের সুবিধা দেখছেন, এ সুবিধাগুলো সর্বব্যাপী। একজন এমপি চিকিৎসা নিচ্ছেন না জেলা হাসপাতালে। যখন তাপপ্রবাহ ছিল, তখন সুবিধাভোগীরা নিশ্চিত করছেন, তাদের যেন তাপপ্রবাহ না হয়। একটা বড় ধরনের সংস্কৃতি এ রাজনীতিতে বিদ্যমান, যেখানে রাষ্ট্র জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভিসার পক্ষে কতগুলো সীমাবদ্ধতা জারি করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ দায়ী না হলেও তারা ভুক্তভোগী। এক্ষেত্রে প্রতিকার কী?
আমরা যখন এ রকম অভ্যন্তরীণ ত্রাহি-পরিত্রাহি অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে জুড়েছে দুটো আন্তর্জাতিক খবর। একটা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ঋণমান প্রদানকারী সংস্থা মুডি’সের ঋণ অবনমন, সেই সঙ্গে আমরা লক্ষ করেছি যে বিভিন্ন ধরনের চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে আরো শুরু হবে। কারণ এরই মধ্যে অনেক আগে থেকে পার্শ্ববর্তী দেশের ঋণ ও ঋণপত্র নিয়ে ঝুঁকির কথা জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ। এখন যেকোনো জায়গা থেকে ঋণ নিতে গেলে ঋণ বাবদ খরচ অনেক বেড়ে যাবে। অনেক জায়গায় ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট সেটলমেন্টের সমস্যা দেখা দেয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিগত কারণ। এটাকে সাব সাব সি বলা হয়। এ সময়ে এ দুটো আন্তর্জাতিক ঘা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আসে। এখানে যেটা মুশকিল, তা হলো বাংলাদেশে এত মানুষ এটা নিয়ে চিন্তা করছে কেন? মাত্র তো ২৯-৩০ হাজার লোক প্রতি বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নেয়। এ পরিস্থিতি অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আছে, যা আমাদের বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কারণ হচ্ছে যে বাংলাদেশের বাণিজ্যের একটি বিরাট অংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বিশেষ করে রফতানি, তার সঙ্গে আমাদের যে আকাঙ্ক্ষা—আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে শুধু উন্নয়নশীল বিশ্ব হব, কিন্তু সেক্ষেত্রে তো প্লাস জিএসপি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। সে জায়গায় বড় রকমের একটা আঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সেজন্য আমাদের এ পরিস্থিতিগুলো থেকে উত্তরণের প্রত্যেকটি পদক্ষেপ আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কীভাবে এ কৌশলগুলো নির্ধারণ করব এবং কীভাবে আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলব।










